সুদ সমাজ ভাঙনের হাতিয়ার

জাফর আহমাদ

লোন, ঋণ ও করজ একই অর্থবোধক বিভিন্ন ভাষার শব্দ। লোন ইংরেজি, ঋণ বাংলা ও করজ আরবি ভাষার শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে অনেকটা বলপূর্বক শব্দগুলোর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন ভাবার্থ সৃষ্টি করা হয়েছে। বর্তমানে করজ তার প্রকৃত বা স্বভাবার্থ নিয়ে অটুট থাকলেও কিন্তু ঋণ ও লোন শব্দের আসল রূপকে সুবিধাবাদী লোকেরা পরিবর্তন করে নিজেদের শোষণের হাতিয়ারের ভাবার্থে ব্যবহার করছে। লোন, ঋণ ও করজ হলো দু’টি প বা ব্যক্তির মধ্যে এমন লেনদেন হওয়া যাতে এমন শর্ত থাকে যে, ঋণ বা করজ হিসেবে যে পরিমাণ অর্থ বা দ্রব্য দেয়া হবে, সে পরিমাণ অর্থ বা দ্রব্য ঋণগ্রহীতা ঋণদাতাকে নির্দিষ্ট সময়ে ফেরত দেবে। আল কুরআন একে কল্যাণকর বা উত্তম ঋণ হিসেবে অভিহিত করেছে। যেমন-আলাহ তায়ালা বলেন : ‘তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিতে থাকো। যা কিছু ভালো ও কল্যাণ তোমরা নিজেদের জন্য অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে সঞ্চিত ও মওজুদরূপে পাবে। এটি অতীব উত্তম। আর এর শুভ প্রতিফলও খুব বড়।’ (সূরা মুজ্জাম্মিল : ২০)।
কাজেই ঋণ বা লোন কোনো খারাপ জিনিস নয় বা নিষিদ্ধ কোনো লেনদেনও নয়, যতণ এগুলো তার প্রকৃত অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু এ কল্যাণকর ও উত্তম ঋণকে সমাজের সুবিধাভোগীরাই এর সাথে অতিরিক্ত কিছু যোগ করে অকল্যাণ ও হারাম ঋণে পরিণত করেছে। প্রচলিত ব্যাংকগুলো এ অতিরিক্ত অংশকে সুদ বলে থাকে। অর্থাৎ প্রদত্ত ঋণের ওপর শর্ত হিসেবে অতিরিক্ত কিছু আদায় করা হলে তাকে সুদ বলা হয়।
ঋণদান প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালার দু’টি ওয়াদা রয়েছে। একটি হলো, তিনি এটি কয়েক গুণ বেশি করে ফিরিয়ে দেবেন। আর দ্বিতীয়টি হলো, তিনি সে জন্য নিজের তরফ থেকে অতীব উত্তম প্রতিফলও দান করবেন। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘এমন কে আছে যে আল্লাহ তায়ালাকে ঋণ দেবে, উত্তম ঋণ? যেন আল্লাহ এটি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে ফিরিয়ে দিতে পারেন এবং তার জন্য অতীব উত্তম সাওয়াব রয়েছে।’ (সূরা আল-হাদিদ : ১১)।
ঋণ ও করজ শব্দগুলো সৃষ্টিই হয়েছে সমপরিমাণ লেনদেন বুঝানোর জন্য। অতএব, প্রচলিত ব্যাংকগুলো এ পবিত্র শব্দগুলোকে তাদের ব্যাংকের সুদি লেনদেনে ব্যবহার করা ভুল ও অনৈতিক। আজো আমাদের সমাজের মানুষ করজ বলতে বুঝে কারো আপদ-বিপদে একমাত্র তার উপকারের নিমিত্তেই কোনো কিছু করজ দেয়া। আমাদের মা-বোনেরা সামান্য লবণ থেকে নিয়ে অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস প্রতিবেশীর কাছ থেকে করজ নেয় এবং যে বান্ডিল বা যে পরিমাণ গ্রহণ করে, ঠিক সে পরিমাণই ফেরত দেয়। ঋণ বা করজ এগুলোর প্রচলনই হয়েছে প্রতিবেশী প্রতিবেশীর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, প্রেমপ্রীতি ও ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় করার জন্য। ইসলামের বিধান হচ্ছে পৃথিবীর সব সম্পদের একচ্ছত্র মালিক আল্লাহ তায়ালা। পৃথিবীর মানুষ এর ট্রাস্টি মাত্র। কাজেই আল্লাহ তায়ালার এ সম্পদ হতে মানুষ সমানভাবে উপকৃত হবে। ইসলামের জন্ম পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র এর প্রতিক্রিয়ায় হয়নি, বরং ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজের স্বার্থকে একসাথে দেখে। এক দিকে ব্যক্তিকে তার সমৃদ্ধির উৎসাহ দেয়, অন্য দিকে ব্যক্তি সমাজের অংশ হিসেবে সমাজের অন্যদের সুখ ও সমৃদ্ধি সাধনের দায়িত্ব অর্পণ করেছে। আর এটিই ভ্রাতৃত্ববোধ।
