গত কয়েক মাস ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে ভেনিজুয়েলায়
গত কয়েক মাস ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে ভেনিজুয়েলায়

ভেনিজুয়েলায় অভ্যুত্থানচেষ্টা কেন

আলমগীর কবির

দক্ষিণ আমেরিকার তেলসমৃদ্ধ দেশ ভেনিজুয়েলায় সরকারবিরোধী আন্দোলন এবার দেশের একটি সেনা ব্যারাকে আছড়ে পড়ল। দেশটির ক্ষমতাসীন সোস্যালিস্ট পার্টি জানায়, মধ্যাঞ্চলীয় শহর ভ্যালেন্সিয়ায় সরকারবিরোধী একটি অভ্যুত্থানপ্রচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। ভেনিজুয়েলার ভ্যালেন্সিয়া শহরে ২০ বিদ্রোহী মিলে বিদ্রোহটি ঘটায়। সেনা অভ্যুত্থানচেষ্টায় মাদুরোবিরোধী বিক্ষোভকারীরাও যোগ দেয়। পাল্টা সেনা অভিযানে নিহত হয় দুই বিদ্রোহী। আহত হয় একজন। এ ছাড়া আটক করা হয় সেনাসহ সাত বিক্ষোভকারীকে। গোটা ঘটনাকে জঙ্গি হামলার সাথে তুলনা করছে ভেনিজুয়েলা সেনাবাহিনী।

দেশটির উত্তর-পশ্চিম এলাকার সেনা পোশাক পরে এই হামলা চালায় প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোবিরোধী গোষ্ঠী। হামলা রুখতে গুলি চালায় সেনাবাহিনী। বিদ্রোহীরা জলপাই রঙয়ের পোশাক পরে প্রেসিডেন্টবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে।

অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত ১০ বিদ্রোহীকে গ্রেফতারে অভিযান চালানো হচ্ছে। ওই ১০ জন অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে গেছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। তিনি বলেছেন, অস্ত্রসহ পালিয়ে যাওয়া ১০ জনকে আমরা খুঁজছি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট মাদুরো সেনাবাহিনীর প্রশংসা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ায় তাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। সেনাবাহিনী ব্যারাকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর রোববার প্রধান সড়কগুলোতে টহল জোরদার করা হয়। ব্যর্থ সেনাঅভ্যুত্থানকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং ডানপন্থীদের মদদপুষ্ট বলে অভিযোগ করেছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল জিসাস সুয়ারেজ।

তীব্র মার্কিনবিরোধী দেশ হিসেবে পরিচিত ভেনিজুয়েলা। অভিযোগ, ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনাকে খুঁচিয়ে তুলছে মার্কিন সরকার। ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি রীতিমতো উদ্বিগ্ন। ঘটনার জেরে বিভিন্ন দেশ তাদের দূতাবাসকে সতর্ক করেছে।

গত কয়েক মাস ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে ভেনিজুয়েলায়। রাজপথে চলেছে পুলিশ, সেনাবাহিনী বনাম বিদ্রোহীদের সংঘর্ষ। মৃত্যু হয়েছে ১২৫ জনের। সংবিধান পুনর্লিখন করার প্রস্তাব দিতেই নিকোলাস মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দানা বেঁধে ওঠে। পরিস্থিতি রক্তাক্ত আকার ধারণ করে। রাজধানী কারাকাস শহর সংঘর্ষের কেন্দ্রে পরিণত হয়।

এরই মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোট পান প্রেসিডেন্ট মাদুরো। যদিও এই নির্বাচনকে বৈধতা দেয়নি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সরকারবিরোধী ক্ষোভ উগরে দেয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল লুইসা ওর্তেগাকে বরখাস্ত করা হয়। তারপরই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনাব্যারাকে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠল। ওর্তেগার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি বিরোধীদের মদদ দিচ্ছেন। কিন্তু এই মদদ দেয়ার প্রশ্ন কেন উঠল, কারণ ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে মাদুরো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ভেনিজুয়েলায় মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য ও ওষুধের ব্যাপক ঘাটতির ফলে দেশটিতে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ২০০৬ সালে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ২০১২ সালে হুগো শ্যাভেজের আমলে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় দিনকে দিন তিনি ব্যর্থতার দিকেই এগোচ্ছেন। দেশটির মুদ্রাস্ফীতি এখন এতটাই খারাপ অবস্থা ধারণ করেছে, মাদুরো ক্ষমতা গ্রহণের সময় যে পরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা এক হাজার ডলার দিয়ে ক্রয় করা হতো, এখন তা মাত্র ১.৩৪ মার্কিন ডলার দিয়ে ক্রয় করা যায়। এই যখন অবস্থা, তখন সরকারের অনেক ব্যক্তিই পক্ষ ত্যাগ করে বিরোধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

২০১৫ সালে দেশটিতে পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল বিরোধী দল। কিন্তু ওই বছরই মার্চে সুপ্রিম কোর্ট একটি আদেশের মাধ্যমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে রাখে। শুধু এটা নয়, বিরোধী দলের বিজয়ের পর বেশির ভাগ কংগ্রেশনাল কার্যক্রম আদলত বন্ধ করে রাখে। আদালত থেকে বলা হয়, আইনকে অবজ্ঞা করার কারণে অধিবেশন স্থগিত রাখা হয়েছে।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান বিচারপতিরা ক্ষমতাসীন সোস্যালিস্ট পার্টি কর্তৃক নিয়োগকৃত, যারা বৈধতার নামে অবৈধ আদেশ জারি করে বিরোধী দলকে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে উপস্থিত হতে দিচ্ছে না। আদালতের আদেশকে গণতন্ত্রবিরোধী উল্লেখ করে দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য বিক্ষোভ করছে। কিন্তু এই বিক্ষোভে কর্ণপাত না করে মাদুরোর ক্ষমতাকে আরো পাকাপোক্ত এবং দীর্ঘায়িত করার লক্ষে সংবিধান পরিবর্তন করতে নতুন আইন পাস করা হয়েছে।

এ অবস্থায় বিরোধী দলগুলো সেনাবাহিনীকে মাদুরোর সমর্থন ত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ এখন মাদুরো টিকে আছেন সেনাবাহিনীর সমর্থনেই। যার ভিত তৈরি করে গেছেন তার পূর্বসূূরি হুগো শ্যাভেজ। রোববার যে বিদ্রোহের চেষ্টা হয়েছে, তাতে সেনাবাহিনীর মধ্যে ভাঙনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই ভাঙনটা কোনো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক সংবাদ নয়। পাশাপাশি বিরোধী দলকে নির্যাতন করে মাদুরোর মতো রাষ্ট্র পরিচালনাও আধুনিক বিশ্বের জন্য ভয়ঙ্কর। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.