পাহাড়ে যুবলীগ নেতা হত্যা
পাহাড়ে যুবলীগ নেতা হত্যা

পাহাড়ে যুবলীগ নেতা হত্যা

মনিরুজ্জামান মনির

রাঙ্গামাটিতে সম্প্রতি নিহত যুবলীগ নেতা নুরুল ইসলাম নয়নের ঘাতক তিন উপজাতি যুবকের মধ্যে বাবুরাজ চাকমা ছাড়া রনেল চাকমা ও জনেল চাকমা ধরা পড়েছে। তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, দীঘিনালার মাইনি নদী থেকে নয়নের হেলমেট ও মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। বলা যায়, হত্যার মোটিভ ছিল ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারা’- অর্থাৎ মোটরসাইকেলটি হস্তগত করে লাখখানেক টাকা পাওয়া এবং অন্যটি রাজনৈতিক মোটিভ, তথা তিন পার্বত্য জেলার বাঙালিদের শাসিয়ে দেয়া যে, পাহাড়ে মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করে বেকার বাঙালিদের জীবিকা নির্বাহ করাটা তাদের (জেএসএস ও ইউপিডিএফ) কাছে পছন্দনীয় নয়। তাই ‘বেকার বাঙালি যুবকেরা এ পেশা ছেড়ে দাও, নতুবা সমতলে চলে যাও।’ কিন্তু এবার এই হীন পরিকল্পনা সফল হয়নি। বর্তমান সরকার, জনগণ, প্রশাসন ও দেশী-বিদেশী প্রচার মাধ্যমের সতর্ক নজর থাকায় খুনিরা দ্রুত ধরা পড়েছে; হত্যার মোটিভও উদঘাটিত হয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মের নেতারা সবসময় বলে বেড়ান- ‘জীবহত্যা মহাপাপ, অহিংসা পরম ধর্ম’। কিন্তু তাদের নতুন প্রজন্ম কিভাবে এত হিংস্র হলো এবং পশুশক্তি অর্জন করল তা কল্পনাও দুঃসাধ্য। ওই ঘটনা একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অংশ (বাঙালিদের পাহাড় থেকে তাড়াতে হবে, যা উপজাতীয় উগ্র নেতাদের লক্ষ্য)। গত কয়েক বছরে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বেশ কয়েকজন বাঙালি বেকার যুবককে হত্যা করে মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের মাধ্যমে পাহাড়ি সন্ত্রাসী ও নেতারা তা কৌশলে অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন, এটা বাঙালিদের সাজানো গল্প, পাহাড়িদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। ক্ষেত্রবিশেষে জেএসএস ও ইউপিডিএফ নেতারা এ ধরনের অমানবিক ঘটনাকে গুজব বলে অভিহিত করেছেন। তাদের উৎসাহিত করেছেন আমাদের বামপন্থীসহ কিছু বুদ্ধিজীবী। সেসব ঘটনার কোনো ন্যায়বিচার হয়নি। দেশী-বিদেশী চাপের মুখে বাঙালিদের সাথে প্রশাসনের বিমাতাসুলভ আচরণ এবং প্রচারমাধ্যমের অসহযোগিতার কারণে অনেক বাঙালি খুনের ঘটনা ধামাচাপা পড়ে গেলেও যুবলীগ নেতা নয়ন হত্যাকাণ্ডটি জনগণের সতর্কতার কারণে ফাঁস হয়ে যায়। আসল খুনি ও ষড়যন্ত্রকারীরা আইনের আওতায় চলে এসেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসন তথা কাপ্তাই নৌবাহিনীর ডুবুরিদল, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের রেসকিউ সার্ভিস, দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় নিয়োজিত বীর সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবিসহ আমজনতা এ কৃতিত্বের অধিকারী বলে আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। অপর দিকে, বিএনপি এবারো আরেকটি ভুল করেছে। দলের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুুল্লাহ আল নোমানসহ বিএনপির যে টিমকে বেগম খালেদা জিয়া লংগদু পাঠাতে চেয়েছিলেন, তারা লংগদু প্রবেশ করতে এবং বাঙালিদের আবেগ-অনুভূতির সাথে একাত্মতা প্রকাশে ব্যর্থ হয়েছেন। রাঙ্গামাটি জেলা শহরে সংবাদ সম্মেলন করাই তাদের জন্য যথেষ্ট নয়। পক্ষান্তরে, লংগদুতে সন্ত্রাস ও অগ্নিসংযোগের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছেন। শান্তিবাহিনীর নেতা উষাতন তালুকদার রাঙ্গামাটির সংসদ সদস্য। উষাতনের চেয়ে দীপঙ্কর তালুকদার বাঙালিদের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য ছিলেন।