রাসূল সা: বহুবার প্রতিবেশীদের সাথে সৌজন্য প্রদর্শনের ওপর গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রতিবেশীদের প্রতি দায়িত্ব সম্পর্কে এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, মাঝে মধ্যে আমার মনে হয়েছে প্রতিবেশীদের হয়তো উত্তরাধিকারকারীর মর্যাদা দেয়া হতে পারে।’ একটি সুস্থ সমাজের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো ভ্রাতৃত্ববোধ। এটি ছাড়া কখনো একটি সুস্থ সুশীলসমাজ গঠিত হতে পারে না। আর ইসলামই একমাত্র এ ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টির ল্েয যথোপযুক্ত কর্মসূচি দিয়েছে।
‘তাওহিদ’ তথা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস থেকে ভ্রাতৃত্বের মূল্যবোধ উদ্ভূত। প্রত্যেকেই এক আল্লাহ ও রাসূল সা:-এ বিশ্বাসী এবং প্রত্যেকেই এক আদম আ:-এর বংশোদ্ভূত, কাজেই ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও সৌহার্দ্য ঈমানেরই অঙ্গ। ঈমানের এই ঐক্য মানুষের পার্থিব সব কার্যকলাপকে সুসংহত করে।
কিন্তু এ বন্ধনকে ছিন্ন করার জন্য সৃষ্টি হয়েছে সুদ নামক এ জঘন্য প্রথার। যে সমাজে এ মারণব্যাধি সুদ প্রচলিত, সে সমাজের বাহ্যিক রূপ দেখে যতই সুস্থ ও সুন্দর মনে হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে কাঠ কীট কুরে কুরে সে সমাজটিকে তোষ করে দিচ্ছে। বর্তমান বিশ্বের আধুনিক রাষ্ট্রগুলো তার সাী। সেসব সমাজের মানুষগুলোর সামাজিক বন্ধন খুব নড়বড়ে। এর প্রধান কারণ হলো সুদ। সুদখোর ব্যক্তি টাকার পেছনে পাগলের মতো ছুটে ভারসাম্যহীন ব্যক্তিতে পরিণত হয়। নিজের স্বার্থপরতার মাত্রা এতটুকু বৃদ্ধি পায় যে, সে তখন পৃথিবীর কোনো কিছুই পরোয়া করে না। তার সুদখোরির কারণে একপর্যায়ে মানবিক প্রেমপ্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও সহানুভূতির মাত্রা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। তখন সে তার নিজের লোককেও চরম বিপদের সময়ে বিনা সুদে ধার দিতে কুণ্ঠাবোধ করে। সুদ তাকে এতটুকু অন্ধ করে তুলে যে, জাতীয় সামষ্টিক কল্যাণের ওপর কোন ধ্বংসকর প্রভাব পড়ল এবং কত লোক দুরবস্থার স্বীকার হলো এসব বিষয়ে তার কোনো মাথা ব্যথাই থাকে না। এ ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন : ‘যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মতো যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। তাদের এ অবস্থায় উপনীত হওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলে : ‘ব্যবসা তো সুদের মতোই’। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।’ (সূরা বাকারা-২৭৫)।
