অভিমত : শিকলে বাঁধা নারী

তানজিনা সকাল

১৪ বছর পর আজ ২০১৭-তে যৌতুকের কারণে অনেক নারীকে বলির শিকার ও নির্যাতিত হতে হচ্ছে। পুরুষেরা যদি নারীদের নিজেদের মা-বোনের মতো মনে করত তাহলে তাদের এত অবমাননা করত না। তারা ভাবেÑ পুরুষ সিংহের মতো। তাই সবাইকে শিকার করে আত্মসাধন করাই তাদের ধর্ম হয়ে গেছে। প্রচলিত একটি প্রবাদ আছেÑ ইটটি মারলে পাটকেলটি খেতে হয়। এ প্রবাদটি অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও ধর্ষণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ধর্ষণের ক্ষেত্রে শাস্তি ধামাচাপা পড়ে যায়। সমাজ ধর্ষককে খারাপ দৃষ্টিতে না দেখে উল্টো ধর্ষিতাকে হেয় করে। আমরা হয়তো বধির নতুবা অন্ধ। নইলে ধর্ষকদের যথাযথ বিচার আমরা পেতাম। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী তনু ধর্ষণের পরে খুন হন। কিন্তু সেই ধর্ষকদের বিচার আজো যথাযথ হয়নি। সেদিনের পর কি আর ধর্ষণ হয়নি? উত্তরটি সবার জানা। ধর্ষণ হয়েই চলেছে। যত দিন সুষ্ঠু বিচার হবে না তত দিন হাজার তনু ধর্ষিত হতে থাকবে। দেশে অনেক আইন আছে নির্যাতনের বিরুদ্ধে, কিন্তু নির্যাতন তো কমছে না। মূলত আশার কথা আছে, পথনির্দেশ নেই। আমাদের সমাজে নারীরা অবহেলিত। ইভটিজিং কিংবা ধর্ষণের শিকার হলে নারীরা লজ্জিত হয় অথচ অপরাধীরা সাধারণ জীবন যাপন করে। জানা প্রবাদ আছেÑ এক হাতে তালি বাজে না। এ কথাটি অবশ্যই সত্য। তাই বলে তো এটা নয় যে, নারীরা ইভটিজিং কিংবা ধর্ষণের শিকার হয় নিজেদের দোষে! সত্যিকার অর্থে এক হাতে তালি বাজে না। অপরাধীদের এক হাত আর আমাদের সমাজের অসুস্থ দৃষ্টিভঙ্গির আরেক হাতÑ এ দুই মিলে মূলত তালি বেজে থাকে। যদিও সেই তালির শব্দ ধর্ষিতার গলা দিয়ে বের হয়ে পুনরায় প্রতিধ্বনিত হয়ে ধর্ষিতার কানেই ফিরে আসে। সেই শব্দ আর কেউ শুনতে পায় না কিংবা শোনার চেষ্টা করে না।
প্রতি বছর হাজার হাজার নারী ধর্ষিত হয়। একটিরও সুষ্ঠু বিচার হয় না। গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে মীমাংসা চুকে দেয়া হয়। আদালত পর্যন্ত ধর্ষণের খবর যাওয়ার আগেই মিলিয়ে যায়। ৯৯ শতাংশ ধর্ষিতাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। মনোবল আর মানসিকতা ধরে রাখা আমাদের মতো সমাজব্যবস্থায় দুষ্কর। এভাবেই কি যুগে যুগে নারীরা অত্যাচারিত হতে থাকবে? কোনো সমাধান নেই কি? আমাদের দেশে গবেষণা ছাড়াই কোনো সমস্যার সমাধান বাতলে দেয়ার প্রবণতা আছে। যদি এই প্রবণতা দূর করা যায়, হয়তো বা সমাজের গোঁড়ামি আর দৃষ্টিভঙ্গি দুটোরই পরিবর্তন আসবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ বাড়াতে হবে যুবসমাজের মধ্যে। সরকারকে শুধু পদক্ষেপ নয়, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে, তবেই নারী নির্যাতনের মাত্রা কমবে।
সব মানুষই শ্রেষ্ঠ, যদি সে সত্যিকার অর্থে মানুষ হয়ে উঠতে পারে। সে পুরুষই হোক কিংবা নারী। নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে লিঙ্গবৈষম্য কোনো প্রভাব ফেলে না। আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু হলেও পাল্টে নেই। নারীদের সম্মান দিতে শিখি। নয়তো স্বাধীনতা অর্জন করে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী তথা নারীদের পরাধীন করে রাখা হবে। তখন স্বাধীনতা অর্জনের কৃতিত্ব কোথায় যাবে!

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.