বৃষ্টিভেজা অনিতা

মো: ওবায়দুল হক

এই না হলে কী শ্রাবণ মাস! যৌবনা বর্ষার প্রাকৃতিক কোমল দাঁত খেয়ে যাচ্ছে খেটেখাওয়া মানুষের মুখের হাসি। কয়েক দিন ধরে লাগাতার বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির প্রশ্রয়ে তিতাসের শান্তিজলে তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট। দাবা, লুডু খেলে সময় কাটছে সবার। আমি অনিতা, তানহা, খাটে বসে লুডু খেলছি।
দাদিমা পেছনের জানালায় খুলে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ আমাকে ডেকে বললেন, ‘দ্যাইখা যা, সাপে ব্যাঙ ধরছে!’
আমরা খেলে রেখে তিনজন গা ঘেঁষাঘেঁষি করে জানালার কাছে দাঁড়ালাম।
সাপের মুখে অসহায় ব্যাঙের বেঁচে থাকার আকুতিতে যেন কাঁপছিল বর্ষার বাদল দিন। যেখানে সবাই মজা উপভোগ করছে, সেখানে অনিতা মায়াময় কণ্ঠে বলল, ‘সাপের মুখ থেকে ব্যাঙটা বাঁচিয়ে দেন না।’
আমি অনিতার দিকে বড় চোখে তাকিয়ে বললাম, ‘পাগলে পাইছে ত আমারে!’
-‘প্লিজ দেখুন না চেষ্টা করে। আহা হা রে, ব্যঙটা কিভাবে কাতরাচ্ছে!’
সাপটার চেয়ে ব্যাঙটা একটু বড়। তাই ব্যাঙটাকে পরাস্ত করতে সাপটা হিমশিম খাচ্ছে।
সাপটাকে জোরে আঘাত করলাম বাঁশের লাঠি দিয়ে। ব্যাঙটাকে ছেড়ে দিয়ে সাপটা জলডাঙ্গায় গড়াগড়ি করছে। ব্যাঙটা নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে... লাফিয়ে লাফিয়ে চলে গেল।
এ দিকে অনিতার মুখে সূর্যের জ্যোতির্ময়ী হাসি!
আমি অপলকে তাকিয়ে আছি অনিতার দিকে।
অনিতা হাসি থামিয়ে বলতে থাকে, আরে তাকিয়ে আছেন কেন, ‘মারেন, সাপটাকে মারেন, নইলে রাতে এসে আপনাকে কামড়াবে!’
আমি সাপটাকে মেরে ফেললাম। গ্রিলের এপাশ থেকে অনিতার দিকে তাকিয়ে বললাম, এবার খুশি তো?
আনন্দঘন পৃথিবীটা যেন আমার চোখের সামনে একটা প্রাণীকে বাঁচিয়ে দেয়ার আনন্দে লাফাচ্ছে।
বলল, হুম আমি অনেক হ্যাপি... আমার অনেক দিন মনে থাকবে।
‘তুমি খেয়াল করেছ, ব্যাঙটাকে বাঁচাতে গিয়ে সাপটাকে মেরে ফেলতে হলো। দুটোই কিন্তু প্রাণী?’
এবার অনিতার হাসি উজ্জ্বল মুখটায় মুহূর্তের মধ্যই অমাবস্যার রূপ নিলো। ফ্যাকাসে মুখে অনুতপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘তা তো ঠিক বলছেন। আমি তো এভাবে খেয়াল করিনি।’
আমি বললাম, ‘যদি আরেকটু অন্যভাবে বলি তাহলে সাপটাকে মেরে ফেলাই ঠিক হয়েছে।’
- ‘যেমন’?
-‘ব্যাঙ তো ক্ষতি করে না, সাপ, তো মানুষকে ছোবল দেয়!
এ জায়গা থেকে সাপটাকে মেরে ফেলাই উত্তম না?’
আমার কথাটা শুনে ফের যেন ঊষার রবি উদয় হলো মায়াবিনীর মুখে...
