তারিক সালমন
তারিক সালমন

একজন ইউএনও, বিচার বিভাগ সার্ভিস রুল ও আইন

সিরাজ প্রামাণিক

বহু বছর আগে মার্কিন মানবতাবাদী মার্টিন লুথার কিং লিখেছিলেন, যেকোনো জায়গায় অবিচার ঘটলে তা সব জায়গার সুবিচারকে হুমকির মুখে ফেলে। তারিক সালমন বরিশালের আগৈলঝাড়ার ইউএনও থাকাকালে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে ‘বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃত করে ছাপিয়েছিলেন’- এ অভিযোগে সর্বপ্রথম বরিশালের জেলা প্রশাসক ড. গাজী সাইফুজ্জামান গত ৩ এপ্রিল তাকে শোকজ করেন এবং তার বিরুদ্ধে ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কেন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট প্রেরণ করা হবে না’ তার যথাযথ কারণ সাত কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়। তারিক সালমন শোকজের জবাবও দেন। জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় ডিসি বিষয়টি বিভাগীয় কমিশনারকে অবহিত করেন। বিভাগীয় কমিশনার মো: গাউস ১৮ এপ্রিল তারিক সালমানের শোকজের জবাব ‘সন্তোষজনক নয়’ মর্মে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে লিখিতভাবে অবহিত করেন। এরপর বিষয়টি নিয়ে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ওবায়েদ উল্লাহ সাজু গত ৭ জুন ওই ইউএনওর বিরুদ্ধে মানহানি মামলা করেন। বরিশালের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক মো: আলী হোসাইন সার্বিক দিক বিবেচনা করে মামলাটি আমলে নিয়ে ইউএনওকে গত ১৯ জুলাই আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। নির্ধারিত দিনে আদালতে হাজির হন তারিক সালমন। ক্ষুব্ধ আইনজীবীরা জামিনে আপত্তি দাখিল করেন।

পরিস্থিতি শান্ত করতে বিচারক আদেশ পরে দেয়া হবে জানিয়ে আসামিকে পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। পরিস্থিতি শান্ত হলে ২ ঘণ্টা পর বিচারক তাকে জামিনে মুক্তি দেন। এরই মধ্যে শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি। অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ঘটনার জোর প্রতিবাদ জানানো হয়। গ্রেফতারের ওই ঘটনায় ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত বিস্মিত হয়েছেন’ বলে তার উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম জানিয়েছেন। এ ঘটনায় মামলার বাদি বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ওবায়েদ উল্লাহ সাজুকে ‘কেন স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না’ জানতে চেয়ে নোটিশ দেয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। অবশেষে তারিক সালমনের বিরুদ্ধে মামলাটি গত ২৩ জুলাই আদালতের মাধ্যমে প্রত্যাহার করে নেন মামলার বাদি।

বাংলাদেশ সার্ভিস রুল পার্ট-১ রুল ৭৩ মতে, সরকারি কোনো কর্মচারী ফৌজদারি অপরাধে হাজতে গেলে তিনি সাথে সাথে সাময়িকভাবে বরখাস্ত বলে গণ্য হবেন। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পেলেও সাময়িক বরখাস্ত চলমান থাকবে যতক্ষণ না মামলা নিষ্পত্তি হয়। তবে আত্মসমর্পণের দিনই জামিন পেলে কোনো সমস্যা নেই। এই বিধিতে ব্যবহৃত ‘জেলে আটক’ শব্দ দ্বারা আদালতের হেফাজতে নেয়াকে অন্তর্ভুক্ত করেছে বলে গণ্য করতে হবে। জেলে আটক হওয়ার দিন থেকে সাময়িক বরখাস্ত বলে বিবেচিত হবেন এবং বিচারকার্যক্রম শেষ না হওয়া অবধি বিধি ৭১-এর বিধান মোতাবেক খোরপোশভাতা পাবেন।

বাংলাদেশ সার্ভিস রুল পার্ট-১ রুল ৭৩-এর যদি ব্যতিক্রম না থাকে তাহলে বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে যেহেতু বলা হয়েছে, ইউএনওকে হাজতে নেয়া হয়েছিল এবং ঘটনা যদি সত্যি হয়, তবে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী তিনি বর্তমানে ‘সাময়িকভাবে বরখাস্ত হবেন’- এটাই আইনের ব্যাখ্যা। এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগে, হাজতে যাওয়ার পর জামিনে মুক্ত হয়ে কিভাবে তিনি সরকারি দায়িত্বে আছেন?

