নীল দর্পণ : চারাগল্প

জোবায়ের রাজু

দুই যমজ ছেলেসন্তানের বাবা হয়েছি আমি, এই পূর্ণতা লাভের আনন্দ যখন আমার আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে, ঠিক তখনই এক সকালে এক বাজে অনুরোধ নিয়ে এলো আমার চিরদিনের জবর বন্ধু রহমান ও তার স্ত্রী রাবেয়া ভাবী। সে দিনই বুঝতে পারলাম আমার যমজ সন্তান দুনিয়াতে আসার পর রহমান কেন সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে।
রহমান অনুনয় গলায় বললÑ ‘বন্ধু আমাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিবি?’ প্রথমে আমি এ প্রশ্নের রহস্য বুঝলাম না। বিস্মিত গলায় বললামÑ ‘কী চাস বল?’ এক পৃথিবী প্রত্যাশা নিয়ে রহমান বললÑ ‘তোর দুটো সন্তান থেকে একটি সন্তান আমাকে দিয়ে দে।’ রহমানের কথা শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। মানেটা কী? রহমানের বাবা হওয়ার ক্ষমতা নেই, তাই বলে সে আমার কাছে সন্তান চাইবে? তার প্রস্তাবে আমার ভাবান্তর নেই দেখে সে দৌড়ে এসে আমার পা জড়িয়ে ধরে বললÑ ‘আমাকে নিরাশ করিস না বন্ধু। দোহাই।’
না, রহমানের আকুলতায় আমি গলতে পারিনি। পিতৃত্ব বোধ আমাকে কঠোর করে তুলেছে। দাম্পত্য জীবনের সাতটি বছর পার হওয়ার পরও বাবা হতে পারেনি রহমান। বাবা যে হতে পারবে, সে নিশ্চয়তাও দিতে পারছেন না ডাক্তাররা। অথচ সংসার পাতার দেড় বছরের মাথায় আল্লাহ আমার ঘরে ফুলের মতো দুটো ফুটফুটে ছেলে দিয়েছেন। সে দু’টি ছেলে থেকে একটি ছেলের দিকে নজর রহমানের। ওর এত বড় সাহস হবে কেন! কোন স্পর্ধায় ভাবল আমি তার বাসনা পূরণ করব! বন্ধুত্বের খাতিরে আমি তাকে সে অধিকার দেইনি। সন্তানের প্রতি বাবার ভালোবাসা সে যদি বুঝত, তাহলে স্ত্রী নিয়ে এভাবে আমার দুয়ারে সন্তান ভিক্ষা চাইতে আসত না।
সাফ জানিয়ে দিলামÑ ‘তুই আমার সব কিছু নিয়ে যা। ঘরবাড়ি সব। কিন্তু আমাকে আর দ্বিতীয়বার সন্তান চাইবার আবদার করিস না।’ আমার কথায় রহমান শিশুর মতো কাঁদতে লাগল। রাবেয়া ভাবী হাত জোড় করে বললÑ ‘আমি কখনো মা ডাক শুনব না?’
নিরাশ হয়ে ওরা চলে যাওয়ার পর আমি ফিরে আসি আমার দুই সন্তানের কাছে। কী মায়া মায়া মুখ, কচি কচি পা। আমার যমজ ছেলেরা শুয়ে আছে পাশাপাশি। ওরাই আমার সম্বল। আমার বুড়ো বয়সের ভরসা। অথচ রহমানের সে ভরসা নেই। ওর বংশে কখনো প্রদীপ জ্বলবে না। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রহমান নিঃসন্তান হয়ে থাকবে। আর আমি তার বিপরীত। এক গৌরবে আমার বুক ভরে উঠল।
দিন দিন বড় হতে থাকে আমার দুই ছেলে রকি আর তানিম। ওরা স্কুলে পড়ে। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দু’জন স্কুলে যায়। দু’জনই ভারি সুন্দর হয়েছে। দেখলে বড় মায়া হয়। বাবা হয়ে আমি তাদের মায়া বিলাতে কোনো দ্বিধা রাখি না। আমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ওরা। আমি কল্পনার চোখে দেখতে থাকিÑ আমি বৃদ্ধ প্রবীণ। বয়সের ভারে হুইল চেয়ারে বসে আছি। আমার দুই ছেলে পেছন থেকে হুইল চেয়ার ঠেলে আমাকে কোনো এক নির্জন পার্ক দেখাচ্ছে। কল্পনায় আজকাল ভবিষ্যতের এই নির্মল দৃশ্য দেখতে পাই।
২.
