সাংবিধানিক সঙ্কটে ধাবিত দেশ

ড. আবদুল লতিফ মাসুম

যেকোনো বিবেচনায় সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল আদেশ একটি ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’। এই রায় নিয়ে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের অনাগত রাজনীতিতে এই রায়ের অনুরণন অনুভূত হবে দীর্ঘকাল। এই রায়ে বিচার বিভাগ তুষ্ট এ কারণে যে, অবশেষে তারা ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা’ নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখতে পেরেছে। সরকার অসন্তুষ্ট এ কারণে যে, এই রায়ের ফলে তাদের একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক পরাজয় ঘটেছে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ তথা ‘পর্যবেক্ষণ’ প্রকাশিত হওয়ার পর সরকারের অন্দরমহলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। দৃশ্যত তারা ‘সংযম’-এর ভান করলেও নেতানেত্রীর ভাষায় ‘থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে’। নাগরিকদের পক্ষ থেকে রায়ের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন প্রমাণ করে, বাংলাদেশের মানুষ অর্জিত স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের প্রতি দ্ব্যর্থহীনভাবে সঙ্কল্পবদ্ধ। প্রবীণ সাংবাদিক ও আওয়ামী লীগের একজন বড় বুদ্ধিজীবী আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রধান বিচারপ্রতি এস কে সিনহার দৃঢ়তা ও সাহসিকতাকে জাস্টিস কায়ানি এবং জাস্টিস ইব্রাহিমের সাহসিকতার সাথে তুলনা করেছেন।

যেকোনো দেশে বিচার বিভাগকে সংবিধানের ‘রক্ষক, অভিভাবক ও চূড়ান্ত বিশ্লেষক’ মনে করা হয়। বিচার বিভাগের স্বাভাবিক, ঐতিহ্যগত এবং বৈশিষ্ট্যগত ক্ষমতা রয়েছে আইন ও নির্বাহী বিভাগের যেকোনো আইন ও সিদ্ধান্তকে বাতিল, সংশোধন ও পর্যালোচনা করার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এই ক্ষমতাকে ‘বিচার বিভাগীয় সমীক্ষা’ বা জুডিশিয়াল রিভিউ বলা হয়। তবে বিচার বিভাগ এ ক্ষেত্রে ‘অবাধ স্বাধীনতা’ (Laissez Faire) ভোগ করতে পারে না। সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই বিচার বিভাগকে সীমিত থাকতে হয়। পৃথিবীর উন্নত গণতন্ত্রগুলোয় এর অব্যাহত অনুশীলন লক্ষ করা যায়। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের পিতৃভূমি ব্রিটেনে সর্বোচ্চ আদালত হিসেবে ‘প্রিভি কাউন্সিল’-এর ক্ষমতা হ্রাসমান। ১৯৯০ সালের পর সে দেশেও বিচার বিভাগীয় সমীক্ষা প্রবণতা বেড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মানবাধিকার প্রশ্নে সংসদীয় সরকারকে বিব্রত হতে হচ্ছে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসে ‘বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কথা’ সবাই বিদিত। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বিচার বিভাগীয় সমীক্ষার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক ও প্রায়োগিক। কমনওয়েলথভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর ৬৩ শতাংশ সংসদের হাতে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা নেই। সেখানে বরং ‘অ্যাডহক ট্রাইব্যুনাল’ বা ‘ডিসিপ্লিনারি কাউন্সিল’-এর মাধ্যমে বিচারক অপসারণের ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও গরিষ্ঠ বিচারকবৃন্দ ষোড়শ সংশোধনী বাতিল প্রসঙ্গে চূড়ান্ত রায় ও দীর্ঘ ‘পর্যবেক্ষণ’ বা অবজারভেশন দিয়েছেন। তারা বলেন, ‘বাংলাদেশে সংসদ নয়, সার্বভৌম হচ্ছে জনগণ আর সংবিধান।’ তারা দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘জাতীয় সংসদে কোনো আইন প্রণয়ন করলে তা পর্যালোচনা করে বাতিল করার ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের রয়েছে।... আমাদের সংবিধানে সার্বভৌম ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়নি। স্বার্থান্বেষী ও সংগঠিত গোষ্ঠীগুলো তাদের স্বার্থ আদায়ে মন্ত্রীদের অব্যাহতভাবে চাপ দিতে থাকে, যাতে আইনে তাদের স্বার্থ রক্ষা হয়।’ রায়ে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুসারে ‘সংবিধানের অভিভাবকত্ব’ বা বিচারিক পর্যালোচনার অধিকার শুধু বিচার বিভাগকে দেয়া হয়েছে, আর কাউকে নয়। সংবিধানের সাথে কোথাও অসঙ্গতি থাকলে সে আইন বাতিল হয়ে যাবে। সংবিধান সংসদকে যে ক্ষমতা দিয়েছে তারা সে সীমা লঙ্ঘন করল কি না, তা পর্যালোচনা করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টকে। কাজেই সংসদে পাস হওয়া কোনো আইন যখন বিচার বিভাগ অবৈধ ঘোষণা করে তখনো সে ‘সুপিরিয়র পাওয়ার’ চর্চা করে না, বরং সে সাংবিধানিক দায়িত্বই পালন করে থাকে। বিচার বিভাগ যদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পায়, সংবিধান সংসদকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, কোনো আইন প্রণয়নে সেই সীমা অতিক্রম হয়েছে, তবে তাকে অবৈধ বা এখতিয়ারবহির্ভূত ঘোষণা করতে পারেন সর্বোচ্চ আদালত।

সংবিধানে ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতিরা রাজনীতি, সমাজনীতি ও সংবিধানের বিভিন্ন বিষয়ে বিষদ বিশ্লেষণ করেছেন। ৭৯৯ পৃষ্ঠার সুদীর্ঘ রায়ে প্রধান বিচারপতির দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ এবং অন্য ছয়জন বিচারকের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবেদন রয়েছে। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে- জাতীয় সংসদের সার্বভৌমত্ব, সংসদ ও বিচার বিভাগের সম্পর্ক, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচন কমিশন, সেনা শাসন ও আইনের শাসনসহ আরো অনেক কিছু। তারা শুধু অন্যদের সমালোচনাই করেননি, বরং নিজেদের জবাবদিহিতার জন্য তৈরি করেছেন ৩৯ দফা আচরণবিধি। তারা ক্ষমতার পৃথকীকরণ বিষয়টির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করেছেন। বিচার বিভাগকে তারা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে স্থাপন করেননি। প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ‘বিচার বিভাগের জবাবদিহিতা আইন, সংবিধান ও জনগণের কাছে।’ একজন বিচারপতি লিখেছেন, ‘বিচারপতিরা সর্বশক্তিমান আল্লাহ, দেশের আইন, নিজের বিবেক ও জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।’ অপর দিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, ‘বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ। এ কারণে বিচারপতিরা নিজেরাই নিজেদের বিচার করবেন তা ন্যায়সঙ্গত নয়। এটা আইনের শাসনের পরিপন্থী।’ তিনি আরো বলেন, বিচারপতিদের জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহিতা থাকা উচিত। কোনো বিচারক যদি মনে করেন, তিনি জনগণের প্রতিনিধির কাছে জবাবদিহিতার তুলনায় যথেষ্ট বড় তবে তিনি বিচার বিভাগে স্বাগত নন। তার সরে যাওয়াই উচিত। সরকারের তরফ থেকে এ মত ব্যক্ত করা হয় যে, ‘বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা যদি বিচার বিভাগের হাতে দেয়া হয়, তবে বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থায় চিড় ধরবে।’ এর উত্তরে প্রধান বিচারপতি লিখেছেন, ‘এখন প্রশ্ন উঠেছে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ চর্চা কার হাতে থাকা উচিত?’। লর্ড ড্যানিংয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘কাউকে না কাউকে তো বিশ্বাস করতেই হবে, সেটি বিচারপতি হলেই ভালো।’ তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলকে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘তিনি যেন তার মক্কেলকে (সরকার) বলেন যে, তাদের ধারণা যদি এই হয়- বিচারপতিরা স্বাধীন ও স্বচ্ছ নন, তাহলে দেশে কারো প্রতিই আস্থা রাখা উচিত হবে না। উপরন্তু আমরা যদি এই যুক্তি গ্রহণ করি, তবে এ বিষয়ে বেশির ভাগ সংবিধানই এ ভুল পদ্ধতি গ্রহণ করত।’ প্রধান বিচারপতি যুক্তি প্রদর্শন করেন, সংবিধানের ৯৪(৪) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিচার পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি ও অন্য বিচারপতিরা স্বাধীন থাকবেন।’ ১১৬(ক) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচার বিভাগের নিয়োজিত সব ব্যক্তি এবং বিচার পরিচালনাকালে সব বিচারক স্বাধীনতা ভোগ করবেন। এই প্রেক্ষাপটেই বিচারপতি ও বিচার বিভাগের জবাবদিহিতার বিষয়টি দেখতে হবে। অন্য একজন বিচারপতি বিশিষ্ট আইনবিদ মো: সি উসমানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, ‘জবাবদিহিতার জন্য বিচারিক প্রতিষ্ঠানকে সহজগম্য বা অবারিত, স্বচ্ছ, ব্যয়সাশ্রয়ী ও কার্যকর রাখতে হবে। বিচারপ্রক্রিয়া বোধগম্য, জনগণের জন্য উন্মুক্ত এবং সিদ্ধান্তমুক্ত ও দ্রুত পাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিচারিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের আচরণ, কাজ, কর্মকাণ্ড, কার্যকারিতা ও সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এতে আইনের চোখে সবাই সমান এ বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে।’

