কাপন পরা মারা যাওয়া সাপে কাটা নারী ময়না রবিদাস
কাপন পরা মারা যাওয়া সাপে কাটা নারী ময়না রবিদাস

মৃত নারীকে বাঁচাতে ওঝার তেলেসমাতি

ময়নুল হক পবন,কুলাউড়া (মৌলভীবাজার)

মৃত নারীকে বাঁচাতে তেলেসমাতি শুরু করেছেন এক ওঝা। কাফন পরা লাশ ঘরে রেখে তিনদিন থেকে তাতে ঝাড়ফুক দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তার বিশ্বাস ঝাড়ফুকে বেচেঁ ওঠবেন মৃত ময়না। 

ঘটনাটি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় গাজিপুরে চা বাগানে।

সাপে কাটা মহিলার ছেলে প্রদীপ রবিদাস সহ চা শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, গত রবিবার সকাল ৯ টায় গাজিপুর চা বাগানের চা পাতা তুলার সময় বাগানের ৪ নং সেকশনে সাপে কামড় দেয় চা শ্রমিক মৃত বসন্ত রবি দাসের স্ত্রী ময়না রবি দাস(৪৫)কে।

এসময় সাথে থাকা শ্রমিকরা তাকে গাজিপুর চা বাগান হাসপাতালে নিয়ে আসেন চিকিৎসার জন্য। এসময় চিকিৎসা করেন বাগান হাসপাতালের সহ মেডিকেল অফিসার অরবিন্দু পাল। তিনি কুলাউড়া কিংবা মৌলভীবাজার সরকারী হাসপাতালে রেফার না করে রেফার করেন ব্রাম্মনবাজারস্থ খ্রীষ্টান মিশনারীজ পরিচালিত হাসপাতালে। সেখানে মিশন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যথাযথ চিকিৎসা না করে সাপে কাটার স্থানে একটি পাথর লাগিয়ে রাখে।

এসময় সাপে কাটা মহিলার ছেলে প্রদীপ ও মেয়ের জামাই চন্দন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য মৌলভীবাজার কিংবা সিলেট সরকারী হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলে মিশন হাসপাতালের চিকিৎসকরা রোগীকে নিয়ে যেতে আপত্তি করেন। তারা বলেন,এখানে রোগী ভাল হবে।

পরে মঙ্গলবার দুপুর ১২ টায় মহিলাকে মৃত ঘোষনা করলেও রোগীর ডেড সার্টিফিকেট দিতে অপরাগতা প্রকাশ করে মিশন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা কুলাউড়া সদর হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ডেড সার্টিফিকেট নেওয়ার পরামর্শ প্রদান করে।

এদিকে বাগানের সহ মেডিকেল অফিসার অরবিন্দু পালের গাফলতিতে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কুলাউড়া ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার রাম বিলাস দুষাদ নানকাসহ বাগানের শত শত চা শ্রমিক। তারা বলেন, বাগানের কম্পাউন্টার কুলাউড়া কিংবা মৌলভীবাজার সরকারী মেডিকেলে না নিয়ে স্থানীয় মিশন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ফলে রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার মৃত মহিলার লাশ গাজিপুর নিজ বাড়িতে এনে অন্ত্রষ্ট্রিক্রীয়া সম্পনের আয়োজন করে নিহতের পরিবার ও পঞ্চায়েত। এসময় চা শ্রমিক ও নিহতের স্বজনরা সুচিকিৎসা হয়নি দাবী করে সাপে কাটা রোগীর জন্য কুলাউড়ার টাট্রিউলি গ্রামের আব্দুল করিম খান নামে এক ওজাকে ঝাড় ফুক করাতে নিয়ে আসেন।
সরজেমিনে মঙ্গলবার রাত ১০ টা থেকে রাত ১২ পর্যন্ত গাজিপুর চা বাগানে নিহত মহিলার বাড়ীতে অবস্থান করে দেখা যায়,ওজা করিম খান তার আরও কয়েকজন সঙ্গী নিয়ে ঢুল,বাজনা,কর্তাল বাজিয়ে এবং লাল কাপড় দিয়ে সাপে কাটা রোগীর চারপাশ ঘুরে ঘুরে ঝাড় ফুক করছে।

কাপনের কাপড়ের ওপর গলা থেকে বুক পর্যন্ত গামছা দিয়ে ঢেকে তার গলায় থাকা লাল টুল কাপড় দিয়ে বাতাস করছেন। কিছু সময় পর পর মাথায় হাত দিয়ে এবং ডাক্তারী যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা করে পেসার আছে বলে উৎসুক জনতাকে রোগীনি বেঁচে বলে আশ্বাস দিতে থাকেন। এ খবরে গাজিপুর চাবাগান এবং বস্তির হাজার হাজার লোকজন ভীড় করতে দেখা যায়।
এব্যাপারে ওজা করিম খান নিজেকে অভিজ্ঞ দাবী করে বলেন, কতসময় লাগবে জানিনা। তবে মহিলা এখনো জীবিত। আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি। বাকি আল্লাহর ইচ্ছা।
নিহতের পরিবার বাগান কম্পাউন্ডার অরবিন্দু পালের উচ্ছা অনুযায়ী মহিলার চিকিৎসা কাজ হয়েছে এবং সুচিকিৎসা না পেয়ে তার মৃত্যু দাবী করলেও দায় এড়িয়ে গাজিপুর চা বাগান হাসপাতালের সহ মেডিকেল অফিসার অরবিন্দু পাল জানান, মিশনে সাপে কাটা অনেক রোগী ভাল হওয়ার কারনে আমরা ময়না রবিদাসকে মিশনে রেফার করি। এসময় তিনি রেফারের কোন কাগজ নেই বলে জানান।
এব্যাপারে কুলাউড়া হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা: জাকির হোসেন জানান,সাপে কাটা রোগীর যথাযথ চিকিৎসা এখন সরকারী মেডিকেলে রয়েছে। ৩ দিন সাপে কাটা রোগী মারা যাওয়ার মানে হলো যে হাসপালে চিকিৎসা হয়েছে সে প্রাইভেট মেডিকেলের গাফলতি। মৌলভীবাজারে সরকারী হাসপাতালে ফ্রি সাপে কাটা রোগীর ইনজেকশন রয়েছে। এবং বাহিরে ফার্মেসীতে ১২/১৫ শ টাকার মধ্যে ইনজেকশন পাওয়া যায়।
এব্যাপারে গাজিপুর চা বাগানের ব্যবস্থাপক কাজল মাহমুদ জানান,সাপে কাটা রোগীর মারা যাওয়ার পরও চা শ্রমিকরা ওঝা এনে ঝাড় ফুক করছে। তিনি দাবী করেন মিশন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডেড সার্টিফিকেট না দিয়ে কুলাউড়ড়া সদর হাসাপাতালে মৃতদেহ দেখিয়ে ডেড সার্টিফিকেট আনার পরামর্শ দিলেও মৃতের পরিবার কথা না শুনে ওজা এনে ঝাড় ফুক করাচ্ছে। তিনি বলেন, সাপে কাটার কোন ইনজেকশন কুলাউড়ার কোন ফার্মেসীতে পাইনি। একটি পেয়েছিলাম তাও মেয়াদ উত্তীর্ণ।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.