মোহাম্মদপুরে দখল করা হচ্ছে খাল
মোহাম্মদপুরে দখল করা হচ্ছে খাল

মোহাম্মদপুরের তিন খাল গ্রাস করছে ভূমিদস্যুরা

আবু সালেহ আকন

মাত্র কয়েক মিনিটের বৃষ্টিতে রাজধানী অচল। কোনো কোনো এলাকায় শুরু হয় যায় নৌকা দিয়ে পারাপার। যে খালগুলোর কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত সরে যেত তার বেশির ভাগ আজ ভূমিদস্যুদের দখলের শিকার। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার এমনই তিনটি খাল গ্রাস করে চলেছে ভূমিদস্যুরা। প্রশাসনের চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটলেও সবাই নির্বিকার। উল্টো ভূমিদস্যুদের তারা সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে খাল ভরাট করে গড়ে উঠেছে পাকা স্থাপনা।


জলাবদ্ধতা নিরসনে ও দ্রুত পানি নিষ্কাশনে ঢাকার খালগুলো দখলমুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এসব কোনো নির্দেশনাই আমলে নিচ্ছে না ভূমিদস্যুরা। প্রকাশ্য দিবালোকে ট্রাকে ট্রাকে বালু ফেলে খাল ভরাট করা হচ্ছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায়। কাঁটাসুরের সুজন-সখি খাল, হাইক্কার খাল ও রামচন্দ্রপুর খাল দখল করে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। সেখানে তৈরি করা হচ্ছে আন্তঃজেলা ট্রাক স্ট্যান্ড। খালের পাড়ের বস্তি ও দোকানঘর উচ্ছেদ করে চলছে ভরাট কার্যক্রম। 


সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে বসিলা রোড সংলগ্ন কাঁটাসুরের সুজন-সখি খাল ভরাট করা হচ্ছে। ট্রাকে ট্রাকে মাটি এনে ফেলা হচ্ছে খালে। স্থানীয়রা জানান, বাংলাদেশ আন্তঃজেলা ট্রাকচালক ইউনিয়ন, ঢাকা মেট্রোপলিটন ট্রাকচালক সমিতি ও মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে এই খাল ভরাট করা হচ্ছে। এর নেপথ্যে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের হাত আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। 


সুজন-সখি খালপাড়ের বসিলা রোড লাউতলা একতা বাজারের একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের দোকানপাট উচ্ছেদ করে খাল ভরাট চলছে। আনোয়ার হোসেন নামে এক দোকানদার জানান, তার দোকানটি ৫ আগস্ট ভেঙে দেয়া হয়েছে। সেখানে এখন মাটি ভরাট করে ফেলা হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো খালটি ভরাট হয়ে যাবে। এতে মোহাম্মদপুর এলাকার পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন পদ্ধতি বন্ধ হয়ে পড়বে। বসিলা রোডের অপর বাসিন্দা আরজু মিয়া জানালেন, সরকার দলীয় ছত্রছায়ায় লালিত মাস্তানরা এই খাল ভরাট করছে। তারা চেয়ে চেয়ে দেখলেও প্রতিবাদ করার সাহস পান না। 


একইভাবে সাত মসজিদ হাউজিং বাইতুল জান্নাত জামে মসজিদের পশ্চিম অংশে রামচন্দ্রপুর খালটিও ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ট্রাকে ট্রাকে বালু, ইট খোয়া ফেলে কয়েকশত শতাংশ জমি ভরাট করে ফেলা হয়েছে। খালের পাড় ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে গরুর খামার। কয়েকটি হাউজিং কোম্পানি নামেও ভারাটের কাজ চলছে।


স্থানীয়রা জানান, মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজারের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম রামচন্দ্রপুর ও কাঁটাসুরের দুইটি খাল। বসিলা এলাকায় খাল তিনটি সংযুক্ত হয়ে তুরাগ নদীতে মিশেছে। কিন্তু নব্বই দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করায় রামচন্দ্রপুর খাল দুই ভাগ হয়ে যায়। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের পর রামচন্দ্রপুর খালের এক অংশ পড়েছে বাঁধের ভেতর মূল শহরের মোহাম্মদপুর-রায়েরবাজার এলাকায়। অন্য অংশ বাঁধের বাইরে বসিলা সংলগ্ন এলাকায় পড়েছে। শহরের ভেতর খালের প্রবাহ থেমে যাওয়ায় ঢাকা ওয়াসা সাইনবোর্ড টাঙিয়ে জানিয়ে দিয়েছে এখানে এক সময় খাল ছিল। এরপর ভূমিদস্যুদের দখলদারিত্ব শুরু হয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে প্রবাহমান খালের ওপর। 


জানা গেছে, ২০১২ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদ্যোগে রামচন্দ্রপুর ও কাঁটাসুরের সুজন-সখি খাল এবং হাইক্কার খালের দুই দিকে সীমানা পিলার স্থাপন করা হয়। কিন্তু দখলদাররা এ পিলার উপেক্ষা করেই দখলদারি অব্যাহত রেখেছে। এরপর ২০১৩ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসন ও ঢাকা ওয়াসা উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দখলদারদের সরিয়ে দেয়। কিছুদিন দখল বন্ধ থাকার পর এখন আবারো অব্যাহত রয়েছে দখলবাজি।


রামচন্দ্রপুর খালের পশ্চিম অংশে বাগান বাড়ির পর একটা ত্রিমোহনী রয়েছে। খালের দু’টি শাখা একত্র হয়ে সোজা পশ্চিমে চলে গেছে তুরাগ নদীর দিকে। এ ত্রিমোহনী থেকে তুরাগ নদী পর্যন্ত খালের মরণ দশা চলছে। নবীনগর হাউজিং ও দয়াল হাউজিং কোম্পানির মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা চলছে খাল দখলের। রাবিশ মাটি ফেলে ১০০ ফুট প্রস্থের খালকে ইতোমধ্যে ২০ ফুটে নিয়ে এসেছে। এ দু’টি কোম্পানি ছাড়াও খাল দখলে যোগ দিয়েছে চাঁদ হাউজিং, বসিলা গার্ডেন সিটি ও চন্দ্রিমা হাউজিং।


এ দিকে ট্রাকস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে রয়েছে জাকের ডেইরি ফার্ম নামে গরুর খামার। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ফার্মের মাধ্যমেই রামচন্দ্রপুর খালের দখল শুরু হয়। সামান্য জমির মালিক হয়ে ডেইরি ফার্ম মালিক দখল করেছেন খালের বিশাল অংশ। ডেইরি ফার্মের দখলের পর উত্তর দিকে খালের কিছু অংশ অবশিষ্ট ছিল, সেটিও দখল হয়ে গেছে। বর্তমানে এ অংশে নতুন থানা ভবনের নির্ধারিত স্থান লেখা সাইনবোর্ড টাঙানো আছে। এর পাশেই খাল ভরাট করে দোকানপাট নির্মাণ করেছেন এক প্রভাবশালী।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.