ভয়কে করতে হবে জয়
ভয়কে করতে হবে জয়

ভয়কে করুন জয়

তাজওয়ার তাহমীদ

ভয় পায় না এমন মানুষ পৃথিবীতে পাওয়া যাবে না। কারো মানুষে ভয়, কারো বিড়ালে ভয়, কারো মাকড়সায় ভয়, কারো মৃত্যু ভয়, কারো রোগের ভয়, কারো বিবাহে ভয়, কারো স্ত্রীকে ভয়, কারো স্বামীকে ভয়, কারো ঝড়ের ভয়, কারো ডাক্তারে ভয়, কারো অন্ধকারে ভয়, কারো চোর-ডাকাতের ভয়, কারো স্কুলের ভয়, কারো সমুদ্র ভয়, কারো শব্দ ভয়, কারো ক্যান্সার ভয়, কারো যক্ষ্মা রোগে ভয়, কারো এইডসে ভয়, কারো চর্মরোগে ভয়, কারো জনতা ভয়, কারো কথা বলতে ভয়, কারো ১৩ সংখ্যার ভয়, কারো অজানা ভয় ইত্যাদি ভয়ের শতাধিক ধরন রয়েছে।

ভয়কে প্রধানত তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। যেমন- সাধারণ ভয় বা স্পেসিফিক ফোবিয়া, সোস্যাল ফোবিয়া বা সামাজিক ভয় এবং খোলা জায়গার ভয় বা এগোরা ফোবিয়া।

সাধারণ ভয় বা স্পেসিফিক ফোবিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। যেমন কেউ কুকুরকে ভয় পায়, কেউ আরশোলাকে ভয় পায়, কেউ চোর-ডাকাতকে ভয় পায়, কেউ অন্ধকারে ভয় পায়, কেউ জিন-ভূতে ভয় পায় ইত্যাদি সাধারণ ভয় আমাদের সবার মধ্যেই কম বেশি বিদ্যমান।

সামাজিক ভয় বা সোস্যাল ফোবিয়ার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক কাজকর্মে অংশগ্রহণে অযথা ভীতি। সামাজিক ভয় রোগটি টিনএজের শেষের দিকে শুরু হয় (১৭-৩০ বছর)। সামাজিক কর্মকাণ্ডকে তারা এড়িয়ে চলে। বিয়ের অনুষ্ঠান, সেমিনার, বনভোজন ইত্যাদি সামাজিক প্রোগ্রামে তারা অংশগ্রহণ করতে চায় না। ‘পাছে লোকে কিছু বলে’ এ ধরনের ভয় তাদের মধ্যে কাজ করে। একা একা বন্ধুবান্ধবহীন থাকতে তারা ভালোবাসে।

এগোরা ফোবিয়ার রয়েছে আরো দুটি প্রতিশব্দ কেনোফোবিয়া ও সেনোফোবিয়া। এরা খোলা জায়গায় যাওয়ায় অহেতুক ভয় পায়। তারা মসজিদ, মন্দির বা উপাসনালয়ে যেতে ভয় পায়। রাজনৈতিক মিটিং মিছিলের ধারেকাছেও তারা যেতে চায় না। ভয়ের কারণে তারা ঘর থেকে বের হতে চায় না। ভয়ের কারণে তারা কোনো সুপার মার্কেটেও যেতে পারে না। ট্রেন-বাসেও তাদের ভয়। তারা যদি বাইরে বের হয় তবে তাদের সাথে কাউকে থাকতে হবে। তারা ঘরে আবদ্ধ থাকতে পছন্দ করে।

সাধারণ ভয় সৃষ্টি হয় সামাজিক পরিবেশের কারণে। যে শিশুটি তেলাপোকা ধরতে চায়, সে শিশুটিকে মা ভয় করতে শেখায়। শিশুর এ ভয় বড় হয়েও অব্যাহত থাকে। ভূত বলে কোনো জিনিস নেই। তার পরও মা শিশুকে ভূতের ভয় দেখায়। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষাভীতি একটি বড় ধরনের সামাজিক সমস্যা। কারণ মা-বাবা এবং শিক্ষক সবাই মিলে তাকে পরীক্ষার ভয় দেখিয়ে থাকেন। ফলে অনেক ছাত্রছাত্রী জানা বিষয় পরীক্ষার কেন্দ্রে ভুলে যায়। অনেকের শরীরে কোনো রোগ নেই, তারপরও সে ভাবে তার শরীরে অনেক রোগ রয়েছে, যাকে আমরা বলে থাকি হাইপোকনড্রিয়াসিস।

এ ধরনের ভয়ের জন্য ভয় করার বস্তুটি সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দিয়ে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব, যাকে বলা হয় Desensitization বা উদ্দীপকটির ব্যাপারে সংবেদনশীলতা কমানো। যেমন- ভূতের ভয়। শিশুকে প্রথম থেকেই জানাতে হবে যে, ভূত বলে কোনো জিনিস নেই। কোনো অদৃশ্য বস্তু বা জিন-শয়তান মানুষের কখনো কখনো ক্ষতির চেষ্টা করতে পারে। এ জন্য মুসলিম শিশু-কিশোর-যুবকেরা কুরআনের সূরা ফালাক ও নাস সকাল-সন্ধ্যা পড়লে কোনো জিন-শয়তান মানুষের ক্ষতি করতে পারে না।

