ইস্যু আক্রান্ত জাতি

খালিদ ফেরদৌস

বাংলাদেশ আজ ভালো নেই। একের পর এক ব্র্যান্ড নিউ ইস্যু তৈরি করে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে মাটিচাপা দেয়া হচ্ছে হরহামেশা। এতে জনগণ হচ্ছে হতাশাগ্রস্ত, ন্যায়বিচার হচ্ছে ভূলুণ্ঠিত। কয়েক দিন আগে মায়ের হাতে-পা বেঁধে তার সামনে মেয়েকে মিয়ানমারের মগ-রাখাইনরা যে স্টাইলে অমানবিকভাবে রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ করে সেভাবে ধর্ষণ করেছে। পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বাবা তার শিশুসন্তান ধর্ষণের ঘটনায় মামলা করতে ব্যর্থ হলেন। শ্লীলতাহানি, গরু চুরি ও প্রতিবেশীদের হামলার হুমকির বিচার না পেয়ে গাজীপুর শ্রীপুরের গ্রামের হযরত আলী তার মেয়েকে নিয়ে ২৯ এপ্রিল ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মঘাতী হন। তাতে কিন্তু সমাজপতিদের কিছু আসে যায় না। আমাদের বিবেকে আবেগ আসে না। এমন ঘটনার পর্যন্ত বিচারিক অগ্রগতি চোখে পড়ে না। তেমন কোনো আন্দোলনও করিনি আমরা। কারণ এটা ছিল একজন দিনমজুরের আহাজারি। আর এই রোনাজারি আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় না। আমাদের কান কি পচে গেছে? গরিবের গায়ে কি গন্ধ? তাদের ইস্যুতে কি টাকার লেনদেন কম? টিভি চ্যানেলগুলো কি টিআরপি কম পায়? কম দামে বিক্রি হয় ভিডিও ক্লিপ? নাকি পণ্যের বাজারে থেকে যায় অবিক্রীত?
বিষয়টির সুরাহা হতে না হতেই আবার নতুন ইস্যু। অজ্ঞাত কেউ নাশকতার সন্দেহে জিডি করল, রাজধানীতে বিএনপি অফিস ভেঙেচুরে তছনছ করে দেয়া হলো। পরে পুলিশের অভিযানের রিপোর্টে জানা গেল, অভিযানের প্রাপ্তি শূন্য। রহস্যজনক ব্যাপার, অভিযানের ঠিকানায় শুধু গুলশান-২এর ৮৬ নম্বর রোডের নাম উল্লেখ আছে, কিন্তু বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের নামগন্ধ নেই। পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধসে দুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করতে গেলেও এত বড় একটা দলের মহাসচিবসহ বড় নেতাদের ওপর হামলা করা হয়। মানুষকে সাহায্য করার পরিবেশটিও উধাও হয়ে যাচ্ছে। মানুষ এখন ভীতসন্ত্রস্ত। জানা-অজানা ভয়ে পথঘাটে কেউ মুখ খোলে না। মনখুলে কেউ হাসে না। গুমট আমাদের চার পাশ।
আক্ষেপ করে কবি আল মাহমুদ বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ আমি যদি তোমার সকল কবিতা, উপন্যাস, গান, নাটক বাংলার মাটিতে পুঁতে সারা বছর পানি দিই তবে একটা রবীন্দ্রনাথ আর জন্ম নিবে না। এতই নিষ্ফলা তোমার এই স্বদেশ। অদ্ভুত আঁধার এ দেশে, এখন যারা অন্ধ তারা সবচেয়ে ভালো দেখে। যারা একটিও রোজা রাখে না তারা দখল করে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কোলাকুলি করা পবিত্র ঈদগাহে নামাজের প্রথম সারি।’
রেইনট্রি হোটেলে আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে ও তার বন্ধুদের ঘটানো দুই ছাত্রী ধর্ষণ ইস্যুটি কমবেশি ঘুরেফিরে আসছে। দুশ্চরিত্রের বড়লোকের ছেলেদের অর্থের প্রলোভনে তারকা হোটেলে সারা রাত পার্টি করতে যায় অভিজাত এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া তরুণী। এক মাস পরে বুঝতে পারে তারা ধর্ষিত হয়েছে। বিষয়টি মিডিয়াতে ফাঁস করার পর তোলপাড় শুরু হয়ে যায়। ডান, বাম, মধ্য আন্দোলনে মুখর করে তোলে সারা দেশ। নড়েচড়ে বসে সরকার। মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়ে। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, শুল্ক বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন পাগলপারা। ধর্ষণকারীর অপরাধে তার বাবার জুয়েলার্সের সোনা জব্দ করা হয়। কিন্তু কড়াইল বস্তিতে যে ৮০ বছরের বৃদ্ধ পান্তা ভাত দিয়ে ইফতার করে তার খোঁজ তো কেউ নেয় না।