পর্যবেক্ষণ মন্তব্যের একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, আদালত ও সংসদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা উচিত। লিখিত ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘আদালত কিংবা বিচারকদের উচিত নয় সংসদ সদস্য সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করা। আদালত ও সংসদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ঐক্য থাকা উচিত। একইভাবে সুপ্রিম কোর্টের কোনো মতামত সম্পর্কে সংসদের কোনো মন্তব্য করা ঠিক নয়। সংবিধানের ৭৮(২) অনুচ্ছেদ এবং সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২৭০ ও ২৭১ ধারা অনুসারে তারা এটা করতে পারেন না। এককেন্দ্রিক সরকারব্যবস্থায় ক্ষমতার চূড়ান্ত পৃথকীকরণ সম্ভব নয়। এ কারণে সংসদ ও বিচার বিভাগের উচিত মিলেমিশে কাজ করা।’ বিচারপতি সিনহা তার লিখিত বক্তব্যে আরো বলেন, ‘আইনের শাসনের অপরিহার্য দিক হচ্ছে স্বাধীন বিচার বিভাগের আওতায় কোনো বিচারপতি সরকারের কোনো বিভাগের ধারার নিচে থাকতে পারেন না। তাকে নিরপেক্ষ থাকার বর্মে সজ্জিত থাকতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সুরক্ষা এবং কেউ যাতে তা ‘অপহরণ’ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করাও সুপ্রিম কোর্টের দায়িত্ব। দেশে সর্বোচ্চ আইন তথা সংবিধানই সুপ্রিম কোর্টের কাঁধে এ দায়িত্ব অর্পণ করেছে।’ তিনি মন্তব্য করেন, গত ৪২ বছরে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখা গেছে যেভাবে সংসদ চলছে তাতে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অসম্ভব। ষোড়শ সংশোধনীতে সংসদকে বিচারপতিদের অভিশংসনের যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল তা বহাল থাকলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে। তিনি আরো যুক্তি দেখান, সুশাসন গুড গভর্ন্যান্সের জন্য ক্ষমতার পৃথকীকরণ একটি আদর্শ ধারণা। প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এমপিদের ওপর একটি ‘কঠিন লাগাম’। তাদের পক্ষে স্বাধীন মনোভাব প্রকাশ করা এক রকম অসম্ভব। প্রধান বিচারপতি আরো লিখেছেন, ষোড়শ সংশোধনী মামলার আপিলে একজন ছাড়া অন্যসব অ্যামিকাস কিউরি অভিন্ন মত প্রকাশ করেন, ‘এই সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের অভিশংসনের যে ক্ষমতা সংসদকে দেয়া হয়েছে, তা ভীষণভাবে রাজনৈতিক চরিত্র পাবে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে তা আরো বেশি দৃশ্যমান হবে।’

রাষ্ট্রের অপরিহার্য তিনটি অঙ্গ- আইন, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কে নাগরিকসাধারণ জ্ঞাত আছেন। কিন্তু উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিরোধ দেখা দিয়েছে তার কোনো সহজ-সরল সমাধান দৃশ্যমান নয়, বরং সরল বিষয়টি গরল হয়ে দাঁড়াতে পারে। সরকারি দলের কর্তাব্যক্তিরা প্রাথমিক সংযম পরিত্যাগ করে এখন স্বমূর্তি ধারণ করছেন। অর্থমন্ত্রী প্রবীণ ব্যক্তিত্বও সর্বোচ্চ আদালতকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘যতবার সংশোধনী বাতিল হবে ততবারই জাতীয় সংসদ তা পাস করবে।’ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কূটকৌশল সম্পর্কে যারা অবহিত তারা জানেন- বিষয়টি এ রকম হলেও বিস্ময়ের অবকাশ থাকবে না। যদিও ওবায়দুল কাদের তার সংযত বক্তব্যের মাধ্যমে বলেছেন- ওটি তার ব্যক্তিগত মন্তব্য। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাসিম বলেছেন, ‘আদালতের হাত এত দীর্ঘ নয় যে তা জাতীয় সংসদকে স্পর্শ করবে।’ এসব ব্যক্তিগত ক্ষোভের পর মন্ত্রিসভার সম্মিলিত ক্ষোভ ও অসন্তোষ অত্যন্ত তাৎপর্যের সাথে লক্ষণীয়। মন্ত্রিসভার বিগত বৈঠকে এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য। একই সাথে রায়ের পর্যবেক্ষণে দেয়া অনেক বক্তব্যকে ‘আপক্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন তারা। জনগণের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়ের বিষয়ও আলোচনা হয়। (অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য স্মরণীয়) প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, ‘এই কোর্ট সামরিক সরকারের শাসনামলকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সেই সামরিক সরকারের তৈরি, যা আগেই অবৈধ হয়ে গেছে। তাহলে একই কোর্ট কিভাবে সুপ্রিম সুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল করেন।’ তিনি রায়ের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের নির্দেশ দেন।’ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন তুলেছেন- ‘ওই জনমত গঠন কার বিরুদ্ধে?’ বিজ্ঞজনেরা বলছেন, আদালতের বিরুদ্ধে জনমত গঠন বিপজ্জনক হতে বাধ্য। তারা স্মরণ করিয়ে দেন, আওয়ামী লীগ বিচারকদের বিরুদ্ধে একবার ঝাঁটা মিছিল করেছিল। যা হোক মন্ত্রিসভার বৈঠকের অনির্ধারিত আলোচনায় ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে দেয়া আপত্তিকর বক্তব্য প্রত্যাহার করতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রধান বিচারপতি বরাবর লিখিত আবেদন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ সময় বিচারপতি সিনহার নিয়োগ নিয়েও আলোচনা হয়। রায়ের পরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনার জবাব দিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মন্ত্রিসভায় বলেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ে অপ্রাসঙ্গিক অনেক কিছু আনা হয়েছে। এখানে পঞ্চম ও ষষ্ঠ সংশোধনী টেনে আনা হয়েছে। এ রায়ে সংসদকে ‘ইমম্যাচিউরড’ বা অপরিপক্ব বলা হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ উল্লেখ করা হয়েছে। আইনমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে এ রায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণের যে অংশ সরকারকে সবচেয়ে বিচলিত করছে তাহলো ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না’- এ মন্তব্য। ইতোমধ্যে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের বিবরণীতে জানা যায়, এতে বলা হয়েছেÑ “জাতীয় সংসদ নির্বাচন যদি কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বাধীনভাবে নিরপেক্ষ না হয় তাহলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গ্রহণযোগ্য সংসদও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। তাই আমাদের নির্বাচনপ্রক্রিয়া এবং সংসদ ‘শিশু অবস্থায়’ রয়ে গেছে। জনগণ এ দু’টি প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা অর্জন করতে পারছে না। এ দু’টি প্রতিষ্ঠান যদি জনগণের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ থেকে বিরত থাকে, তাহলে কোনো গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হতে পারে না।” এ মন্তব্যের মাধ্যমে প্রকারান্তরে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতি হয়তো ইঙ্গিত করা হয়েছে। এটি আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তির হাতে একটি বড় ধরনের অস্ত্র তুলে দিয়েছে। বিষয়টি যথেষ্ট তড়িৎ গতিতে লুফে নিয়েছে বিএনপি। তারা বলতে চেয়েছেন যে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার হারিয়েছে। তাই ‘অকার্যকর সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের অধীনে নতুন সংসদ নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে বিএনপি।’ প্রকাশিত রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে শীর্ষ নেতারা উচ্চ আদালতে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছেন বলে সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে। উল্লেখ্য, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পর্যবেক্ষণে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা বর্তমান সংসদকে অকার্যকর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহলও মনে করেন, যেহেতু আদালত বর্তমান সংসদকে ‘ডিসফাংশনাল’ বা অকার্যকর বলেছেন, তাই এ সংসদ বহাল রাখা নৈতিকভাবে সরকারের জন্য বোঝা হিসেবেই বিরাজ করবে। তবে ক্ষমতাসীন সরকারের জন্য এ ধরনের মন্তব্য কোনো বিব্রতকর অবস্থা সৃষ্টি করবে না বলে অনেকের ধারণা। নীতি-নৈতিকতার বিষয় সরকারের অবস্থান নির্ণয় করে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, তারা ‘কানে দিয়েছেন তুলো এবং পিঠে বেঁধেছেন কুলো’। অতএব তাদের কিছুতেই কিছু হওয়ার নয়, বরং এস কে সিনহার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সামগ্রিকভাবে বিচার বিভাগের রায়কে কঠিনতা ও কুটিলতা দিয়ে মোকাবেলা করা আওয়ামী লীগের স্বাভাবিক কৌশল। প্রধানমন্ত্রী কথিত ‘জনমত গঠনের’ অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি, সরকারের নিযুক্ত আইন কমিশনের প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক। তিনি রায় সম্পর্কে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘জনগণের নয়, বিচারকের প্রজাতন্ত্রে বাস করছি।’ স্মরণ করা যেতে পারে, বিচারপতি খায়রুল হক প্রধান বিচারপতি থাকাকালে তার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ২০১১ সালের ১১ মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধানসংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সূচনা এই আদেশ থেকে। এই আদেশের ফলে সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। সরকারের পক্ষে একতরফা নির্বাচন করা সম্ভব হয়। খায়রুল হকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে একজন সাহসী ও দৃঢ়চেতা সিনহা বিচার বিভাগের জন্য আরো বাড়তি হুমকির সৃষ্টি করে গেলেন কি না তা বিচার্য বিষয়। উল্লেখ্য, এস কে সিনহা আগামী বছরের প্রথম দিকে অবসরে যাওয়ার কথা। সামনে অবকাশকালীন দীর্ঘ ছুটি রয়েছে। এরপর প্রধান বিচারপতির পক্ষে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংরক্ষণে আরো কোনো ভূমিকা নেয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

অনেক আইনজ্ঞ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে বলতে চান, মূল রায় ও পর্যবেক্ষণের মধ্যে আইনগত ও তত্ত্বগত পার্থক্য রয়েছে। রায় যেকোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সরকারের জন্য মেনে নেয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু পর্যবেক্ষণ জনমত গঠনে প্রভাব বিস্তার করে। সরকারের জন্য চাপও সৃষ্টি করে। অবশ্য দেশ-কাল-পাত্রভেদে এর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ বিভিন্ন রকম হতে পারে। একটি উন্নত গণতন্ত্রে সর্বোচ্চ আদালতে এ ধরনের পর্যবেক্ষণের পর ক্ষমতায় থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কিন্তু আমাদের বাস্তব অবস্থায় ক্ষমতা ছেড়ে দেয়াই অবাস্তব। এখন কার্যত দেশের আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। দৃশ্যত উভয় নেতৃত্ব আপসে অনড়। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যত কঠোর হবে, বিচার বিভাগীয় নেতৃত্বও ততই কঠিন হবেÑ এটাই স্বাভাবিক। এরই মধ্যে যদি আরো কোনো বিষয় রিট ও রায়ের সম্ভাবনা থাকে তাহলে সঙ্কট আরো ঘনীভূত হতে পারে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় এই যে, রায়ের বিষয়টিকে রাজনৈতিক মহল আইনগত ও নীতিগত বিষয় মনে না করে পাওয়ার পলিটিক্স বা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের হাতিয়ার হিসেবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করছে। সাংবিধানিক ও ‘ক্ষমতায় থাকা না থাকা’ প্রশ্নে সর্বোচ্চ আদালতের রায়টি দেশকে এক কঠিন সাংবিধানিক সঙ্কটের দিকে ধাবিত করছে। এ সঙ্কট উত্তরণে উভয় পক্ষের সংযম, সমঝোতা, শুভবুদ্ধি ও দূরদৃষ্টি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। সঙ্কটকালে বিপরীত বুদ্ধি বিনাশের কারণ ঘটাতে পারে। 
লেখক : সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
mal55ju@yahoo.com

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.