বন্ধু-বন্ধুত্ব

শওকত আলী রতন

বন্ধু ছোট্ট একটি শব্দ। যার আভিধানিক অর্থ সৌহার্দ্য বা কল্যাণকামী ব্যক্তি, কিন্তু এর ব্যাপকতা অনেক। আত্মীয়তার সম্পর্কের বাইরে যে সম্পর্কটি মানুষের সবচেয়ে কাছের সেটা হলো বন্ধুত্ব। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নতুন নতুন সম্পর্ক আমাদের জীবনে এলেও একমাত্র বন্ধুত্ব শব্দটিই আমাদের জীবনে স্বমহিমায় ভাস্বর হয়ে থাকে। বন্ধুত্বের কোনো গণ্ডি নেই। বন্ধ সব বয়সে সবসময়ই গ্রহণীয়। বন্ধুই একমাত্র সম্পর্ক যা মানুষকে বিশ্বাস, আস্থা আর সাহস জোগায়। তবে বন্ধুত্বের ধরন, অবস্থা বর্তমানে বদলাচ্ছে। আগের মতো প্রতিদিনের চেনাজানা মানুষই শুধু বন্ধু নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্ধু হয়। আর এসব বন্ধু অনেক সময়েই ভালোর চেয়ে মন্দও ডেকে আনে।
বন্ধুত্ব কি সব সময়ই আশীর্বাদ, নাকি বন্ধুত্বের আড়ালে রয়েছে অচেনা অজানা কোনো মৃত্যুফাঁদ; যে ফাঁদে পড়ে জীবনকে বিসর্জন দিতে হয়। বন্ধুবিহীন জীবন যেমন ভাবা যায় না, ঠিক তেমনই বন্ধুই হতে পারে অভিশপ্ত জীবনের একটি অংশ। বন্ধুবেশে বন্ধুর ক্ষতি করাটাও সোজা, কারণ বন্ধুকে মানুষ অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। আর এই সরল বিশ্বাসের সুযোগ নেয় বন্ধুরূপী শত্রুরা। এমন বিশ^াসে পাল্টে যেতে পারে স্বাভাবিক জীবনের গতিপথ। জীবন হতে পারে দুর্বিষহ। তাই বলে কি সব বন্ধুকেই অবিশ্বাস করা যায়? মনে অবিশ্বাস নিয়ে তো আর বন্ধুত্ব করা যায় না। তাই নকল বন্ধুকে চেনার আছে কিছু সহজ উপায়। কয়েকটি বিষয়ের ওপর একটু নজর রাখলেই আসল বন্ধুর পরিচয় পাওয়া খুবই সহজ।
এমন বন্ধুও আছে, যারা অন্যের ব্যক্তিগত কথা কিংবা গোপনীয় বিষয় আরেক বন্ধুকে অবলীলায় বলে ফেলে; যা কারোরই কাম্য নয়। কোনো বন্ধু হয়তো আরেক বন্ধুকে বিশ্বাস করে কিছু কথা বলেছিল, কিন্তু সে এসে অন্য বন্ধুকে সহজেই বলে দিলো। বিষয়টি যখন কোনোভাবে জানতে পারবে তা গোপনীয় কথাটি ফাঁস হয়েছে গেছে, তখন বন্ধুর সাথে দেখা দেবে মনোমালিন্য, সৃষ্টি হবে দূরত্বের। তাই এ ধরনের বন্ধুদের বিশ্বাস করা ঠিক হবে না।
প্রকৃত বন্ধু কখনোই মিথ্যার প্রশয় নেবে না। যারা প্রকৃত বন্ধু না, তারা সময়ে-অসময়ে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যার বুলি আওড়িয়ে বেড়াবে। নিজের পরিচিতি নিয়ে মিথ্যা বলে, পরিবারের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার কথা গোপন রেখে বাড়িয়ে বলার চেষ্টা করবে, যা পরে আসল তথ্য বের হয়ে এলে বন্ধুত্বের মধ্যে ফাটল ধরবে। আবার কখনো নিজের দোষ বন্ধুর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়ার জন্যও মিথ্যা বলে থাকে।
একজন বন্ধু যদি সারাক্ষণ অপর বন্ধুর দোষ ধরে, তাহলে সেটা প্রকৃত বন্ধুত্ব নয়। কিছু মানুষ আছে যারা সারাক্ষণই বন্ধুর দোষত্রুটি ধরার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে। এটাও একজন ভালো বন্ধুর পরিচয় হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে বন্ধুর দোষগুলোকে সংশোধন করার চেষ্টা করতে হবে। আবার অনেকে বন্ধুর সম্পর্কের খাতিরে টাকা ধার নিয়ে ফেরত দেয় না। টাকা চাইলে গেলে বন্ধুত্বের সম্পর্কের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়। আবার এমন উদাহরণও রয়েছেÑ টাকা না দেয়ার উদ্দেশ্যে টাকা নিয়ে থাকে।
অনেক বন্ধু আরেক বন্ধু বিপদের সময় পাশ কাটিয়ে যায়। পরে মিথ্যার মাধ্যমে বন্ধুকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় হলো তার বিপদের সময় পাশে থাকবে। অনেকে আবার বিনা কারণে নানা রকম বাজে সমালোচনা করে থাকে। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যারা বিভিন্ন রকম অভিযোগ তুলেন, তারা প্রকৃত বন্ধু নয়।
