গুনাহগারের দোয়া
গুনাহগারের দোয়া

গুনাহগারের দোয়া

হামিদ মীর

আয় রব্বে আজিম, হে মহান প্রভু, সম্পদের লালসা এবং ওই লালসা থেকে সৃষ্ট অবমাননা থেকে আমাদের সবাইকে বাঁচান। আমাদের ক্ষমতাধরদের ধনসম্পত্তি তাদের হেনস্তার কারণ। হে আল্লাহ, আমাদের মতো গুনাহগারদেরকে তাদের অপদস্থতার তামাশা দেখার পরিবর্তে নিজেদের দিকে তাকানোর হিম্মত দান করুন, যাতে আমরা চিন্তা করি, আমাদের মনে ধন-সম্পত্তি বৃদ্ধির খায়েশ কেন উঁকি দেয়? এমন ধন-সম্পত্তি ও ক্ষমতার কী ফায়দা, যা জায়েজ-নাজায়েজ হওয়া নিয়ে বড় বড় প্রশ্ন দাঁড়িয়ে যায়?

একদিকে অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা আরো সম্পদ ও ক্ষমতার জন্য একে অন্যকে লাঞ্ছিত করছে, অন্য দিকে যারা অভিজাত নয়, তারাও আভিজাত্য অর্জনের জন্য পরস্পরে লড়াই করছে। আর বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা, আমাদের এ চিন্তা করার শক্তি দিন, যে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নামে আমরা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার দাবি করি, তিনি সম্পদ থেকে দূরে থাকতেন, পক্ষান্তরে আমরা সম্পদের পেছনে ছুটছি। আমাদের পেয়ারা নবী সা: ধনী নয়, বরং দরিদ্র ছিলেন। তাঁর দারিদ্র্যে রিক্ততা ও মুখাপেক্ষিতা ছিল না। ছিল শুধু সম্পদের প্রতি অমুখাপেক্ষিতা।

এ অমুখাপেক্ষিতা তাঁর এমনই বৈশিষ্ট্য ছিল, যা বড় কোনো বাদশাহরও ছিল না। হে আমাদের প্রিয় প্রভু, আমাদের এ বোধ দান করুন, ইসলাম দারিদ্র্যের মধ্যেই জন্মলাভ করেছে; একজন এতিম মিসকিনের কোলে লালিত পালিত হয়েছে। আর এ দারিদ্র্য বড় বড় ধনী ও গরিবকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। যত দিন আমাদের ক্ষমতাবান নেতৃবৃন্দ দারিদ্র্যের এ রহস্যের সাথে পরিচিত ছিলেন, ততদিন তারা বড় বড় সাম্রাজ্য ও শক্তিশালী সৈন্যদলকেও পদানত করেছেন। কিন্তু যখন তারা দারিদ্র্যের এ রহস্যকে ভুলে বিত্তবৈভবের দিকে আকৃষ্ট হয়েছেন, তখনই তাদের থেকে ওই গৌরবময় বৈশিষ্ট্য হারিয়ে গেছে, যা মুমিনের মেরাজ হতো। আফসোস, শত আফসোস। আজ বিশ্বে সর্বত্র মুসলমান লাঞ্ছিত হচ্ছে, অথচ মুসলমানদের শাসক তাদের সাহায্য করার ক্ষমতা রাখেন না, কেননা তারা নিজেরাই লাঞ্ছিত। মুসলমান ভুলে যাচ্ছে, তাদের প্রকৃত মর্যাদা তো রাসূলপ্রেম। আজ তারা নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করতেও লজ্জাবোধ করছে। প্রেম তো ওই সময় পর্যন্ত অর্থহীন হয়ে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত প্রিয়ের সব আচরণ ও চালচলনের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ না করা হবে। হে আল্লাহ, আমাদের আপনার পেয়ারা নবীর প্রতিটি আচার-আচরণ ও চালচলন বোঝার তাওফিক প্রদান করুন।