ধর্ষণ আজ মহামারী আকার ধারণ করেছে। নিজেকে খুব অসহায় লাগে যখন দেখি পথভ্রষ্ট শিক্ষক, নীতিভ্রষ্ট দায়িত্বশীল আর ভার্চুয়াল যুবক কাণ্ডারিরা ধর্ষণের ঘোড়া দৌড়াচ্ছে। এক ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতায় মেতেছি আমরা। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশু থেকে পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী। ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে দেশকে বাঁচান। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মিডিয়াসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে ধর্ষণসহ সামাজিক অপরাধের খবর আসছে। বনানীর রেইন ট্রি হোটেলের ধর্ষণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, সমাজে মেয়েরা কতটা নিরাপদ। মামলা হচ্ছে, জবানবন্দীও নেয়া হচ্ছে, নথিভুক্তও হচ্ছে; কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেগুলো চাপা পড়ে যায়। বিচার হয় না। গড়ে উঠেছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। দু-একজন এমপিকে জেলে পুরে, এমপি-মন্ত্রীদের ছেলে গ্রেফতার করে লোক দেখানো আইনের শাসন দেখে দেশের আইনজীবী শাহদিন মালিক আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘মাঝে মাঝে আমাদের কাছে ন্যায়বিচার ধরা দেয়। কিন্তু সব সময় আইনের প্রয়োগ যথাযথ হওয়া বাঞ্ছনীয়।’
যাকে ক্রিকেট খেলায় নর্দমায় বল পড়লে তুলে আনার জন্য দুধভাত হিসেবে নেয়া হয়; সেও শচিন টেন্ডুলকারের ফেবারিট এক্সট্রা কাভার শটের সমালোচনা করে। হয় ডেঙ্গু কিন্তু ক্যান্সারের ভুল চিকিৎসা দেয়া হয়। যে পারলে দেশকে দিনে দু’বার বিক্রি করে দেয় সে পর্যন্ত স্বদেশপ্রেমের স্ট্যাটাস, ক্যালিগ্রাফি, ছবি দিয়ে ফেসবুক পেজ ভরিয়ে দেয়। এভাবে আমরা বিভিন্ন জাতীয় দিবসে স্বদেশপ্রেমের গুষ্ঠি-পিণ্ডি এক করে ফেলছি। আমাদের মায়েদের সাথে দিনে একবার কথা হচ্ছে কি না ঠিক নেই। কিন্তু প্রেস্টিজ রক্ষার জন্য ফেসবুকে মা দিবসের শুভেচ্ছা জানাতে ভুল করছি না। ক্রিকেট খেলায় অমুক দেশ আম্পায়ার ভাড়া করে এই অভিযোগ তোলে, মাঝখানের আঙুল দিয়ে আইসিসি লিখে আপলোড দিচ্ছি, কিন্তু বর্ডার কিলিং নিয়ে তো কিছুই বলছি না। বিএসএফের গুলিতে কত বাংলাদেশী নির্মমভাবে নিহত হয়েছে তার প্রতিবাদ নেই। একটা মশা মারেনি যে হাতে ব্যথা পাওয়ার ভয়ে, সেও ফেসবুকে জঙ্গি নিধন করে ফেলছে। এই ফেসবুকের কারণেই হয়তো হিরো আলম মার্কা চেহারার অধিকারী হয়েও সালমান খানের মতো ছবি প্রোফাইল পিকচার দিয়ে মেয়েদের আকৃষ্ট করছি। ওদের ব্যাপারটাও তার বিপরীত নয়। আমরা বাস্তব জীবনের সব ন্যায়নিষ্ঠ মানসিকতা ভুলে গিয়ে ভার্চুয়াল লাইফে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি। জঙ্গি, ডাকু সরদার, ইয়াবা সম্রাট, ধনী ব্যবসায়ীর লম্পট-ভণ্ড ছেলের প্রেমে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া উচ্চশিক্ষিত মেয়েরা। অহরহ ফাঁদে পড়ছে তরুণ-তরুণী। এভাবে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকেই ধাবিত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, একটা ইতিহাস। কিন্তু প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ভাইস চ্যান্সেলরশিপের নিরপেক্ষ ও মহিমান্বিত অবস্থানটি কি ধরে রাখতে পেরেছে? সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন!