আরেকটি ভয়, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে তা হচ্ছে, রোগের ভয় বা নসোফোবিয়া। রোগকে ভয় করে না এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। অথচ মহানবী সা: বলেছেন, ‘আল্লাহ মুমিন বান্দার রোগকে তার গুনাহগুলোর কাফফারা ও অনুশোচনাস্বরূপ গ্রহণ করেন।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমাদের দেহে যেসব অসুখ-বিসুখ হয় তার বিনিময়ে আল্লাহ তোমাদের গুনাহ ক্ষমা করেন।’ অবশ্যই মুমিন ব্যক্তির জন্য এটা সুসংবাদ। তাই রোগকে যারা গুনাহ মাফের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করবে, তাদের মনে রোগ সম্পর্কে কোনো ভীতি তৈরি হবে না।

সমাজে অশুভ লক্ষণ নামক অনেক ভীতি রয়েছে। যেমন- পেঁচার ডাক। অনেকেই পেঁচার ডাক শুনে বিপদের আশঙ্কা করেন। অথচ মহানবী সা: বলেছেন, ‘পেঁচার ডাকে অশুভ কিছুু নেই’। আরেক বর্ণনায় রয়েছে, নবী সা: বলেছেন, ‘অশুভ লক্ষণ বলতে কিছু নেই।’

ভয় পায় যারা তাদের বেশির ভাগই কুসংস্কারে জড়িত। ইসলাম ধর্মে ‘ভয়’ শব্দটি শুধু আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য। মুমিন ব্যক্তি শুধু আল্লাহকেই ভয় পাওয়ার যোগ্য মনে করে। যারা আল্লাহকে অভিভাবক বা ইলাহ হিসেবে মেনে নেয়, তাদের কোনো কিছুকে ভয় করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। মৃত্যু ভয়, কবরের ভয়, দোজখের ভয় ইত্যাদি কখনো মুমিনের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। আল্লাহর আদেশ-নিষেধের অধীনে যার জীবন পরিচালিত হয় তার মনে কোনো ভয় দানা বাঁধতে পারে না। ভয় হচ্ছে মানুষকে বিভ্রান্ত করার শয়তানি হাতিয়ার। সুতরাং ‘ভয়’ থেকে সাবধান।

এই ‘ভয়’ আবার মানুষের জন্য পরীক্ষা। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি তোমাদের পরীক্ষা নেবো ভয়ভীতি, ক্ষুধা-অনাহার দিয়ে এবং অর্থসম্পদ, জানমাল ও ফল-ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে। তবে সুসংবাদ দাও ‘সবর’ অবলম্বনকারীদের, যারা বিপদ-মুসিবতে আক্রান্ত হলে বলে, ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন, অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই কাছে ফিরে যাব (সূরা বাকারা : ১৫৫-১৫৬)।

মহানবী সা: বলেছেন, ‘ঈমানদার পুরুষ ও নারীর জানমাল ও পরিবার-পরিজনের ওপর বালা-মুসিবত লেগেই থাকে। অতঃপর সে মহামহিম আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করে যে, তার কোনো গুনাহই অবশিষ্ট থাকে না।’ বিপদ মুক্তির জন্য পবিত্র কুরআনের ভাষ্য হচ্ছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে তিনি তার জন্য মুক্তির একটি ব্যবস্থা করে দেন’ (সূরা আত-তালাক : ২)।

বিপদকে আবার মানুষের কৃতকর্মের ফলাফলও বলা হয়েছে। ‘মানুষের কৃতকর্মের জন্য জলে-স্থলে বিপদ ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করানো হয়, যেন তারা পথে ফিরে আসে’ (সূরা রুম : ৪১)।

অন্য দিকে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের জীবনে যে বিপদ-মুসিবত আসে, তা সংঘটিত করার আগেই লিপিবদ্ধ থাকে একটি কিতাবে (অর্থাৎ ভাগ্যলিপিতে), এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ কাজ’ (সূরা আল-হাদিদ : ২২)।

তাই বিপদ-আপদে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আল্লাহ বলেছেন, ‘নিঃসন্দেহে যারা বলেছে, আল্লাহই আমাদের রব, পরে তার ওপর অবিচল থাকে, তাদের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না’ (সূরা আল-আহকাফ : ১৩)।

মুমিন ব্যক্তির জীবনে তাই হতাশার কোনো স্থান নেই। তিনি সবসময় বিশ্বাস করবেন, ‘আল্লাহই আমাদের অভিভাবক এবং তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী’ (সূরা আল-ইমরান : ১৫০)।

তা ছাড়া কখনো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে মুমিন ব্যক্তি হতাশ না হয়ে বলবে, ‘ক্বাদ্দারাল্লাহু ওমা শা-আ ফাআল’, অর্থাৎ আল্লাহ ভাগ্য নির্ধারিত করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন তা করেছেন।
তাই ‘ভয়’ মুমিনের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। ভয় থেকেই হতাশার জন্ম। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার পেছনেও থাকে ভয়। ভয় মানুষের জীবনে নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। ভয়ের কারণে অনেক রোগেরও সৃষ্টি হয়ে থাকে। জীবনকে প্রশান্তময় করতে হলে ‘ভয়’ ভাইরাস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে হবে।

লেখক : দি স্কুল অব ইসলামিক সাইকোথেরাপি সেন্টার। ফোন : ০১৫৫৬৬৩১৯৬৫।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.