এই রায়ে সমাধানের পথ
এই রায়ে সমাধানের পথ

এই রায়ে সমাধানের পথ

মিনা ফারাহ

এতকাল একতরফা বিচার বিভাগের দোহাই দিয়ে সব সুবিধাই আদায় করেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু রায় প্রকাশে হঠাৎ তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠার কারণ? আইন সব দলের জন্য সমান। ১৬তম সংশোধনী বাতিলের রায়ের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ক্ষমতাসীনদের মাথার ওপর আইনের সীমারেখা এঁকে দিলেন সর্বোচ্চ আদালত। এমনকি ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক দু’টি ঘটনার উল্লেখ করে, নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের রেফারেন্সও এই রায়ে। এর মানে কি অহেতুক রক্তপাত এড়াতে পদত্যাগেই সমাধান!

রায় থেকে কয়েকটি লাইন। ‘ক্ষমতার লোভ মহামারীর মতো।... আমাদের পূর্বপুরুষেরা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিল, কোনো ক্ষমতা-দানব তৈরি করা নয়। ...আদালত লক্ষ করেছেন, প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনেই পরাজিত রাজনৈতিক দল নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে... নিরপেক্ষ ও হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন একটি সংসদ নির্বাচন না হলে গণতন্ত্র বিকশিত হতে পারে না।... ফলে নির্বাচন-প্রক্রিয়া এবং সংসদ অবিকশিতই রয়েছে। জনগণ এই দুই প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখতে পারে না। ... হাইকোর্টের রায়ের পর সুপ্রিম কোর্ট প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া থেকে লক্ষ করে যে, সংসদ সদস্যরা সংসদে ওই রায় ও বিচারকদের সমালোচনা করে আলোচনা করেন। ... অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করে বিচারকদের রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এতে প্রমাণিত হয়, আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিণত এবং পরিণতি অর্জন করতে হলে কমপক্ষে টানা চার-পাঁচ মেয়াদ সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চা করা প্রয়োজন।’ ‘ভারসাম্য আর কার্যকর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে উদ্ধত আর অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যাচ্ছে সরকার।’ ‘মানবাধিকার হুমকির মুখে, দুর্নীতি অবাধ, সংসদ অকার্যকর, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত কয়েক কোটি মানুষ এবং প্রশাসনে অব্যবস্থাপনা মারাত্মক।’

‘বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে নির্বাহীরা এখন তা খোঁড়া করে দেয়ার চেষ্টা করছে। আর সেটা হলে পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।’ ক্ষমতাসীনরা সর্বোচ্চ আদালতের দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের সারমর্ম জানে। কমপক্ষে চার-পাঁচ মেয়াদ সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার প্রয়োজনের বক্তব্য পর্যবেক্ষণে। সহজ বাংলায়, অবৈধ সংসদ ভেঙে দিয়ে বৈধ নির্বাচনের ইঙ্গিত এই রায়ে।

৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট যতটা উদ্বিগ্ন, আমজনতার বেলায় তেমন নয়। কারণ আমজনতা ভুক্তভোগী এবং স্মার্ট। জানে, ৭০ অনুচ্ছেদ তুলে নিলেও অপ্রয়োজনীয় আনুগত্যে ন্যূনতম পরিবর্তন আসবে না।
কঠোর আমিত্ববাদের সমালোচনা করে দারুণ ঝাল ঝাড়লেন আদালত। যেন জনগণের দীর্ঘ দিনের ক্ষোভের প্রতিফলন এটা।

সংসদে শেখ সেলিম, ‘সংশোধনী যতবার বাতিল হবে, ততবার পাস হবে সংসদে।’ আবুল মাল আবদুল মুহিতের মুখেও একই আদালত অবমাননা। এমনকি সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক পর্যন্ত নেমেছেন একই কাজে। তার বিচারিক ক্ষমতা সবারই জানা। এর মানে কি, আদালত অবমাননা শুধুই বিএনপি জোটের জন্য? আইন অনুযায়ী সব অবমাননাকারীকে আইনের মুখোমুখি করার কথা। সঠিক বলেছেন গয়েশ্বর রায়, এই রায়ের মাধ্যমে নৈরাজ্যের হাত থেকে মূলত কারা রক্ষা পেলেন, সেটাই পর্যবেক্ষণেÑ ‘কোনো রকমে বেঁচে আছে বিচার বিভাগ। এর বেশি হলে তলিয়ে যাবে।’

