সহি হজ পালনের পদ্ধতি

মাওলানা শামছুল ইসলাম হাকেমী

মাকলুকাতের সৃষ্টিকর্তা মহান রাব্বুল আলামিন পবিত্র হজ পালন করার জন্য যাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন তারা বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যবান ব্যক্তি এবং প্রতি বছর জিলহজ মাসে এই দাওয়াতে শরিক হতে বিশ্বের লাখ লাখ মুসলমান সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে এসে হাজির হন স্থলপথে, সমুদ্রপথ ও আকাশপথে। হজ ইসলামের মূল পাঁচটি রুকনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। হজ সব মুসলমানের জন্য ফরজ নয়। হজ ওই সব ব্যক্তির ওপর ফরজ করা হয়েছে, যাদের কাছে আল্লাহর ঘর পবিত্র মক্কা নগরীতে যাওয়া আসাসহ সেখানে অবস্থানকালে খাওয়াসহ প্রয়োজনীয় ফরজ মেটানো এবং ওই সময় নিজ পরিবারের ভরণপোষণের খরচের অর্থের ব্যবস্থা আছে তাদের ওপর হজ ফরজ করা হয়েছে। আমাদের দেশে বেশির ভাগ লোক হজ ফরজ হওয়ার পর নানা বাহানায় যেমন, ছেলে-মেয়ে ছোট, বাড়ি তৈরি করতে হবে, ছেলেকে বিয়ে করানো বা মেয়েকে বিয়ে দেয়া ইত্যাদিতে যথাসময়ে হজে না গিয়ে বৃদ্ধ বয়সে হজে যান। বৃদ্ধ বয়সে হজে গিয়ে শারীরিক কারণে হজের সব কাজ যথাযথভাবে করা সম্ভব হয় না। আবার অনেকেই সেসব বাহানার কাজ শেষ করতে গিয়ে ফরজ হজ না করে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহর রাসূল সা: বলেছেন, ‘যে ব্যক্তির ওপর হজ ফরজ হয়েছে, তিনি যদি হজ না করে মৃত্যুবরণ করেন তবে তার মৃত্যু হবে ইহুদি-নাসারার মতো, অর্থাৎ ওই ব্যক্তি মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করবে না।’ ইসলামের পাঁচটি রুকনের মধ্যে হজ বাদে অন্যান্য ফরজ কাজ যথাযথভাবে পালন করার পর শুধু হজ না করার কারণে মুসলমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে না পারায়, সেটা হবে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ও কষ্টের ব্যাপার।
হজের ফরজ তিনটি ১. ইহরাম বাঁধা, ২. জিলহজের ৯ তারিখে আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা ৩. জিলহজের ১০-১২ তারিখের মধ্যে কাবা শরিফ তাওয়াফ করা। এই তিনটি ফরজের মধ্যে যেকোনো একটি ছুটে গেলে হজ হবে না। হজব্রত পালনের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার পর মানসিক দৃঢ়তা, ধৈর্য ও সহনশীলতা এবং শৃঙ্খলাবোধ থাকা একান্ত প্রয়োজন। আল্লাহর মেহমান হিসেবে হজে যাওয়ার প্রস্তুতি ও প্রথম কাজ নিজের পাসপোর্ট তৈরি করা। যে হজ কাফেলা বা স্থানীয় মোয়াল্লিমের মাধ্যমে হজে যাবেন তার সাথে যোগাযোগ করে নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং পাসপোর্ট পাওয়ার পর যার মাধ্যমে হজে যাবেন তাকে পাসপোর্ট ও টাকা জমা দেয়ার পর সৌদি ভিসার আগে নির্ধারিত হাসপাতালে নির্দিষ্ট দিনে গিয়ে লাইন ধরে মেনিনজাইটিস টিকা নিতে হবে। টিকা নিতে যাওয়ার আগে নিজের রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করে নিতে হবে। ডায়াবেটিস রোগ ও