আলজাজিরা বন্ধ করে দেয়া ইসরাইলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে
আলজাজিরা বন্ধ করে দেয়া ইসরাইলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে

আলজাজিরার ওপর ইসরাইলি খড়গ

গোলাপ মুনীর

ইসরাইলের আইনজীবীরা বলছেন, জেরুসালেমে আলজাজিরার অফিস বন্ধ করে দেয়ার যে সিদ্ধান্ত ইসরাইল নিয়েছে, সে কাজটি হবে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আর এই প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবে বেশ কিছু অফিস ও সরকারি সংস্থা। এরা এ কথা বলেছেন, আলজাজিরা অপারেশন বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারে ইসরাইলি কমিউনিকেশন মিনিস্টার আইয়ুব কারার সুদৃঢ় ঘোষণার এক দিন পর। 

আইয়ুব কারা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ২৭ জুলাইয়ের হুমকির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য, গত মাসের আল-আকসা মসজিদ কম্পাউন্ডে ফিলিস্তিনিদের প্রতিবাদ বিক্ষোভের কভারেজের কারণে নেতানিয়াহু আলজাজিরা বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেন। তিনি বলেন, কাতারভিত্তিক নেটওয়ার্ক আলজাজিরা গোটা টেম্পল মাউন্টে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিতে প্ররোচনা দিচ্ছে।

আইয়ুব কারা নেতানিয়াহুর ঘোষণায় ব্যবহৃত শব্দের মতো একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করে আলজাজিরা ইসরাইলে বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারে তার দৃঢ় অবস্থার কথা জানান। তা ছাড়া তিনি বলেছেন, ইসরাইলে কর্মরত আলজাজিরার সাংবাদিকদের মিডিয়া ক্রেডেনশিয়ালও বাতিল করা হবে, বন্ধ করে দেয়া হবে এর ক্যাবল, স্যাটেলাইট ট্র্যান্সমিশন ও স্থানীয় অফিস। তবে আনজীবীরা মনে করেন, এসব সম্পন্ন করতে কিছু আইনি পদক্ষেপের প্রয়োজন হবে। দ্বিতীয় কাজটি হবে, আলজাজিরা নেটওয়ার্ক ক্যাবল ও স্যাটেলাইট কোম্পানির মাধ্যমে আলজাজিরার অনুষ্ঠান সম্প্রচার ব্লক করে দেয়া। এর জন্যও প্রয়োজন হবে বিশেষ আইন প্রণয়ন। তবে কারা জানিয়েছেন, তিনি এ সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সাথে যোগাযোগ করেছেন, তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলা হয়নি। উল্লেখ্য, ইসরাইলে কোনো চ্যানেল চালু ও বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টি ন্যাস্ত রয়েছে ‘কাউন্সিল ফর ক্যাবল টিভি অ্যান্ড স্যাটেলাইট ব্রডকাস্টিং’-এর ওপর। ইসরাইলি দৈনিক হারেট্জ বলেছে, এখন পর্যন্ত এই কাউন্সিলকে এই প্রক্রিয়ার অংশ করা হয়নি।

এ দিকে বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠী, সাংবাদিক ও গণমাধ্যম সংগঠন জেরুসালেমে আলজাজিরার অপারেশন বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ইসরাইলের কমিউনিকেশন মিনিস্টারের এ-সংক্রান্ত ঘোষণার পর বিভিন্ন মহলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। আলজাজিরা এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেছে, এমন একটি রাষ্ট্র এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যে রাষ্ট্রটি দাবি করে ‘মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ বলে। আর আলজাজিরাকে   ‘odd and biased’ আখ্যায়িত করে ইসরাইলি কমিউনিকেশন মিনিস্টার এই সিদ্ধান্তকে ন্যায্য বলে প্রমাণ করতে চান।

এ দিকে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আলজাজিরা বন্ধ করতে চায় কেন? নেতানিয়াহু কি তার দুষ্কর্ম বিশ্ববাসীর কাছ থেকে আড়াল করে রাখতে চান, নাকি এর পেছনে তার কোনো গোপন অভিলাষ কাজ করছে? ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ইতিহাসের অধ্যাপক মার্ক লিভাইন প্রশ্ন তুলেছেন, আলজাজিরা বন্ধ করে দিয়ে ইসরাইলি সরকার শুধু ফিলিস্তিনেই দখলদারিত্ব আরো জোরদার করতে চায় না, বরং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায়ও এর দখলদারিত্ব সম্প্রসারণ করতে চায়। যেহেতু এ কাজে বাধা সৃষ্টিতে গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, তাই ইসরাইল সে দেশে আলজাজিরার কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে চায়। 