রায় পড়ে মনে হতেই পারে, ৭০ অনুচ্ছেদের সমালোচনা এবং অভিশংসনই মূল পর্যবেক্ষণ। মানুষ জানে, আসল বিতর্ক ভিন্ন। অনির্বাচিত ১৫৩ জন অভিশংসনের ক্ষমতা চান। সুতরাং এই রায়কে বলা চলে, অনেক দেরিতে হলেও ১৫তম সংশোধনীকে হাতিয়ার করা অগণতান্ত্রিক শক্তির ব্যাপারে সর্বোচ্চ আদালতের সঠিক অবস্থান। এরপর ক্ষমতাসীনদের আর ক্ষমতায় থাকা নিয়ে প্রশ্ন কিংবা নওয়াজ শরিফের রেফারেন্সই দুই বিভাগের উত্তেজনা কমাতে পারে। অতএব, মামলার মাধ্যমে নৈরাজ্যের বিষয়গুলো নিষ্পত্তির যথেষ্ট সুযোগ সৃষ্টি হলো।

আমিত্ববাদের ভয়ানক অপব্যবহার নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ। “আমাদের লোক’ এ জঘন্য নীতি থেকে আমাদের মুক্তি পেতে হবে। এ ছাড়া, ‘আমি একাই’ সব কিছু করেছি ‘আমিত্ব’র এই আত্মঘাতী পথ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ... একজন মাত্র ব্যক্তিই সবকিছু করেছে এটাই হলো এই আমিত্ব। ... আমরা একটি রোগে আক্রান্ত হয়েছি। এ রোগের নাম ‘অদূরদর্শী রাজনীতিকরণ’। এটি একটি ভাইরাস ... আমাদের নীতিনির্ধারকেরা এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে বা কল্পনা করতে পারছেন না, যে ভবিষ্যতের সাথে জড়িত রয়েছে গোটা জাতি, কোনো একজন মাত্র ব্যক্তি নন। ... জঘন্য এ রোগের কারণে তারা তাদের ক্ষুদ্র ও সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে একটি ভুয়া ও মেকি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। ... পরিত্যাগ করতে হবে ‘আমি একাই সব’ এই আত্মঘাতী নীতি।”

তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারার মামলাগুলো আমিত্ববাদের বিরুদ্ধে আদালতের পর্যবেক্ষণকেই সমর্থন করে। রায়ে বলা হয়েছে, ‘তারা জনগণের ক্ষমতায়ন করেনি। বরং তারা তাদের অবস্থানের অপব্যবহার করেছে এবং নিজেদের ক্ষমতার খেলা দীর্ঘায়িত করতে ধোঁকা দেয়ার বিভিন্ন হাতিয়ার (কখনো গণভোট, কখনো কারচুপির ভোট, আর কখনো কোনো নির্বাচনই নয়!) উপস্থাপন করেছে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনীতির ধারণা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।’


অভিশংসন শব্দটি বিশেষভাবে পরিচিত ‘ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির’ পর। বিরোধী দলের আস্তানায় গোপনে টেলিফোনে আড়িপাতা অভিশংসনযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হলে, পদত্যাগে বাধ্য হলেন নিক্সন।
ভুয়া উন্নতির বদলে প্রকৃত অর্থনৈতিক উন্নতি হলে অভিশংসনের হাত থেকেও রক্ষা হয়, প্রমাণ ‘কলিরকৃষ্ণ’ বিল ক্লিনটন। অর্থনীতিতে অভাবনীয় সাফল্যের কারণে অভিশংসনের পক্ষে যথেষ্ট ভোট মেলেনি সিনেটে।