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আমাদের যেতে হবে স্বাধীনতার পরবর্তী ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলাপচারিতায় উপজাতি নেতা চারুবিকাশ চাকমা এবং এম এন লারমা কিছু দাবি পেশ করেছিলেন, যা ছিল বাংলাদেশের অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ। বঙ্গবন্ধু লারমার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে বুঝতে পেরে তাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেনÑ তোরা বেশি বাড়াবাড়ি করলে পার্বত্য চট্টগ্রামে আরো কয়েক লাখ বাঙালিকে বসতি স্থাপনের জন্য পাঠাব। তোরা সবাই বাঙালি হয়ে যা।’ কিন্তু সেদিন মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া না দিয়ে তিন পার্বত্য জেলায় সরলপ্রাণ উপজাতীয় যুবকদের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রে সংগঠিত করতে থাকেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাড়া-মহল্লায় নিরাপত্তা ও শান্তি স্থাপনের ধুয়া তুলে উপজাতীয় বেকার যুবকদের বাংলাদেশের অখণ্ডতাবিরোধী দীক্ষা দিয়ে গঠন করেন রাষ্ট্রদ্রোহী শান্তিবাহিনী বা জুম্ম লিবারেশন আর্মি (জেএলএ)। লারমা নিজেকে ‘জুম্ম জাতির জনক’ বলে দাবি করেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের নামকরণ করা হয় ‘জুম্মল্যান্ড’। এ সবই বিচ্ছিন্নতাবাদী ষড়যন্ত্রের আলামত।

শান্তিবাহিনী পাহাড়ে অশান্তির দাবানল ছড়িয়ে দেয়। তিন পার্বত্য জেলায় বাঙালি হত্যা, চাঁদাবাজি, লুটপাট, মুক্তিপণ আদায়, অগ্নিসংযোগ, প্রতিটি ঠিকাদারি ও উন্নয়ন কাজ থেকে ১০ শতাংশ চাঁদা আদায় ইত্যাদি ছিল উপজাতীয় বেকার যুবকদের আয়ের উৎস। সেই পথ ধরেই আজো পাহাড়ে চলছে বাঙালি হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন। জুম্মল্যান্ড নামে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর উপজাতীয় সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করার জন্য ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষার জন্য সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতা আজো অব্যাহত আছে। তিন যুগ ধরে শান্তিবাহিনী পাহাড়ে ৩৫ হাজার বাঙালি এবং এক হাজার ২০০ সৈনিক, পুলিশ, আনসার ও বিডিআর হত্যা করেছে। কোটি কোটি টাকার সম্পদ লুটপাট করেছে। সীমিত ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে সন্ত্রাস, যুদ্ধ ও বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা চললেও উপজাতীয় শান্তিবাহিনী ভারতীয় বিএসএফের সহযোগিতায় সীমান্ত এলাকায় ব্যাপক লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও খুন ইত্যাদি চালিয়েছে। আমাদের বীর সেনাবাহিনী তা প্রতিরোধ করলেও সন্তু লারমার তথাকথিত গেরিলাবাহিনী পাহাড়ের বাঙালিদের জানমাল ধ্বংস করার জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এমনকি বিদেশীদের অপহরণ ও মুক্তিপণ বাবদ বাঘাইছড়ি উপজেলায় সেই বাহিনী ২২ কেজি স্বর্ণ এবং এক কোটি রুপি আদায় করে ছেড়েছে, যা দিয়ে তারা অনেক অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে কথিত জুম্মল্যান্ড আন্দোলনের কাজে ব্যবহার করেছে। এম এন লারমা নিজ দলীয় বিদ্রোহীদের হাতে ব্রাশফায়ারে খুন হয়েছিলেন। এ জন্য সরকার কিংবা বাঙালিরা দায়ী নয় মোটেও। জাতীয় সংসদে এম এন লারমার নামে শোক প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যার রহস্য আজো দেশবাসীর কাছে অজানা। লারমার মৃত্যুর পরে তার ভাই সন্তু লারমাকে শান্তিবাহিনীর প্রধান করা হয়। ১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকার সন্তু লারমাকে হাতেনাতে আটক করতে পেরেছিল। সেদিন তাকে শান্তিবাহিনীর সদস্যদের সাথে নিয়ে আত্মসমর্পণে রাজি করানোর শর্তে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মুক্তির পর সন্তু লারমা আগরতলা ফিরে গিয়ে আবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং আবারো বিদ্রোহী বাহিনীর মাধ্যমে পাহাড়ে বাঙালি হত্যা শুরু করেন।