অন্য কোনো রোগ থাকলে তার কাগজপত্রও সাথে নিয়ে যেতে হবে টিকার দিন। কোন তারিখে, কোন বিমানবন্দর থেকে, কোন সময়ে বিমান ছাড়বে তা জানানোর পর কোন সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছতে হবে বা বাসস্টেশন বা ট্রেনস্টেশনে পৌঁছতে হবে তা বুঝে নেবেন। যথাসময়ে বিমানে আরোহণের আগে মক্কা শরিফে যারা সরাসরি যাবেন, তাদের ইহরাম বাঁধতে হবে এবং নিয়ত করতে হবে ওমরাহ বা হজের এবং যেসব যাত্রী জেদ্দা থেকে সরাসরি প্রথমে মদিনা যাবেন তাদের বিমানে ওঠার আগে ইহরাম বাঁধতে হবে না। তবে মদিনা থেকে আসার সময় ইহরাম বাঁধতে হবে।
মক্কা নগরীতে পৌঁছার সময় হাজী সাহেবদের নির্দিষ্ট ঘরে (থাকার স্থানে) পৌঁছে দেবেন মোয়াল্লিমের লোকজন গাড়িতে করে। যারা মদিনায় যাবেন সরাসরি তারা মসজিদে নববীতে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় শেষে মক্কায় ফিরে আসবেন মোয়াল্লিমের গাড়িতে। যারা জেদ্দা থেকে সরাসরি মক্কায় আসবেন এবং যারা মদিনা হয়ে মক্কায় ফিরে আসবেন তাদের প্রথমে আল্লাহর ঘরের মণি পূর্ব কোণায় হাজরে আসওয়াদের কোণা থেকে বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে শুরু করে আল্লাহর ঘরের তিন দিক ঘুরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় এসে মুনাজাত করে আবার হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত ঘুরে এলে এক তাওয়াফ শেষ হবে। এভাবে সাতটি তাওয়াফ শেষ করে মাকামে ইব্রাহিমকে সামনে নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে নিজের কামনা বাসনা ব্যক্ত করে মুনাজাত করে জমজমের পানি পান করতে হবে নির্দিষ্ট দোয়া পড়ে। মনে রাখতে হবে আল্লাহর ঘর দেখা হতে তাওয়াফের মাঠ, রুকনে ইয়ামেনি হতে হাজরে আসওয়াদ পর্যন্ত মাকামে ইব্রাহিম। আল্লাহর ঘরের দরজার সামনে এবং জমজমের পানি পান করার সময় দোয়া কবুল হয়। জমজমের পানি মন ভরে পান করে সাফা মারওয়ায় সায়ি (দোড়াদৌড়ি) করতে হবে সাতবার। সাফা পাহাড় পৌঁছে আল্লাহর ঘরের দিকে মুখ করে হাত তুলে দোয়া মুনাজাত করে ওখান থেকে সায়ি শুরু করতে হবে প্রথমে এবং মারওয়া পাহাড়ে পৌঁছলে প্রথম সায়ি সম্পন্ন হবে। মারওয়া পাহাড়ে উঠে পুনরায় আল্লাহর ঘরের দিকে মুখ করে দোয়া মুনাজাত করে দ্বিতীয় সায়ি শুরু করবেন। মারওয়া পাহাড় থেকে শুরু করে সাফা পাহাড়ে এলে দ্বিতীয় সায়ি সম্পন্ন হবে। এভাবে সাতটি সায়ি সম্পন্ন করে মারওয়া পাহাড়ে গিয়ে দোয়া মুনাজাত করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে মসজিদুল হারাম এলাকা থেকে বেরিয়ে এসে চুল কেটে বা মাথা মুণ্ডন করলেই ওমরার কাজ শেষ হয়ে যাবে। তখন গোসল করে ইহরামের কাপড় বাদ দিয়ে সাধারণ পোশাক পরে হজের নির্দিষ্ট দিনের জন্য অপেক্ষা করবেন এবং দৈনিক মসজিদুল হারামে গিয়ে তাহাজ্জুদের নামাজসহ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে জামাতের সাথে। মক্কা ও মদিনায় মসজিদুল হারাম ও মসজিদুল নববীতে জামাতে নামাজ আদায় করতে হবে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত। প্রায় প্রতি ওয়াক্ত ফরজ নামাজের একটু পর মৃত ব্যক্তির জানাজা হয়। প্রতিটি জানাজার নামাজ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ, একটি জানাজার নামাজ আদায় করলে এক কিরাত সাওয়াব পাওয়া যাবে, এক কিরাত সাওয়াবের পরিমাণ ওহুদের পাহাড়সমান।