ট্রাম্পগেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ, নির্বাচনে প্রভাব ফেলা। দু’টি তদন্ত কমিটির প্রথমটি কংগ্রেস, দ্বিতীয়টি স্পেশাল কাউন্সিল। গোপনে প্রভাব ফেলা ও অপরাধ প্রমাণিত হলে ট্রাম্পকেও নিক্সনের পথে যেতে হবে। এমনকি শুনানি থেকে রক্ষা পায়নি তার পরিবারও। তদন্তের আওতাভুক্ত, রাশিয়ার সাথে ব্যবসাসংক্রান্ত সব নথিপত্র এবং ট্যাক্স রিটার্ন। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর হওয়া সত্ত্বেও আইনের কাছে হাত-পা বাঁধা। তদন্ত কমিটির ওপর কোনো রকম প্রভাব খাটানো বেআইনি। মিডিয়ায় ট্রাম্প সমালোচনা, এমনকি বিএনপি-আওয়ামী লীগ কালচারকেও পরাজিত করেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যেন আমিত্ববাদের বিরুদ্ধে সেই সত্যই প্রতিধ্বনিত হলো।

আইন প্রণেতাদের মধ্যে যে ধরনের গুণাবলির প্রয়োজন উল্লেখ করলেন আদালত, সেই প্রমাণ দেখছি ক্যাপিটল হিলে। উদাহরণস্বরূপ, কংগ্রেসে স্বাস্থ্যবীমা পাস না হওয়ার কারণ, ৯টি ‘না’ ভোটই দলের। এমনকি, বিভিন্ন কোর্টে তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা। এই ‘আমিত্বহীন’ পার্লামেন্টের প্রেসক্রিপশনই রায়ে।

ভোটে নির্বাচিত না হওয়া সত্ত্বেও, সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্ষমতা দশম সংসদের! সংসদ সদস্যদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যে, ভুয়া গণতন্ত্র আর মেকি উন্নতির চিত্রই ফুটে উঠছে। রায়ে নওয়াজ শরিফের পর্যবেক্ষণ যেন ‘ঝি মেরে বৌকে শিক্ষা দান’।


ওয়াটারগেট, ট্রাম্পগেট এবং নওয়াজগেটের চেয়ে ঢাকাগেট কেলেঙ্কারির কম নয়। প্রথম দু’টির অভিযোগ, নির্বাচনে প্রভাব ফেলা। শেষেরটি ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম। ৫ জানুয়ারি এর কোনোটাই নয় বরং আরো সাংঘাতিক। এমনকি দলের লোকদের পর্যন্ত ভোট দিতে দেয়া হয়নি।

রায়ের প্রতিটি বক্তব্যই যেন মুখোশ উন্মোচন। এর পরেও সুশীল, বুদ্ধিজীবী এবং সাংবাদিকদের মুখে ট্রাম্পের সমালোচনা; কিন্তু ৫ জানুয়ারির বিষয়ে সুনসান নীরবতা! যেন ঢাকা নয়, অবৈধ নির্বাচনটি হয়েছিল ওয়াশিংটনে। তবে দোষ একা ৫ জানুয়ারির নয়। অন্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশের বুদ্ধিজীবীরাই রকীব মার্কা কমিশনের মুখও দেখতেন না। দুঃখজনক কিন্তু সত্য, তাদের অনেকেই, ১/১১ থেকে আজ অবধি প্রতিটি অগণতান্ত্রিক শক্তির সাথেই হাত মিলিয়ে চলেছেন। পরামর্শ দিচ্ছেন জেনেও, নির্বাহীর বাইরে ইসির ক্ষমতা নেই। আদালতের দীর্ঘ রায়ে তাদের কথাই ফুটে উঠেছে। দীর্ঘ দিন পর আবারো জনগণের জয় হয়েছে।

নিক্সনগেট পুরনো হলেও, ট্রাম্পগেট এক্কেবারে নতুন। নওয়াজগেট রায়টি একবিংশ শতাব্দীতে আইনের শাসনের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তবে ক্ষমতাসীনদের অনেকেই নওয়াজগেটের মতো একই পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারির সাথে যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিটি অস্বাভাবিক বিষয়কেই উল্টে ফেলার অতুলনীয় ক্ষমতা লীগের।