এ দিকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার সুইতলা মল্লিকপুরে অবস্থিত এশিয়ার বৃহৎ বটগাছটি বিলীন হতে চলেছে, তাতে কারো টনক নড়ে না। লন্ডন-প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার জন্য সবাই প্রোফাইল পিকচার পরিবর্তন করে ইংল্যান্ড-ফ্রান্সের পতাকায় রাঙায়। কিন্তু হাওর এলাকায় কিংবা পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ না খেয়ে মরছে সে খবর কে রাখছে? আমরা যখন ঝড়বৃষ্টির মাঝে সৌন্দর্য খুঁজে পাই তখন পাহাড়ধসে চাপা পড়ে মারা যায় মানুষ, ফসলের ক্ষেত ভেসে যায় জোয়ারে। বাঁধ ভেঙে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেলে, শত শত টন মাছ মরে গেলে, হাজার হাজার গাছ পানিতে নিমজ্জিত হয়ে মরে গেলে, কৃষকের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেলে কতটা গুরুত্ব পায়? জঙ্গি আস্তানায় দেশের মিডিয়াগুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিন্তু পাহাড়ি এলাকা ও হাওরের দুর্গত মানুষের পাশে তো খুব বেশি দেখা যায় না। রাজধানীর বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক আকাশছোঁয়া ভবন হয়, হলে গেট করতে কোটি টাকা খরচ করা হয়, কিন্তু পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঁচা, আধাপাকা ইটের রাস্তা পাকা হয় না। রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঠিকমতো বেতন পান না। দেশে-বিদেশে আমাদের গর্বের প্রতিষ্ঠান বুয়েটের শিক্ষকেরা ঠিকমতো পেনশনের টাকা পান না। আমাদের দৈন্য সর্বক্ষেত্রে।
মমতাজের একটা গান মনে পড়ে গেলÑ মনে যদি পচন ধরে, গন্ধ কি আর পাওয়া যায়। তাহলে কি ধরে নেব নষ্ট সমাজ, নষ্ট সভ্যতা, নষ্ট চার পাশ! পচন ধরেছে আমাদের মানসিকতায়। তবে এটা বিশ্বাস করতে চাই না। কারণ ভালোর চাষাবাদ এখনো থেমে যায়নি। আমাদের দেশ ওলি-আউলিয়ার সব কৃষ্টিকালচার, ধর্মবর্ণের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা। সুপ্রাচীন সামাজিক ঐতিহ্যের দেশ। সামাজিক সমস্যার মূলে কারা তা খুঁজে বের করার আগে ত্রুটির উৎস খুঁজে বের করা উচিত। আমাদের শৈশব শুরু হয় বৈষম্যপূর্ণ শিক্ষার মধ্য দিয়ে। শিখানো হয় মেয়েরা দুর্বল, বুঝানো হয় তাদের শাসনপীড়ন না করলে সংসার সুখের হয় না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করার জন্য ধর্মের অপব্যবহার করে বলা হয়, স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত। এই কথার ভিত্তি নেই। আমাদের গতানুগতিক সিনেমায় নাচগানের পাশাপাশি ধর্ষণের দৃশ্য না থাকলে হয় না। এসব থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
ধর্ষণের মতো জঘন্য অপকাণ্ডসহ সব অপরাধের বিচার নিশ্চিত হোক। সেটা যেন যথাযথ আইন মেনে হয়। গরিব হওয়ার কারণে যেন কোনো মা-বাবা সুবিচার থেকে বঞ্চিত না হয়। আবার বড়লোক হওয়ার কারণে যেন বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করা হয়। বিচার হোক সবার জন্য সমান। বিচারহীনতার কারণে ১০০ জন অপরাধী পার পেয়ে যাক, কিন্তু একজন নিরপরাধ লোক যেন শাস্তি না পায়। একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অন্ধকার ছেড়ে আলোয় ফিরে আসতে হবে। ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। আর হ্যাঁ, আমরা প্রযুক্তির ভালো দিকগুলো গ্রহণ করব, খারাপ দিকগুলো বর্জন করব। কিছু কিছু বিষয়ে হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়া যায় না। মানবতা পরিবার, বিবেক ও ব্যবহার করে নিতে হয়।
আমাদের উচিত মানুষকে শ্রদ্ধা করা এবং দলীয় ও গোষ্ঠীস্বার্থ বিবেচনা করে বৈষম্য না করা। সবাইকে সুস্থ চিন্তা করতে শিখতে হবে। ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। বাবা-মা থেকে শুরু করে প্রাথমিক স্কুলসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই দায়িত্ব নিতে হবে। তীক্ষè নজর রাখতে হবে জনপ্রশাসন যেন দূষিত না হয় রাজনৈতিক গন্ধে সঙ্কীর্ণতা যেন রক্তে মিশে না যায় ধর্মান্ধতা ফ্লেভার, মানবতা যেন নির্ভরতার স্বচ্ছ দেয়াল। মনুষ্যত্ব থাকলে নানাবিধ সামাজিক সমস্যা; সামাজিক সমস্যা শুধু নয়, দেশের যে রাজনৈতিক বৈরিতা ও গুমট পরিবেশ তা দূর হয়ে যাবে। এখনো স্বপ্ন দেখি সভ্য, সত্য ভালোর। অমাবস্যায় দেখি ভরা পূর্ণিমা।
লেখক : গবেষক

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.