হ্যালো বন্ধু

সাহিদা সাম্য লীনা

বন্ধু কেমন আছিস? কোথায় আছিস? আগের মতো আছিস? নাকি বদলে গেছিস? বন্ধু মনে পড়ে কি আমায়? নাকি তাও গেছিস ভুলে? বন্ধু বিয়ে করেছিস? তোর বাবু হয়েছে? তোর বউটা মনের মতো হয়েছে তো? নাকি এখনো একলা জাগিস? বন্ধু, তুই এখন কি ব্যবসা করিস, না কারো অধীনে চাকরিটা নিয়ে দারুণ ব্যস্ত? বন্ধু শুনতে পারছিস? নাকি এখনো আগের মতো ইয়ার্কি মারিস? বন্ধু, এখনো কি কবিতা আসরে যাস? নাকি জীবনের কোনো ব্যর্থতার চোরাবালিতে হেরে বৃষ্টিতে ভিজিস? হ্যাঁ রে, এখন তো বর্ষা। ভিজতে অনেক মন চাচ্ছে। তুই চলে আয় যেখানে আছিস। অনেক দিন দেখি না রে। কলেজ জীবনের কথাগুলো মনে হলে বুকটা কেমন করে ওঠে। ইচ্ছে হয় আবার যদি ফিরে পেতাম সেই স্বর্ণসময়গুলো! ইস্! কী মজা হতো তাই না?
বন্ধু দিবসে সবাইকে স্বাগতম। প্রতি বছর আগস্টের প্রথম রোববার বিশ্ব বন্ধু দিবস পালন করা হয়। বন্ধু শুধু সহপাঠী নয়, বন্ধু সবাই হয়। বন্ধুত্বের কোনো বর্ণনা হয় না, সেই জন অনেক ভাগ্যবান, যার একজন প্রকৃত বন্ধু আছে। মনের সাথে মনের মিল মানেই বন্ধু। যদি তেমন মনের মতো হয়। তবে সহপাঠী বন্ধুই সবচেয়ে কাছের, হৃদ্যতার হয়। বয়সে সমান, মনে মনে কথায় খেলায়, হাসিতে দুনিয়া জোড়া যেন আনন্দ আর আনন্দ!! বন্ধুর সাথেই জীবনের বেশির ভাগ সময়ই কাটানো হয় ক্লাসে, আড্ডায়, ক্যাম্পাসে। ভালো বন্ধু ও নিঃস্বার্থ বন্ধু পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। জ্যাক দেলিল বলেন, ‘নিয়তি তোমার আত্মীয় বেছে দেয়, আর তুমি বেছে নাও তোমার বন্ধু।’ অনেকে বন্ধু বলতে প্রেমিক-প্রেমিকাই বোঝে। প্রেমিকও হয় বটে। তবে বন্ধু হওয়া উচিত সব কিছুর ঊর্ধ্বে। পৃথিবীতে যত ধরনের সম্পর্ক আছে তার মধ্যে নিঃস্বার্থ ও বিশুদ্ধ সম্পর্কের নাম ‘বন্ধু’।
ভালোবাসা ও বন্ধুত্ব মানেই বিশ্বাস। সবচেয়ে এ বন্ধনে যে জিনিসটি দরকার তা হলো, এই বিশ্বাস নামক শব্দটি। কিন্তু ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের মাঝে রয়েছে বিস্তর ফারাক। বন্ধুত্ব মানুষের মানবিক সম্পর্কের শ্রেষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ। বেঁচে থাকার প্লাটফরম। অনাবিল আনন্দের ফল্গুধারা। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস বন্ধুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, ‘বন্ধুত্বের বন্ধনে জড়াও খুব ধীরে, কিন্তু সেটা যদি একবার গড়ে ওঠে তবে তা যেন হয় দৃঢ় ও অপরিবর্তনীয়। বন্ধুহীন জীবনে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ নেই। তবে বন্ধু বাছাই করতে হবে খুব সতর্কভাবে। বন্ধুত্বের নামে ছলনা খুবই বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে দাঁড়ায় জীবনে। তাই খুব ধীরে, সুস্থে বন্ধুত্বের পথে অগ্রসর হতে হয় এবং উচিতও বটে। সক্রেটিস আরো বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব গড়তে ধীর গতির হও, কিন্তু বন্ধুত্ব হয়ে গেলে প্রতিনিয়তই তার পরিচর্যা করো।’ গ্লোবালাইজেশনের যুগে বন্ধু পাওয়া খুব সহজ হয়ে গেছে। নিমেষেই বন্ধু নিমেষেই শেষ বন্ধুত্ব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথাই ধরি, মুহূর্তে হাই; হ্যালো করেÑ দু’চার লাইন চ্যাট করলে মনে করে এক প্রান্ত বন্ধুত্ব হয়ে গেল!! সে জন্য দেখা যায়, এক দিনেই সেখানে ভেজাল এসে দাঁড়ায় বেশির ভাগ। কারণ এখানে একে অপরের বৈশিষ্ট্য, কলাকৌশল, হৃদ্যতা, বোঝার সুযোগ কম। নকল নাম, নকল পরিচয়, নকল বেশ ধরে বন্ধুত্ব অনেক ঝুঁকির। একটা মাউসের ক্লিক আর অ্যান্ড্রয়েডের স্পর্শে অনেক কাজই সম্ভব। তবে বন্ধুত্ব বিষয়টি বিশাল স্পর্শকাতর। বর্তমানে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বে ধোঁকাবাজি হয় এ ক্ষেত্রে বহু। তাই ভার্চুয়াল জগতে এ সম্পর্ক করতে সাবধানতা অতি জরুরি। আমরা শিশুদের ক্ষেত্রে দেখি একসাথে অনেক বন্ধু কিন্তু সবার সাথে তার ভাব গড়ে ওঠে না, হয়তো দেখা যায় যার সাথে কেউ কল্পনাও করেনি তার সাথেই সে শিশু হাসছে, খেলছে। এটা একধরনের প্রাকৃতিক অনুভূতি; মনের মিল।
একজন ভালো বন্ধুই পারে নিঃস্বার্থভাবে জীবন চলার পথে মৌলিক দাবিগুলো পূরণ করতে, সব চাওয়া পাওয়ার ঊর্ধ্বে থেকে নিজ স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে। সে জন্যই ভালো বন্ধুকে হারালে খুব কষ্ট পেতে হয়। বন্ধুত্বের বন্ধন তাই শক্তভাবে বাঁধা উচিত। সেখানে অন্য কিছু প্রবেশ নিষিদ্ধ। চার্লস কেলেট বন্ধুত্ব সম্পর্কে বলেছেন, ‘বন্ধুত্ব কখনো কখনো ভালোবাসায় শেষ হয়; কিন্তু ভালোবাসা থেকে বন্ধুত্ব কখনোই নয়।’ ভালোবাসার টানাপড়েনে কখনোই বন্ধুত্বকে কবর দেয়া কোনো বন্ধুর কাম্য নয়। যতদূর যাওয়া যায় বন্ধুর বন্ধন টেকসই হলে তা ভাঙবার অজুহাত কখনো আসে না। বলতে হয় না বন্ধু বিদায়। রবীন্দ্রনাথ তার শেষের কবিতায় লিখেছেন, ‘দূর হতে যদি দেখ চাহি/পারিবে না চিনিতে আমায়/বল না হে বন্ধু বিদায়।’ তবু বন্ধুকে কাছ থেকে উপলব্ধি করার আকাক্সক্ষা হৃদয়ে আনাগোনা করে। সবসময় বন্ধুকে হারাবার আশঙ্কায় রবীন্দ্রনাথ তাই তার শেষের কবিতায় লিখেছেন, ‘পদে পদে কণ্টকময়, জীবনকে একজন ভালো বন্ধুই পারে নিঃস্বার্থভাবে নিজ স্বার্থকে ত্যাগ করে একে অপরের হৃদয়ে উষ্ণতার পরশ বোলাতে।’
ফেনী।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.