প্রভাব ফেলার অপরাধে ট্রাম্পের অভিশংসন নিয়ে এত কৌতূহল। কিন্তু ৫ জানুয়ারির হোতাদের বিচার হবে না? ভুয়া নির্বাচনের সব তথ্যই দেশে-বিদেশে। সেদিন ভোটকেন্দ্রে যা ঘটেছিল, এই প্রথম সেই গভীরে হাত দিলেন সর্বোচ্চ আদালতের মতো বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানটি। বলা চলে, নওয়াজ শরিফের রায়ের মতোই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ রায়ে।

আদালত রায় দিয়েছেন। সাথে হাতিয়ারও দিয়েছেন। আদালত যা বলেছেন, এরপর আত্মরক্ষার সুযোগ কোথায়? কনটেমপ্ট অব কোর্ট, ভোটচুরির নির্বাচন, কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড... অসংখ্য অভিযোগে অভিযুক্ত। এরপর দায়, আমজনতার।


রায়ের আলোকে, আমেরিকার চলমান তদন্ত থেকে, গণতান্ত্রিক মানসিকতা ধারণই সংসদীয় গণতন্ত্রকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে পারে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি হয়েছিল পার্শ্ববর্তী দেশের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং পৃষ্ঠপোষকতায়। এই ঘোষণা পঙ্কজ শরণরাই দিয়ে বলেছিলেন, নির্বাচনে ভারত আওয়ামী লীগের পক্ষ নেবে। পরিকল্পিতভাবে বিএনপি জোটকে নির্বাচন থেকে আউট। আবারো দিল্লি থেকে ফিরেই এরশাদের ঘোষণা, ভারত আমার পক্ষে আছে। অপর দিকে ২০১৯-এর নির্বাচনের সতীত্ব রক্ষার রাস্তা খুলে দিলো এই রায়।

দিল্লির অগণতান্ত্রিক পররাষ্ট্রনীতির কঠোর সমালোচনা করে একাধিক কলাম লিখেছেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার। সাংবাদিক কৌশিক নায়ার লিখেছেন, হাসিনার দিল্লি যাওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল বিদায়ী রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে ২০১৯-এর ব্লুপ্রিন্ট। আমরাও দেখেছি, যেভাবে রাষ্ট্রপতির লন্ড্রি-কিচেন হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের নির্বাচন।

সদ্যসমাপ্ত ভেনিজুয়েলার নির্বাচন যেন আরেকটা ৫ জানুয়ারি; কিন্তু পশ্চিমাদের আচরণ একেবারেই ভিন্ন। নির্বাচনের পরের দিনই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা। প্রতিবাদী অ্যাটর্নি জেনারেলকে তাৎক্ষণিক বরখাস্ত করলে, এই রায়ের আশঙ্কাই প্রমাণ করলেন ভোটচোর মাদুরো। আরেকটা ৫ জানুয়ারি ঘটার আগে সঠিক প্রেসক্রিপশনটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। আইনের রেফারেন্স তৈরি, সিদ্ধান্ত জনগণের।


জোরপূর্বক আইনস্টাইন বানানো গেলে, ঘরে ঘরে আইনস্টাইন তৈরি হতো। প্রসঙ্গ, মুহিত-অর্থনীতির সাথে ঢাকাগেটের সম্পর্ক। মুহিত-অর্থনীতির খবর শুধু নির্বাহী ছাড়া আর কেউ জানে না। বেসিক ব্যাংক এবং সুইফট কেলেঙ্কারির বিচার না হওয়াটা অন্যতম রেফারেন্স। মেগা বাজেট, মেগা অর্থনীতি, উন্নয়নের গণতন্ত্র, রাবিশ খ্যাত বক্তব্য... ওই অর্থনীতির সাথে ঢাকাগেট সংযোগের প্রমাণ।
এই অর্থনীতির এক পাল্লায় ২০৪১ পর্যন্ত ক্ষমতার ধারাবাহিকতা। অন্য পাল্লায় ৫০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। দেশের স্বার্থে বাজেট হলে, মুহিতবাজেটের গ্রহণযোগ্যতা নেই। কারণ সুন্দরবন পুড়িয়ে কেউ বিদ্যুৎ চায় না। পুরো অর্থনীতিই সার্ভিসনির্ভর হওয়ায়, যারাই ধনী দেশের স্বপ্ন দেখায়, সেইসব ফিন্যানশিয়াল ক্রিমিনালদের চিহ্নিত করল এই রায়।