পাশ্চাত্য অর্থনীতিবিদরা তাদের গবেষণায় সুদের মারাত্মক ধ্বংসকর প্রভাব ও বিপর্যয় এবং সুদের সদূরপ্রসারী কুফল প্রত্য করে দ্বিধাহীনচিত্তে ইসলামি চিন্তাবিদদের গবেষণার স্বীকৃতি দিয়ে যাচ্ছেন। ইসলামি চিন্তাবিদরা কুরআন ও হাদিসের আলোকে সুদকে জঘন্যতম গুনাহ ও মারাত্মক তিকর কাজ ছাড়াও এর সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কুফলগুলো চিত্রায়িত করেছেন।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জু মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরো এবং দলাদলি করো না। আল্লাহ তোমাদের প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন সে কথা স্মরণ রেখো। তোমরা ছিলে পরস্পরের শত্রু। তিনি তোমাদের হৃদয়গুলো জুড়ে দিয়েছেন। ফলে তার অনুগ্রহ ও মেহেরবানিতে তোমরা ভাই ভাই হয়ে গেছো। (তোমাদের অবস্থা এমনটি হয়েছিল যে,) তোমরা একটি অগ্নিকুণ্ডের কিনারে দাঁড়িয়েছিলে। আল্লাহ সেখান থেকে তোমাদের বাঁচিয়েছেন। এভাবে আল্লাহ তাঁর নিদর্শনগুলো তোমাদের সামনে সুস্পষ্ট করে তোলেন। হয়তো এ নিদর্শনগুলোর মাধ্যমে তোমরা নিজেদের কল্যাণের সোজা পথ দেখতে পাবে।’ (সূরা আল ইমরান : ১০৩)
ইসলামের আগমনের আগে আরব অধিবাসীরা যেসব ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল, সে দিকে দৃষ্টিপাত করলে একটি বিশৃঙ্খল পরিবেশের চিত্র আমাদের সামনে ভেসে উঠবে। সামাজিক বন্ধন বলতে যা তার কিছুই সেখানে ছিল না। পারস্পরিক শত্রুতা, কথায় কথায় ঝগড়া বিবাদ এবং রাতদিন মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি ও যুদ্ধবিগ্রহের কারণে সমগ্র জাতি ধ্বংসের কবলে নিপ্তি হয়েছিল। এই আগুনে পুড়ে ভস্মীভূত হওয়া থেকে ইসলামই রা করেছিল। ইসলামের এ জীবন্ত অবদান তারা নিজ চে প্রত্য করছিল। তারা ছিল পরস্পরে রক্তপিপাসু। ইসলামের বদৌলতে তারা পরস্পর মিলে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এদের সম্পর্কে আল্লাহ স্বয়ং বলছেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল। আর যারা তাঁর সাথে আছে তারা কাফেরদের ব্যাপারে বজ্র কঠোর, নিজেরা পরস্পর দয়াপরবশ।’ (সূরা আল ফাতাহ : ১৯)। হিজরত-পরবর্তী আনসার মুহাজিরদের পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ও সহমর্মিতা পৃথিবীর ইতিহাসে উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে। জাহেলিয়াত যুগের অসংখ্য কুকাজের একটি প্রধানতম কুকাজ হলো সুদপ্রথা। ইহুদি জাতি এ সুদের প্রচলন করে তৎকালীন মানুষদের শোষণ করত। ফলে সে সমাজের অবকাঠামো ভেঙে পড়েছিল। ইসলাম এসে সুদকে নিষিদ্ধ করল এবং অনিবার্য ধ্বংসের হাত থেকে সে সমাজকে রা করল। এ সুদের কারণে সমাজ আজ আবার ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে।
আধুনিক ব্যাংকের মাধ্যমে অনেকগুলো এমন কল্যাণমূলক কাজ সংগঠিত হয়ে থাকে, যা অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব নয়। কিন্তু এসব কল্যাণ ও সুফল বিশ্বমানবতার জন্য অকল্যাণ, অন্যায়, অনিষ্ট ও বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে যে বস্তুটি তা হচ্ছে সুদ। তাই এ অনিবার্য ধ্বংস থেকে বিশ্বমানবতাকে উদ্ধার করার জন্য ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই সুদ পরিহার করতে হবে। এ জন্য তাদেরকে ইসলামের কাছে ফিরে আসতে হবে। ইসলামের কাছে কল্যাণমুখী ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সফলতাই এর উদাহরণ।
লেখক : ব্যাংকার

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.