তবে বন্ধু বা কল্যাণকামী ব্যক্তিটি হতে পারে যেকোনো গোত্রের বা বয়সের। বন্ধু হতে পারে পরম হিতাকাক্সিক্ষী মা-বাবা, হতে পারে ভাইবোন অথবা স্কুলের সহপাঠী ও অন্য যে কেউ। নানা কারণে বর্তমানে বিশ্বস্ততার এই জায়গাটিতে আজ বড় ধরনের চির ধরেছে। পরিণামে বন্ধু হয় শত্র“। তার পরও মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বাস্তাবিক অর্থে দু-এক দিনের পরিচয়ে কাউকে বন্ধু বলা যায়? এমন প্রশ্ন আমাদের সবার। সুখে অসুখে, কষ্টে, সফলতায় ব্যর্থতায়, আনন্দ-নিরানন্দে যাকে পাশে পাওয়া যায় সেই প্রকৃত বন্ধু। সাম্প্রতিক সময়ে পত্র-পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় বন্ধুর হাতে আরেক বন্ধু খুন। এ ধরনের ঘটনা আমাদের কারো কাম্য নয়, তবু অহরহ এ ধরনের ঘটনা। এতে আঁতকে উঠতে হয় আমাদের। তার পরও পৃথিবীর সৃষ্টিকাল থেকে শুরু করে মানুষের জন্য বন্ধুর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বন্ধু প্রতিটি মানুষের জীবনের একান্ত অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে আদিকাল থেকে। আমাদের জীবনে এমন সব ঘটনা যা কারো না কারো কাছে শেয়ার করা যায়। নিজের একান্ত কথাগুলো যাকে নিঃসঙ্কোচে বলা যায় সেই হতে পারে বন্ধু। শুধু তা-ই নয়, জীবনে ছোট-বড় যত ঘটনাই ঘটুক না কেন, যার কাছে বলার পর নিজেকে অনেক হালকা লাগে এমন ব্যক্তিটিও হতে পারে বন্ধুর মতো। আগেই বলা হয়েছেÑ সে বন্ধুটি হতে পারে পরিবারের কোনো সদস্য। জীবন চলার পথে উত্তম একজন বন্ধু হতে পারে পথপ্রদর্শক। বন্ধু সম্পর্কটিতে থাকবে না কোনো চাওয়া পাওয়া। থাকবে না লাভ-ক্ষতির কোনো হিসাব-নিকাশ, বন্ধুর প্রতি থাকবে অফুরন্ত ভালোবাসা ও সম্পীতির এক বন্ধন। বরং সব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে একে অন্যের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে, তবেই হবে প্রকৃত বন্ধুর পরিচয়। আর এমন বন্ধু পরিচয়দানকারী ব্যক্তিটি মহান সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে পাবেন পরকালের জন্য সুসংবাদ। আমাদের চার পাশে রয়েছে অসংখ্য মানুষ। তাদের ভালো আচরণ বা ভালো কথা হতে পারে বন্ধুতুল্য। কারণ আমরা জানি একজন প্রকৃত বন্ধু কখনোই আরেক জন বন্ধুর ক্ষতি হোকÑ এটা চাইবে না। সবসময় তার জন্য ভাল কিছু প্রত্যাশা করবে। এমনটাই প্রত্যাশা আমাদের সবার।
এ বছর ৬ আগস্ট রোববার আন্তর্জাতিক বন্ধু দিবস পালিত হচ্ছে। প্রতি বছর আগস্টের প্রথম রোববার সারা বিশ্বে বন্ধু দিবস পালিত হয়ে আসছে। আমাদের দেশেও এখন বন্ধু দিবস পালন হয়। কিন্তু কিভাবে এলো এই বন্ধু দিবস? ১৯৩৫ সাল থেকেই বন্ধু দিবস পালনের প্রথা চলে আসছে আমেরিকায়। জানা যায়, ১৯৩৫ সালে আমেরিকা সরকার এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। দিনটি ছিল আগস্টের প্রথম শনিবার। তার প্রতিবাদে পরদিন ওই ব্যক্তির বন্ধুটি আত্মহত্যার করেন। এর পরই জীবনের নানা ক্ষেত্রে বন্ধুদের অবদান আর তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর লক্ষ্যেই আমেরিকার কংগ্রেসে ১৯৩৫ সালে আগস্টের প্রথম রোববার বন্ধু দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। সারা পৃথিবীতে দিবসটি নিয়ে মাতামাতি হলেও অনেক দেশ রয়েছে যেখানে বন্ধু দিবস হিসেবে কোনো আলাদা দিবস পালিত হয় না। দিবস পালন হোক বা না হোক, বন্ধুত্বের বন্ধন আরো সুদৃঢ় হোকÑ এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.