মুহিত-পূর্ববর্তী অর্থমন্ত্রীদের কেউই বাংলাদেশ যা নয়, তা বানানোর বা দেখানোর চেষ্টা করেননি। রুগ্ণ অর্থনীতির কারণে প্রতিবারই সাইফুর রহমানকে খোঁটা দিলেও, তাজউদ্দীন থেকে সাইফুর রহমানদের দেয়া বাজেটই প্রকৃত অর্থনীতি। অন্য দিকে মুহিত-অর্থনীতি জনস্বার্থবিরোধী একটি আন্তর্জাতিক ব্লুপ্রিণ্ট। এ কারণেই আগেভাগে গণভোট বাতিল করে বিস্তর সম্পদ বিদেশীদের হাতে বণ্টনের ব্যবস্থা।
এতকাল সংসদ বর্জনের রাজনীতিতেই ধুঁকে ধুঁকে এগোচ্ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র। কিন্তু ৫ জানুয়ারি এসে তা গুড়িয়ে দিলো। যাদের কারসাজিতে ৫ জানুয়ারির উদ্ভাবন, তারাই ৯২ দিনের আন্দোলনের মূল হোতা এবং সেই ইঙ্গিতই রায়ে। কোনো সুস্থ মানুষই আরেকটা ৯২ দিনের প্রেক্ষাপট কিংবা গীতা সরকারদের জন্য বার্ন ইউনিট দেখতে চায় না। বার্ন ইউনিটগুলো কারো নির্বাচনী প্রচারের জায়গা নয়। কিন্তু কিছুতেই মানতে নারাজ নির্বাহী। সব অভিযোগই রায়ের আওতাভুক্ত।

সুতরাং, ট্রাম্পগেটের আলোকে ঢাকাগেট কেলেঙ্কারির সুরাহাই সর্বোচ্চ প্রায়োরিটি। আরো চার-পাঁচটি সংসদীয় গণতন্ত্রের মতামত দিয়ে, শর্টলিস্ট করা হলো নওয়াজ রেফারেন্স। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের সারমর্ম, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন অবৈধ।


ভুল স্বীকার করাও একটি আর্ট। সবাই পারেন না, কেউ কেউ পারেন। যেমন আইনস্টাইন। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে গণহত্যার ভয়াবহতার পর বলেছিলেন, যদি ঘূর্ণাক্ষরেও জানতাম, অ্যাটম বোমা বানানোর জন্য প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে চিঠি লিখতাম না।’
এখন নিঃশর্ত একমত হওয়া জরুরি। ভুলের মাশুল প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই দিয়েছে বিএনপি। ৯ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা সত্ত্বেও জনতার মঞ্চের মতো বিস্ফোরক আন্দোলনে যায়নি। ‘অতীতের ভুল আর না করা’র বক্তব্যও শুনেছি।

এখন আওয়ামী লীগের সময়, অতীতের ভুল স্বীকার করে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা। জনতার মঞ্চ, ১/১১, ৫ জানুয়ারির অপরাধ স্বীকার। গণজাগরণ মঞ্চ, গুম-গায়েব এবং গণতন্ত্র ধ্বংসের দায় স্বীকার। অন্যথায় পরিণতি ভালো হবে না। কারণ আনন্দবাজারিরাই বলেছেন, ৯২ শতাংশ বাংলাদেশী মুসলমানের ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট তুঙ্গে। ১৯৪৬-এর ডাইরেক্ট অ্যাকশনের কারণও কংগ্রেস বিরোধী মুসলিম সেন্টিমেন্ট। এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি কারোরই কাম্য হতে পারে না। যা হোক, এই রায়ের মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করা হলো।

ই-মেইল : farahmina@gmail.com
ওয়েবসাইট : www.minafarah.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.