আমাদের মনে রাখা উচিত, আমাদের নবীর ওফাতের সময় তাঁর ঘরে মাত্র সাতটি দিনার ছিল। তিনি এ সাতটি দিনার গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়ার ওসিয়ত করেন এবং বলেন, ‘আমার লজ্জা হচ্ছে, ঘরে পার্থিব সম্পদ রেখে রাসূল তাঁর আল্লাহর সান্নিধ্যে যাবেন।’ হে আল্লাহ, আমরা গুনাহগার আপনার ওই রাসূলেরই অনুসারী। আমাদের অন্তরে গরিবদের জন্য ভালোবাসা ঢেলে দিন এবং আমাদের এ হিম্মত দান করুন, আমরা যেন, পার্থিব নামযশ ও প্রদর্শনীর পেছনে অর্থ খরচ না করে গরিবদের সহযোগিতা করি। আমাদের জন্য আদর্শিক চরিত্র এক কামেল ইনসান অর্থাৎ রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র ব্যক্তিত্ব রয়েছে, যাঁর নামের আলো সব তুচ্ছকে বড় করতে পারে। যিনি মুসলমানদের জন্যই শুধু রহমত নন, বরং তিনি বিশ্বজগতের জন্য রহমত। তাঁর উত্তম চরিত্র কুরআন মজিদেরই শিক্ষার বাস্তবরূপ। হে আল্লাহ, আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নত ও কুরআনি শিক্ষার সঠিক নমুনার ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন।

হে দোজাহানের পালনকর্তা, আমাদের এ বোধ দান করুন, তরবারি নয়, আমাদের পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রকৃত শক্তি ছিল তাঁর চরিত্র মাধুর্য। তিনি কুরআনের এ ফরমানের বাস্তব নমুনা ছিলেন, ‘ধর্ম গ্রহণে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই।’ রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নাজরানের খ্রিষ্টানদের সাথে যে সন্ধিচুক্তি করেছিলেন, তাতে জানের নিরাপত্তার পাশাপাশি এ প্রতিশ্র“তিও দিয়েছিলেন, তাদের ভূখণ্ড, জমিজমা ও ধন-সম্পদ দখল করা হবে না। তাদের উপাসনাগুলোও সংরক্ষণ করা হবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ক্ষমা ও উদারতা এতটাই ব্যাপক ছিল যে, বদর যুদ্ধের ৭০ জন বন্দীকে পণ নিয়ে মুক্ত করে দেয়া হয়েছিল। যে বন্দীর কাছে পণ দেয়ার মতো কিছুই ছিল না, তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি পড়াশোনা জানো? বন্দী হ্যাঁসূচক জবাব দিলে তিনি বলেছিলেন, ‘১০ জন মুসলমানকে লেখাপড়া শিখিয়ে দাও।’ শিক্ষার এতই গুরুত্ব ছিল যে, অমুসলিম বন্দী থেকে জ্ঞান অর্জনে কোনো কুণ্ঠাবোধ করেননি। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবতার এবং নারীজাতিরও কল্যাণকামী ছিলেন। তিনি কন্যা সন্তানকে জীবিত কবরস্থ করতে বাধা দিয়েছেন, মায়ের অবাধ্য হওয়াকে হারাম ঘোষণা দিয়েছেন।

নারীকে মালিকানার অধিকার ও উত্তরাধিকারের পাশাপাশি অত্যাচারী ও অপছন্দের স্বামীর মোকাবেলায় খোলা তালাক গ্রহণ ও বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকারও দিয়েছেন। তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবা নারীকে দ্বিতীয় বিবাহের অধিকার দিয়েছেন। হে আল্লাহ, আমাদেরকে নারীর সব অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধে নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে হত্যা করতে নিষেধ করেছেন।

যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধে শত্রুদের নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের হত্যা করতে আমাদের নিষেধ করেছেন, ওই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নাম জপে- এমন কিছু ব্যক্তি ইসলামের নামে মুসলমান নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের বোমা হামলায় মারা থেকে বিরত হচ্ছে না। হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান দান করুন এবং দর্পের শিকার ভ্রষ্ট মুসলমানদের অনিষ্ট থেকে মুসলমানদের নিরাপদ রাখুন। হে আল্লাহ, মুসলমানকে মুসলমানের মিথ্যা ফতোয়া ও অপবাদ থেকে হেফাজত করুন। হে আল্লাহ, মুসলমানকে মুসলমানের রক্ষক বানিয়ে দিন। অসুস্থ ও নির্যাতিত ভাইবোনকে সাহায্য করার তাওফিক দান করুন। হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমার নিজ ভাইয়ের সাহায্য করো, সে জালিম হোক বা মজলুম। হজরত আনাস রা: জিজ্ঞাসা করলেন, মজলুমের তো সাহায্য করব, কিন্তু জালেমের সাহায্য করব কিভাবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তাকে জুলুম থেকে নিবৃত্ত করো। হজরত সায়্যিদিনা আবু সাঈদ রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য বলা অনেক বড় জিহাদ।’

হে আল্লাহ, আমাদের বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত মানুষের সাহায্য করার শক্তি দিন, আর অত্যাচারী শাসকদের সামনে সত্য বলার তাওফিক দান করুন। আমাদের অন্তরে শুধু আপনার ভয় দিয়ে দিন এবং আমাদের অন্তরকে জালেমদের ভয় থেকে মুক্তি দিন। হে আল্লাহ, আমাদের মিথ্যা থেকে বাঁচান, কপটতা থেকে বাঁচান, পরনিন্দা থেকে বাঁচান, অহঙ্কার ও শ্রেষ্ঠত্বের উন্মাদনা থেকে হেফাজত করুন। হে আল্লাহ, আমাদেরকে স্বর্ণের আংটি, রূপার পাত্র ও রেশমি কাপড়ের লালসা থেকে দূরে রাখুন।

আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের সুন্দর পোশাক নয়, সুন্দর চরিত্রের শিক্ষা দিয়েছেন। পরিচ্ছন্নতাকে অর্ধেক ঈমান ঘোষণা করেছেন। হে আল্লাহ, আমাদের নিজেদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রাখার তাওফিক দান করুন। নিজেদের চারপাশের পরিবেশকেও পরিষ্কার রাখার রুচি দান করুন।

হে আল্লাহ, আমাদের পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে সাথে নিয়ে বৃক্ষরোপণ করেছেন। হে আল্লাহ, আমাদেরও বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষ সংরক্ষণের তাওফিক দান করুন।
আমাদের পেয়ারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষের পাশাপাশি পশুপাখির অধিকারের প্রতিও খেয়াল রাখতেন।

হজরত আবু হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত, নবীয়ে রহমত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, বনি ইসরাইলের এক অসচ্চরিত্রা মহিলা একটি কুকুরকে দেখতে পায়, যে পিপাসায় মরতে বসেছিল প্রায়। ওই মহিলা তার মোজায় পানি ভরে পিপাসার্ত কুকুরকে পান করায়। এর কারণে ওই মহিলা মাগফিরাত পেয়ে যায়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষার আলোকে ফকিহগণ পশু জবাই করার নিয়ম বর্ণনা করেছেন। পশুকে হেঁচড়ানো এবং এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করতে নিষেধ করেছেন।

হে আল্লাহ, আমাদের মানুষ ও পশুপাখির বদদোয়া থেকে বাঁচান। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপাদমস্তক রহমত। হে আল্লাহ, আমাদেরও আপনার নবীর পথে চলার তাওফিক দান করুন। হে প্রিয় প্রভু, আমরা বড় গুনাহগার। আমাদের মন অশান্ত। আমরা একে অন্যের কারণে ভীতসন্ত্রস্ত। হে আল্লাহ, আমাদের অন্তরে একে অন্যের প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিন। আমাদের মধ্যে উদারতা ও সহিষ্ণুতা সৃষ্টি করে দিন। হে আল্লাহ, আমাদের বিচ্ছিন্নতা থেকে বাঁচান এবং শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেকে হেফাজত করুন। হে বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা, গুনাহগারের দোয়া কবুল করুন। (আমিন)

পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং থেকে
উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
ahmadimtiajdr@gmail.com

লেখক : পাকিস্তানের জিও টিভির নির্বাহী সম্পাদক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.