অপরূপ তৈদু ছড়া
অপরূপ তৈদু ছড়া

অপরূপ তৈদু ছড়া

মো: জাভেদ হাকিম

তৈদু ছড়া আশ্চর্য রকম সুন্দর এক জলপ্রপাতের নাম। অদ্ভুত তৈদু ছড়ার সৌন্দর্য বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই ভ্রমণপিপাসু মন উদগ্রীব হয়ে ওঠে। পাহাড়, টিলা, জঙ্গল, ঝিরি পথ ধরে আসা-যাওয়া প্রায় বিশ কিলোমিটার। তাই দুই দিনের ছুটি একত্রে দরকার। বিশেষ কারণে হঠাৎ অনাকাক্সিক্ষত দীর্ঘ এক ছুটিতে ‘দে-ছুটের’ অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় সাথীদের নিয়ে ছুট দিলাম পাহাড় অরণ্য ঘেরা জেলা খাগড়াছড়ির পথে।

রাত ১১টায় গাবতলী হতে শান্তি পরিবহনে চেপে বসলাম। পরদিন সকালে ছড়ার অভিযানে বের হয়ে পড়ি। মাইক্রো চলছে দীঘিনালার পোমাং পাড়ার দিকে। একটা সময় গাড়ি আর এগোল না। প্রয়োজনীয় রসদ, পানি, শুকনা খাবার নিয়ে হাঁটা শুরু হলো। যাচ্ছি তো যাচ্ছি জলপ্রপাতের দেখা নেই। সমতল পাহাড়, অরণ্য, জুম ক্ষেতের বুকচিরে এগিয়ে চলছি, মাঝে মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে দুই-চারজন স্থানীয়দের সাথে সাক্ষাৎ হচ্ছে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জুম চাষের অপরূপ দৃশ্য, সবুজে মোড়ানো চার পাশ আমাদের পথ চলার শক্তি জুগিয়েছে। অতঃপর দৃষ্টির গোচরে এলো পাহাড়ের ওপর বসতঘর। পাহাড় বেয়ে ওপরে উঠলাম। এখানে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বসবাস, সাইনবোর্ড ঝুলছে বুদ্ধুমা পাড়া। সৌহার্দ্যপূর্ণ মানসিকতাসম্পন্ন এই স্থানীয়দের সাথে কথা বলে তৈদু যাওয়ার সঠিক পথ জেনে নিলাম। তারাই ১২-১৩ বছর বয়সের দু’জন গাইড ১০০ টাকায় ঠিক করে দিলেন। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আবার হাঁটা শুরু।

এবার ‘তৈদু’ ছাড়া যাওয়ার সবচেয়ে বেশি রহস্যময় পথচলা শুরু। জলপ্রপাতের পানি দিয়ে সৃষ্ট বোয়ালখালী ছড়া দিয়ে যাচ্ছি। দুই পাশে পাথুরে পাহাড়ের গভীর জঙ্গল, পায়ের নিচে ছোট বড় কঙ্কর। কখনো হাঁটু কখনো বা বুকসমান ঠাণ্ডা শীতল পানি কেটে চলছি। বড় বড় বলাকৃতির পাথরগুলো যেন একেকটি রহস্য। ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সঙ্ঘের সবচেয়ে সাহসী সদস্যরাও মনে হচ্ছে আজ কেমন যেন ভীত! প্রায় এক ঘণ্টা হলো হাঁটছি, জলপ্রপাতের রিমঝিম শব্দ তো দূরে থাক, শীতল আবেশও পাচ্ছি না। গাইডদের জিজ্ঞাসা করলাম আর কত দূর? বলল, এই তো সামনে। সামনে তো আর ফুরায় না। ইতোমধ্যে পিচ্ছিল পথে সবাই কমবেশি পিছলে পড়ে গেলাম। শরীরের সব শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। তার মধ্যেও চিংড়ি ধরল কেউ কেউ।