মূল হজ শুরু হবে জিলহজ মাসের ৮ তারিখ দুপুর থেকে। মিনায় পৌঁছে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে মিনা ক্যাম্পে। ৮ তারিখ শেষ রাতে বা ৯ তারিখ সকালে আরাফাতে পৌঁছে মোয়াল্লিমের তৈরী নির্দিষ্ট তাঁবুতে অবস্থান করে যথাসময়ে নামাজ, দোয়া, দরুদ ও কুরআন তিলাওয়াত করে বাদ আছর মুনাজাত করে সন্ধ্যা পর্যন্ত ওই তাঁবুতে অবস্থান করতে হবে। সূর্য ডোবার পর আরাফাত থেকে মুজদালিফার উদ্দেশে যাত্রা করতে হবে আরাফাতে মাগরিবের নামাজ না পড়ে। আরাফাত থেকে মুজদালিফায় পৌঁছতে গাড়িতে ৪-৫ থেকে ৮-১০ ঘণ্টা লাগে। যখনই মুজদালিফায় পৌঁছবে তখনই মাগরিব ও এশার নামাজ আদায় করতে হবে, সম্ভব হলে জামাতের সাথে। তাহাজ্জুদ ও ফজরের নামাজ আদায় করে সূর্য ওঠার পরপর হেঁটে মিনা ক্যাম্পের দিকে যাত্রা করতে হবে। মিনা ক্যাম্পে পৌঁছে নিজের সাথে থাকা লাগেজ ক্যাম্পে রেখে নাস্তা করে জামারাতে গিয়ে বড় শয়তান বা বড় জামারাতকে সাতটি পাথর মারার জন্য জামারাতের দিকে যাত্রা করতে হবে। মক্কায় অথবা আরাফাতে থাকাকালেই নিজের কোরবানি ও দমের জন্য টাকা সংশ্লিষ্টদের প্রদান করে কোরবানি আদায়ের ব্যবস্থা করবেন। শয়তানকে পাথর মারার পর কোরবানি হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়ার সাথে সাথে মাথার চুল কাটা বা মাথা মুণ্ডন করে গোসল করে পবিত্র হয়ে সাধারণ পোশাক পরিধান করবেন। পরের দিন দুপুরে মিনা ক্যাম্প থেকে পুনরায় জামারাতে গিয়ে প্রথমে ছোট শয়তানকে সাতটি পাথর, মেজো শয়তানকে সাতটি পাথর ও বড় শয়তানকে সাতটি পাথর মারতে হবে এবং মুনাজাত করে ক্যাম্পে ফিরে আসতে হবে। মিনা ক্যাম্পে ফেরত আসার পর মক্কার বাসায় চলে যেতে হবে। অবশ্য অনেকে নিজ দায়িত্বে পরের দিনও মিনায় অবস্থান করে তিন শয়তানকে পাথর মারার পর সন্ধ্যার আগেই মিনা ত্যাগ করে মক্কার বাসায় চলে আসেন। যারা আগের দিন মক্কায় চলে আসেন তাদেরকে ওই তৃতীয় দিন দুপুরে গিয়ে তিন শয়তানকে ২১টি পাথর মারতে হয়।
তাওয়াফ জিয়ারত হজের তৃতীয় ফরজ। তাওয়াফ জিয়ারত ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজের মধ্যে যেকোনো সময় মক্কায় এসে খানা-এ কাবা সাতবার তাওয়াফ করতে হবে। এভাবে হজের কাজ সমাপ্ত হবে। হজ শেষ হওয়ার পর যারা মদিনা যাননি তারা মদিনা যাওয়া পর্যন্ত মক্কায় অবস্থান করবেন এবং যারা ঘুরে এসেছেন তাদের ফিরতি বিমানে যাত্রা পর্যন্ত মক্কায় অবস্থান করতে হবে। এ সময় যথানিয়মে মসজিদুল হারামে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করবেন। যারা মদিনা গিয়ে আল্লাহর রাসূল সা:-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করে