২ ডিসেম্বর ১৯৯৭ ‘শান্তিচুক্তি’ হলেও পাহাড়ে আজো শান্তি স্থাপিত হয়নি, বরং ২০ বছর ধরে জেএসএস, ইউপিডিএফ, (লারমা সংস্কারবাদী), বোরকা পার্টি, হাফপ্যান্ট পার্টি, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, হিল ওমেন্স ফেডারেশন ইত্যাদি সংগঠন পার্বত্যবাসী বাঙালিদের ওপর নানাভাবে নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। বাঙালিরা পাহাড়ে আজ ঘরের মালিক হলেও ভূমির মালিক নয়। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের বিবৃতিতে নয়ন হত্যাকাণ্ড না বলে নয়নের মৃত্যু হয়েছে বলে প্রচার করছে। তারা নয়ন হত্যার বিচার দাবি করেনি। অথচ লংগদুতে উপজাতিদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের বিচার দাবি করেছে। পার্বত্যবাসী বাঙালিদের মানবাধিকার রক্ষায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিমাতাসুলভ আচরণ করে যাচ্ছে।

এই লংগদুতেই শান্তিবাহিনী অনেক বাঙালিকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। এর বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি; কিংবা নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি পরিবারগুলোকে আজ পর্যন্ত পুনর্বাসন করা হয়নি। লংগদুর আকাশ-বাতাস, পাহাড়, অরণ্য আজো যেন বাঙালিদের অশরীরী আত্মার কান্নার জলে সিক্ত। ১৯৯৬ সালে লংগদুর শতাধিক বাঙালি কাঠুরিয়াকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছিল সন্তু লারমার সশস্ত্র বাহিনী। তার বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি। সেই বাঙালি পরিবারগুলোকে আজো পুনর্বাসন করা হয়নি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও লংগদু উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ সরকারকে শান্তিবাহিনীর বর্বর ক্যাডাররা গুলশাখালীর তেমাথায় অ্যামবুশ করে কাপুরুষের মতো হত্যা করেছে। তারও বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি। লংগদু উপজেলা পরিষদ মাঠে অর্ধশতাধিক বাঙালির গণকবর এবং উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অনেক গণকবর, শান্তিবাহিনীর গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাক্ষী। নতুন প্রজন্মের উপজাতীয় যুবকেরা হয়তো সেই ইতিহাস জানে না।
নয়ন হত্যার বিচার দাবিতে পাহাড়ের বাঙালি সংগঠনগুলো ব্যাপকভাবে প্রতিবাদ করেছে। বাঙালিদের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং গণগ্রেফতার বন্ধের জন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানিয়েছে। পক্ষান্তরে, জেএসএস এবং ইউপিডিএফ পাহাড়ে অর্ধদিবস হরতাল পালন করেছে। রামগড়ে পেট্রলবোমা হামলা হয়েছে। কিছু সন্ত্রাসী হাতেনাতে ধরা পড়ছে। দেশবাসী প্রশাসনের কাছে অনুরূপ সাহসী অভিযান ও পদক্ষেপই আশা করে।

উপজাতি বা বাঙালি যে হোক না কেন, তাদের পুনর্বাসনে আমাদের সবারই এগিয়ে আসা উচিত। লংগদুর নয়ন হত্যাকাণ্ডের শাস্তি এবং তার পরিবারের পুনর্বাসন এবং যেসব উপজাতীয় নারী-পুরুষ ঘরবাড়ি হারিয়েছেন তাদের অবিলম্বে পুনর্বাসন করা সরকারের একান্ত কর্তব্য। যে অপশক্তি পাহাড়ি বেকার যুবকদের বাঙালি হত্যায় লেলিয়ে দিয়েছে, জাতির কাছে তাদের মুখোশ তুলে ধরতে হবে।

লেখক : রাঙ্গামাটি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সম-অধিকার আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.