এবার দৃষ্টির সীমানায় এলো হাতি। বিশাল দেহ শীতল করার জন্য ডুব দিয়ে আছে। কিন্তু ভুল ভাঙল আসলে ওগুলো হাতি না, হাতির আদলে কালো পাথর। প্রকৃতির কী অদ্ভুত সৃষ্টি! আরো কিছুক্ষণ হাঁটার পর কানে ভেসে এলো পানি পড়ার শব্দ। হিম হিম ঠাণ্ডা অনুভূত হলো। ১০ মিনিট হাঁটার পর চোখ আটকাল।

অবাক বিস্ময়ে দেখছি এ কোন জগৎ? এটা কি আমার বাংলাদেশ, না অন্য কোথাও? ৬০-৭০ ফুট ওপর থেকে অবিরাম ধারায় গড়িয়ে পড়া জলরাশি দেখে আমরা মুগ্ধ। নিমেষেই মিলিয়ে গেল সব ক্লান্তি। নব উদ্যমে পানিতে নেমে পড়ি। ইতোমধ্যে চিংড়ির বারবিকিউ পরম স্বাদে খাওয়া হলো। শরীর এখন পুরোপুরি ফিট। দেখতে হবে দ্বিতীয় ঝরনাটি। গাইড নিজেই যেখানে যেতে পারেননি। ‘দে-ছুট’ মানেই হলো অ্যাডভেঞ্চার। অদেখাকে দেখার জয়, সুতরাং আবারও ঘণ্টাখানেকের পথ পরিক্রমা।

লাঠি, বাঁশে ভর করে গুহা, পাহাড়, জঙ্গল ঝিরির পিচ্ছিল পাথর মাড়িয়ে অগ্রসর হচ্ছি। কে যে কতবার পড়েছি বলতে পারব না। এই মৃত্যু উপত্যকায় শুধুই আমরা, আর ভ্রমণের আনন্দ ঠিক এখানেই। মৃত্যু উপত্যকা বলতে বুঝিয়েছি একটু বেখেয়াল হলেই চরম দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। ভ্রমণের অপূর্ণতাও থাকা ঠিক নয়। জঙ্গলে হয়ে থাকা ভুট্টা, মারফা, শসা আর নাম না জানা ফল খেয়ে ক্ষুধার জ্বালা মিটালাম। পিপাসা নিবারণে ঝিরির পানি অতুলনীয়। দূর থেকে ঝরনার পানির কলকল শব্দ কানে ভেসে এলো। সবাই চিৎকার দিয়ে উঠলাম, পেয়ে গেছি, পেয়ে গেছি।

তৈদু ছড়া কী অপূর্ব সুন্দর! প্রায় ৩০০ ফুট ওপর থেকে বিশাল জলরাশি বেয়ে পড়ছে। অবাক বিস্ময়ে দুই চোখ অপলক হয়ে রইল। পর্যটকদের জন্য রয়েছে অপার সৌন্দর্যের হাতছানি। তৈদু ছড়ার প্রথম ঝরনাটির চেয়ে বহু গুণে বেশি নয়নাভিরাম দ্বিতীয়টি। এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা লিখে বোঝানো সম্ভব না। মন মাতানো ঝরনার রূপে মুগ্ধ হয়ে সময়জ্ঞান ভুলে দীর্ঘক্ষণ ভিজলাম। প্রাকৃতিকভাবেই বসার বেঞ্চের মতো পাহাড়ের গায়ে খাঁচ কাটা রয়েছে। ততটা পিচ্ছিলও নয়। হঠাৎ টনক ফিরল যখন গাইডদের হদিস পেলাম না। ঘড়ির কাঁটা তখন ৪টা। কিন্তু গভীর অরণ্যঘেরা হওয়ায় যেন সন্ধ্যা। বিদায় নৈসর্গের রানী তৈদু, রোমাঞ্চকর জলপ্রপাত তৈদু।

খাগড়াছড়ি ভ্রমণে আরো যা দেখবেন- আলুটিলা গুহা, রি-সাং ঝরনা, দেবতার পুকুর এবং শান্তিপুর অরণ্য কুটির।

ছবি : ‘দে-ছুট’ ভ্রমণ সংঘ ও সামির মল্লিক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.