এসেছেন এবং মসজিদে নববীতে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করে এসেছেন তাদের এখন দেশে ফেরার অপেক্ষা। তাদের প্রতি আহ্বান, বিভিন্ন জিনিস ক্রয় করে লাগেজ বড় করে লাভ নেই। কারণ বাংলাদেশ বিমান হাতের লাগেজ বাদে মূল লাগেজ ৩০-৩৫ কেজি অতিরিক্ত হলে ওখানকার রেটে বাড়তি ওজনের ভাড়া দিতে হবে। তাই অপ্রয়োজনীয় মালামাল ক্রয় করে বিড়ম্বনার শিকার হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। যেসব হাজী সাহেবের হজের আগে মদিনায় গিয়ে রাসূল সা:-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করার সুযোগ হয়নি, তারা সফরের শেষ দিকে ৮-৯ দিন মদিনায় অবস্থান করে প্রিয় নবী সা:-এর রওজা মোবারক জিয়ারতসহ রিয়াজুল জান্নাহ বা বেহেশতের টুকরায় নামাজ আদায়, জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে জিয়ারত করাসহ মসজিদুন নববীতে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করবেন। যে ব্যক্তি বেহেশতের টুকরা বা রিয়াজুল জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং দেশে আসার পর হক, হালাল বিবেচনা করে চলবে এবং যথাযথভাবে ও সময়ে নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তায়ালা নিশ্চয় তাকে ওই জান্নাতে স্থান করে দেবেন।
পবিত্র মক্কা নগরীতে একটি ভালো কাজ করলে তার ফল পাবেন এক লাখ গুণ এবং খারাপ কাজ বা গুনাহের কাজ করলে তারও ফল পাবেন এক লাখ গুণ। পবিত্র মদিনায় মসজিদুন নববীতে একটি ভালো কাজ করলে তার ফল হবে ৫০ হাজার গুণ এবং একটি খারাপ কাজ করলে বা গুনাহের কাজ করলে তাও হবে ৫০ হাজার গুণ। সুতরাং মক্কা, মদিনার সব স্থানে সুন্দরভাবে আদব, কায়দা করে অন্যকে কষ্ট না দিয়ে বা ঝগড়াঝাটি না করে চলতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার জন্য। রাসূলের প্রদর্শিত পথে চলাই সবচেয়ে উত্তম কাজ। পবিত্র মক্কা ও মদিনা নগরীতে অনেক বিশেষ স্থান আছে যেসব স্থানে আল্লাহর কাছে দোয়া কবুল হয়। হজ যাত্রার আগে ওইসব স্থানের নাম বা স্থানগুলো চিনে নিতে পারলে মনভরে ওইসব স্থানে বসে বা দাঁড়িয়ে পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে ভালোভাবে দোয়া করতে পারবেন।
এতে আপনি নির্দোষ ও নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে যাবেন। যদি কেউ এ সুসংবাদকে বিশ্বাস না করেন তিনি মুসলমানিত্ব হারাবেন। একজন ব্যক্তি হজে গিয়ে তার ওপর অর্পিত ফরজ কাজ শেষ করেছেন তা নয় বরং তিনি আল্লাহপ্রদত্ত বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার মাধ্যমে বিভিন্ন দোয়া কবুলের স্থানে দোয়া করে নিজের ও নিজের মা-বাবাসহ আত্মীয়স্বজনের জন্য বেহেশত পাওয়ার পথ সুগম করতে পারেন। নিজের মনোবাসনা পূরণ করতে পারেন এবং জটিল রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন বিশ্বাসের মাধ্যমে।
লেখক : নির্বাহী মোয়াল্লিম

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.