আজ আমার ছেলেরা বড় হয়েছে। ভালো মাইনে নিয়ে চাকরি করে। কিন্তু ওরা আজ আমার বিশ্বাস আর আস্থা, দুটো জায়গাতেই নেই। দু’জনই নিজেদের পছন্দমতো বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা সংসার পেতে আজ স্ত্রীদের কথায় উঠে বসে। মাস শেষে যে বেতন পায়, সবই বউদের হাতে তুলে দেয়। অথচ আমাকে ওদের মায়ের ডায়াবেটিসের ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। এসব কিছুর মধ্য দিয়ে জীবনের এই বেলায় এসে আমি আমার ছেলেদের কাছে আজ গৌণ হয়ে উঠেছি। কী স্বপ্ন দেখলাম আর কী হয়ে গেল। আমার আশা ভরসা ওরা এভাবে ধূলিসাৎ করে দিলো।
রাস্তা দিয়ে সেই দিন আনমনে হাঁটছিলাম। একটা প্রাইভেট কার এসে আমার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। গাড়ির কাচ নামিয়ে কেউ একজন বহু দিনের চেনা কণ্ঠে বললÑ ‘কেমন আছিস বন্ধু?’ চেয়ে দেখি রহমান গাড়ির ভেতরে। আজ পঁচিশ বছর পর ওর সাথে দেখা। গাড়ি কিনেছে। দেখে বেশ সুখী মনে হচ্ছে।
‘কোথায় যাচ্ছিস বন্ধু? এমন দেখাচ্ছে কেন? মন খারাপ?’ মরা হাসি দিয়ে বললামÑ ‘ভালো আছিরে।’ আসলে কি আমি ভালো আছি? রহমান বললÑ ‘তোর ছেলেরা কী করে? ওরা কেমন আছে?’ আমি জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করিÑ ‘তুই কী করিস? কিভাবে চলিস?’ হেসে সে বললÑ‘নিঃসন্তান জীবনে যতখানি খারাপ থাকার কথা, তার চেয়ে বেশি ভালো আছি দোস্ত। রাবেয়াকে নিয়ে সুখে আছি। জরুরি কাজে পালপাড়া যাচ্ছি। ভালো থাকিস। তোর ছেলেদের আমার ভালোবাসা দিস।’ বলেই গাড়ির কালো ধোঁয়া ছেড়ে চলে গেল রহমান।
নিঃসন্তান হয়েও সে আজ কত সুখী। অথচ আমি তার বিপরীত। ছেলেদের কাছে আমার কোনো মূল্যায়ন নেই। আচ্ছা সে দিন যদি আমি আমার যমজ সন্তান থেকে একটা সন্তান রহমানকে দিয়ে দিতাম, আজ কি আমি এক সন্তানের কাছে প্রতারিত হয়ে রহমানের কাছে আশ্রিত আমার অন্য ছেলেটির কাছে গিয়ে একটুখানি ভরসা নিয়ে দাঁড়াতে পারতাম না? অথচ সেদিন আমি সন্তানের বাবা হওয়ার প্রাপ্তিতে রহমানকে অপমান করে অপদস্থ করেছি। অথচ সে আজ সুখী। আমি নই।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.