নির্বাচন, গণতন্ত্র ও সেনাবাহিনী

সানজিদা ইয়াসমিন তুলি

সেনাবাহিনীর প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত শত্রু থেকে নিজ সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রের অখণ্ডতা রক্ষা করা। এ ছাড়া সেনাবাহিনী আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা প্রদান করে থাকে। যেকোনো ধরনের বিপর্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা ও জাতি গঠনে সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে দেশে ও বিদেশে শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সুনাম বিশ^ব্যাপি। বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ব্যবহার। নির্বাচন কমিশনের সংলাপেও সুশীলসমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রায় সবাই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার জন্য সেনাবাহিনী ব্যবহারের পক্ষে মত দিয়েছেন। দেশের বেশির ভাগ মানুষও চায় নির্বাচনে সেনাবাহিনী ব্যবহার হোক, যাতে জনগণ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারে। বেশির ভাগ মানুষের বক্তব্য, নির্বাচনে সেনাবাহিনী ব্যবহার হলে মানুষ নির্বাচন নিয়ে আগ্রহী হবে, নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যাবে ও ভোট দেবে। যদিও সেই ভোটে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কি-না তা নির্ভর করবে নিরপেক্ষ সরকার ও ভোটের পরিবেশের উপর। তবুও বর্তমানে দেশের যে অবস্থা তাতে মানুষ কিছুটা আশ^স্ত হবে যদি সেনাবাহিনী পুরোপুরিভাবে ব্যবহার করা হয়। যারা নির্বাচনে সেনাবাহিনী ব্যবহারের বিপক্ষে মত দিচ্ছেন তারা বলছেন, নির্বাচন করা সেনাবাহিনীর কাজ নয়। সেনাবাহিনী দিয়ে যদি রাস্তাঘাট তৈরি করা, দুগ্ধখামার পরিচালনা করা, সুমদ্র সৈকত তৈরি করা, সেতু তৈরি করা, দেশের সব বড় বড় সরকারি হাসপাতালগুলো পরিচালনা করা, সিটি করপোরেশনের কাজে সহযোগিতা করা এবং নির্ভুল ভোটার তালিকা করা যায়, তাহলে আমি বলব গণতন্ত্রের বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করা, দেশের উন্নতির জন্য, শান্তি ও শৃঙ্খলার জন্য নির্বাচনে সেনাবাহিনী ব্যবহার করার ভেতরে কোনো সমস্যা নেই। মহামান্য রাষ্ট্র্রপতি মো: আবদুল হামিদ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ রাজশাহী ক্যান্টনমেন্টের এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি সেনাবাহিনীকে দেশ ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে। দেশ ও জাতি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।’ তা ছাড়া সেনাবাহিনীর ভূমিকার মধ্যে এটাও আছে, যখন দেশের উন্নতির কাজে তাদের ডাকা হবে; তারা অংশগ্রহণ করবে (To take part in nation development activities as and when asked for)। একটা জিনিস খুব ভালো করে আমি লক্ষ করি, যারা নির্বাচনে সেনাবাহিনী ব্যবহার নিয়ে বিপক্ষে মতামত দেন, তারাই আবার নির্ভুল ভোটার তালিকা তৈরির জন্য সেনাবাহিনীকে প্রশংসা করেন। যারা ভোটার তালিকা তৈরি করে প্রশংসা পাবে, তারা ভোটের দিন কাজ করে কেন প্রশংসা পাবে না। তার পরও তারা বলেন, নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী নেই। তাহলে বলতে হয়, নির্বাচনে র্যাব-বিজিবি ব্যবহার করা হয়। সেনাবাহিনীর একটা অংশ তো র্যাব-বিজিবিতেও কাজ করে। তাই র্যাব-বিজিবির মাধ্যমে যদি সেনাবাহিনী ব্যবহার করা যায়, তাহলে সরাসরি সেনাবাহিনী ব্যবহারে কোনো অসুবিধা হবে না।
আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, সেনাবাহিনীকে ডেকে এনে তাদের অহেতুক বিতর্কিত করতে চান না। আওয়ামী লীগের নেতারা কিভাবে মনে করল যে, সেনাবাহিনী বিতর্কিত হবে। তাহলে তারা কি ধরেই নিয়েছে যে, নির্বাচনের দিন ভোট কারচুপি ও ভোট ডাকাতি হবে, তখন সেনাবাহিনী বাধা দিলেও বিতর্কিত হবে, বাধা না দিলেও বিতর্কিত হবে। আমার মনে হয় না সেনাবাহিনী বিতর্কিত হবে। যারা এত সুন্দর ছবিসহ ভোটার তালিকা দিতে পারল তারা নির্বাচনের দিন নির্ভয়ে ভোট দেয়ার পরিবেশ দিতে পারবে। তা ছাড়া বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে সেনাবাহিনী ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেগুলোতে সেনাবাহিনীর ব্যবহার করায় তেমন বিতর্ক হয়েছে বলে আমার জানা নেই। আওয়ামী লীগের নেতারা আবার এও বলছেন, নির্বাচনে সেনাবাহিনী স্টাইকিং ফোর্স হিসেবে ক্যান্টনম্যান্টের ভেতরে অবস্থান করবে। সেনাবাহিনী তো ক্যান্টনম্যান্টের ভেতরেই থাকে, এটা তো নতুন কিছু না। কিন্তু নির্বাচনে কারচুপি হলে, ভোট ডাকাতি হলে ও মারামারি হলে সেনাবাহিনী তো তখন খুব বেশি ভূমিকা পালন করতে পারবে না। কারণ ক্যান্টনম্যান্টগুলো সাধারণত জেলা ও বিভাগীয় সদরে হয়ে থাকে। সেখান থেকে উপজেলা বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামগুলোতে সেনাবাহিনী পৌঁছাতে দেড়-দুই ঘণ্টা সময় লাগবে, যার ভেতরে কারচুপি ও ভোট ডাকাতি হয়ে যাবে। আর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতও তো পরিচালনা করা যাবেই না। কারণ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে মহামান্য হাইকোর্ট, যদি সেই আদেশ এক-দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিতাদেশ বাড়িয়ে এখনো চলছে, যেটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পরিপন্থী। এ ছাড়াও ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনে যাদের সাজা দেয়া হয়েছে, তাদের সাজাও বাতিল করেছেন মহামান্য হাইকোর্ট। তাই অবৈধ ও অসাংবিধানিক বিষয় দিয়ে তো আর নির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যাবে না। তা ছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সরকারের তৈরি করে রাখা দলীয় বাহিনীর মতো কাজ করবে, যা গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য এইচ টি ইমাম নিজেই স্বীকার করেছেন। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা কাদের বিচার করবেন, পুলিশ যাদের গ্রেফতার করবে। পুলিশ যে হারে দলীয় ও সাধারণ মানুষের সাথে চাঁদাবাজি, গুম, নির্যাতন আর গ্রেফতারবাণিজ্য করেছে, তাতে তারা নিজেই চায় না নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হোক। নির্বাচনের সময় নির্বাচনের দিন ও তার আগে পুলিশ যে কি করবে, কাদের গ্রেফতার করবে এবং কি করতে পারে তা বাংলাদেশের মানুষ দেখছে ও বুঝতে পারছে। তাই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সুষ্ঠু আর স্বচ্ছ ও নির্ভয় করতে সেনাবাহিনীর উপর সাধারণ মানুষের কিছু বিশ^াস আছে।
লেখক : ছাত্রদল নেত্রী, ইডেন মহিলা কলেজ
Email: Sanjidatuli89@gmail.com

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.