আমি অপলকে তাকিয়ে আছি অনিতার দিকে, আজ কত বছর পর এ হাসি দেখলাম।
অনিতাদের আসা এ যেন আমার জীবনের সব রূপকথাকে হার মানিয়েছে। কখনো ভাবিনি ওর সাথে দেখা হবে। আমাদের পাশের অংশটাই অনিতাদের ছিল। একে একে সবাই যখন দেশ ছেড়ে ইন্ডিয়া পারি জমাতে শুরু করল, তখন অনিতার বাবাও চলে যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তার পথের বাধা হয়ে দাঁড়ান অনিতার বৃদ্ধ দাদা। তার এককথা, ‘এ দেশে আমার জন্ম। এ দেশ আমার। আমি এ দেশ ছেড়ে কোথায় যাব না। আমার মরার পর যেখানে খুশি চলে যেও।’ তাই বাধ্য হয়ে বাবার মৃত্যু অবধি অপেক্ষা করতে হয়েছিল। যখন ওরা দেশ ছেড়ে যায় তখন অনিতা ক্লাস সেভেনে আর আমি এইটে পড়তাম।
অনিতাদের চলে যাওয়া আমাকে দারুণভাবে ব্যথিত করেছিল। আমার অনেক ভালো লাগত অনিতাকে। রাতে শুয়ে শুয়ে ওকে ভাবতাম। জানি না সেই বয়সের ভালোলাগা, রাত জায়গাগুলোকে কী বলে। আজো পর্যন্ত আমার ভালোলাগার আকাশটাতে অনিতাই রয়ে গেল। এখানে কেউ প্রবেশ করতে পারেনি। সেই অনিতার সাথে আমার দেখা হবে তা আমি কল্পনায়ও ভাবিনি।
২.
অনিতা কাল সকালে চলে যাবে। তাই ছোট্ট একটা নৌকা নিয়ে আমরা তিনজন বের হলাম ঘুরতে।
ধৈঞ্চা ফুলের হলুদ পসরায় প্রজাপতি, ভ্রমর, মৌমাছির গুনগুনানি মাতিয়ে রেখেছে মধুময় বিকেল। তিতাসের জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে, ঝরা ধৈঞ্চাপাতাসহ ফুল।
নৌকা বেয়ে একসময় বিলে চলে এলাম। আহ! কী দারুণ লাগছে! শাপলা ফুলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে! সবুজ আকাশে জেন শুভ্র তারার হাট।
দু’জন দু’পাশ থেকে শাপলা তুলছে। আমি একটা শাপলা তুলে ডাকলাম, তানহা এ দিকে আয়?
তানহা আমার কাছে আসতেই আমি ওর চুলের খোঁপাই গুঁজে দিলাম একটা শাপলা ফুল।
অনিতা আমার দিকে বড় চোখে তাকাল। বলল, ‘শুধু বোনকেই দেবেন, আমাকে দেবেন না।’
-হুম, অবশ্যই দেব। এই বলে আরো একটা ফুল তুলে অনিতার কোমল কেশে গুঁজে দিলাম! এ যেন একজনমের স্বপ্ন ও ভাবনার সার্থকতা।
অনিতা তার ফোনটা আমার হাতে দিয়ে বলল, আসুন আমরা দু’জন একটা সেলফি ওঠাই।
আমি ক্যামেরা অন করে ছবি তোলার জন্য আমাদের দিকে ধরলাম। অনিতা আমার সামনে, আমি পেছনে। মুখটা বাঁকা করে, বড় চোখে তাকিয়ে আছে ক্যামেরার দিকে। আর আমি তাকিয়ে আছি কাচের ভেতরের অনিতার দিকে। এভাবে কয়েকটা সেলফি উঠালাম।
জীবনে চলার পথে, অনেক স্বপ্নই পূর্ণতায় প্রাণ পায়; যা স্থায়ী হয় না, শুধু স্মৃতির পাতায় দাগ টেনে চলে যায় অজানায়। কিছু কিছু ইচ্ছে যেন জলন্ত চুলাই ছিটিয়ে দেয়া তুষের মতো, যার পূর্ণতা মনের বিষ্ণতাকে সারা জীবন আগুন আগলে রাখে।
‘ভাই, দেখ আকাশে কিন্তু মেঘ করছে,’ তানহার কথা শুনে অনিতা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওমা! তাই তো চলেন চলে যাই। আজকে না ভিজে উপাই নেই।’ আমি দারুণ উপভোগ করছি।
কিছু দূর আসতেই মেঘ ভেঙে বৃষ্টি, বিলের জলের ওপর দিয়ে এমনভাবে আসছে, যেন আমাদের কে ভিজাবে বলে পণ করেছে। ভিজরাম শ্রাবণের বৃষ্টিতে। ভিজে ভিজে বাড়িতে ফিরলাম। কাল ভোরে চলে যাবে অনিতা। বৃষ্টিভেজা অনিতা ছবি হয়ে থাকবে হৃদয়ের পটে। জলসিক্ত অনিতার অনিন্দ্য সুন্দর দেহের ভাঁজগুলো সারাজীবন আমার ঘুম ভাঙাবে...
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.