আলজাজিরা বন্ধ করে দেয়া ইসরাইলের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আলজজিরার অফিসটি অন্যান্য গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মতোই একই কমপ্লেক্সে চালু রয়েছে, যেমনটি সেখানে রয়েছে ইসরাইলের সরকারি প্রেস অফিস। আলজাজিরা নেটওয়ার্ক, বিশেষত আলজাজিরার আরব নেটওয়ার্ক ইসরাইলি সরকারকে অভূতপূর্বভাবে সুযোগ করে দিয়েছে সেই ১৯৯০-এর দশক থেকে আরব নাগরিকদের মাঝে সরকারি বার্তা পৌঁছে দেয়ার ব্যাপারে। আসলে আলজাজিরাই ইসরাইলি কর্মকর্তাদের সরকারের নানা রিপোর্ট কোনো রকম বিকৃতি ছাড়াই জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। এর মাধ্যমে ইসরাইল নিজেকে বাইরের দুনিয়ার কাছে তুলে ধরার সুযোগ পায়। আলজাজিরা ইসরাইলি কর্মকর্তা ও কমেন্টেটরদের সুযোগ দেয় তাদের বক্তব্য তুলে ধরার। এসব বক্তব্য আরব জনগোষ্ঠীর কাছে যতটুকু গ্রহণযোগ্যতা পায়, আর কোনো মাধ্যমের সূত্রে আসা বক্তব্য ততটা গ্রহণযোগ্যতা পায় না। তবে কেন ইসরাইল আলজাজিরা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলো? আসলে ফিলিস্তিনে ইসরাইলিদের পরিচালিত দমন-পীড়নের ব্যাপারে আলজাজিরার কভারেজ ইসরাইলকে ক্ষুব্ধ করে। সম্প্রতি আল-আকসায় ইসরাইল জুমার নামাজ বন্ধ করে দিলে সেখানে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দেয়। একপর্যায়ে দেখা যায়, নামাজরত এক মুসলিমকে ইসরাইলি এক সেনা লাথি মারছে। আলজাজিরা সেই চিত্র প্রচার করে এবং জানায়, ইসরাইলি সৈন্যরা বিক্ষোভকারীদের ওপর বিনা উসকানিতে হামলা চালায়। ব্যাপারটি নিয়ে আরবদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এবং একপর্যায়ে ইসরাইলি সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। আসলে আল-আকসায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিক্ষোভের কভারেজের জন্য ইসরাইল আলজাজিরার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে আলজাজিরা বন্ধের উদোগ নিয়েছে। কিন্তু মুখে বলছে, আলজাজিরা সন্ত্রাসবাদকে সহায়তা করছে, সহায়তা করছে ধর্মীয় উগ্রবাদকে। তাই এরা আলজাজিরা বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর দুঃখজনকভাবে ইসরাইল তার সহযোগী হিসেবে হাতের কাছে পেয়েছে সৌদি আরব, জর্দান, আরব আমিরাত, মিসর ও বাহরাইনকে। জর্দান ও সৌদি আরব সম্প্রতি আলজাজিরার স্থানীয় অফিস বন্ধ করে দিয়েছে। অপর দিকে এই চ্যানেল ও এর অ্যাফিলিয়েটেড সাইটগুলোও ব্লক করে দিয়েছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিসর ও বাহরাইন। তা ছাড়া সৌদি আরব নেতৃত্বাধীন যে জোট কাতারের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে, তা প্রত্যাহারের নানা শর্ত হিসেবে আলজাজিরা বন্ধ করে দেয়াও একটি শর্ত। তাই ইসরাইলি কমিউনিকেশন মিনিস্টার বলতে পারছেন, ‘আমরা এ অঞ্চলের প্রায় সব দেশই একমত যে, আলজাজিরা হচ্ছে ইসলামিক স্টেট, হামাস, হেজবুল্লাহ ও ইরানের একটি হাতিয়ার। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.