এবার প্রশ্ন উঠতে পারে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯৭-এর প্রয়োগ নিয়ে। এই আইনের অধীন জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা ১৯৭-এর বিধান আবশ্যিকভাবে প্রতিপালন করতে হবে।
প্রাসঙ্গিক আলোচনায় বলা হয়েছে, সরকারের পূর্বানুমতি ছাড়া যেকোনো অপরাধের জন্য কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে আদালত কর্তৃক মামলা গ্রহণ অননুমোদিত ও এখতিয়ারবহির্ভূত বলে গণ্য হবে।

কিন্তু ফৌজদারি কার্যবিধির ৫২৯-এর (ঙ) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, যদি কোনো ম্যাজিস্ট্রেট আইনে ক্ষমতাবান না হওয়া সত্ত্বেও ভুলক্রমে সরল বিশ্বাসে ১৯০ ধারার (১) উপধারার (ক) অনুচ্ছেদ বা (খ) অনুচ্ছেদ অনুসারে অপরাধ আমলে গ্রহণ করে, তবে এ নিয়মের দরুন কার্যধারা বাতিল হবে না। এ থেকে প্রমাণিত হয়, আদালতের ভুল আদেশ বলতে কিছু নেই।

এ দিকে সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা আছে, আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যেকোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।

সব বিতর্কের অবসান ঘটাতে বঙ্গবন্ধুর ছবি বিকৃতির অভিযোগে বরগুনার ইউএনওর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার নথি তলব করেছেন প্রধান বিচারপতি। যার কাছে নথি চাওয়া হয়েছে, সেই বিচারক চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলী হোসেন এরই মধ্যে ইন্টারনেটে সংশ্লিষ্ট নথি পাঠিয়েও দিয়েছেন। তবে ২৩ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর পাঠানো নথির সাথে একটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন তিনি। ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘আদালতের কার্যপ্রণালী শেষে এজলাস ত্যাগ করে খাসকামরায় এসে শুনি ইউএনও সাহেবের জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে মর্মে অনলাইন মিডিয়ায় সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে ইউএনও সাহেবের জামিনের আবেদন একটিবারের জন্যও নামঞ্জুর করা হয়নি। ফলে জেলহাজতে প্রেরণের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’
বরিশালের চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরো বলেন, ‘এ মামলার শুনানিকালে ফরিয়াদি ওবায়দুল্লাহ সাজু এবং তার পক্ষে উপস্থিত থাকেন বর্তমান সংসদ সদস্য এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস (আদেশ প্রদানের পূর্বে এজলাস ত্যাগ করেন), সাবেক সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুর রশিদ, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও সম্পাদক অ্যাডভোকেট শেখ আবদুল কাদের, অ্যাডভোকেট আনিছ উদ্দিন আহম্মদ শহীদসহ ৫০-৭০ জন আইনজীবী। আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোখলেছুর রহমান।

শুনানি চলাকালে আদালত কক্ষ যেমন আইনজীবীদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ ছিল, তেমনিভাবে আদালতের বারান্দা এবং সংলগ্ন রাস্তায় উৎসুক জনসাধারণসহ মিডিয়া কর্মীদের উপস্থিতিতে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ বিরাজমান ছিল। শুনানি চলাকালে উৎসুক জনসাধারণের রোষানল হতে ইউএনও সাহেবের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য শুনানি মুলতবি করি এবং ইউএনও সাহেবের আইনজীবীর নিবেদন মোতাবেক কাগজাত (প্রয়োজনীয় নথি) দাখিল করতে বলি এবং আরো মৌখিক আদেশ দেই যে, কাগজাত দাখিলের পরে পুনরায় শুনানি হবে। তখন ইউএনওকে আদালত কক্ষে বসাতে বলি। আদালতে কর্তব্য পালনরত পুলিশ সদস্য ইউএনওর সার্বিক ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সাধ্যমতো চেষ্টা করেন। ইউএনও সাহেবকে আদালতের ডক থেকে পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিয়ে আদালতের কক্ষে বসানোর জন্য আদালত কক্ষের এক দরজা দিয়ে বের হয়ে বারান্দা ব্যবহার করে অন্য দরজা দিয়ে আদালত কক্ষে আনতে হয়েছে। এই সময়ে মিডিয়ার কর্মীরা বা অন্য কেউ কোনো ছবি তুলেছেন কি না তা অবলোকন করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এই সময়ে কী সংবাদ প্রচার করা হয়েছে তাও আমি বিচারকার্য পরিচালনাধীন থাকায় জানতে পারিনি।’

তিনি আরো বলেছেন, ‘অতঃপর ইউএনও সাহেবের পক্ষে কাগজাত দাখিল হলে এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির অবসান হলে জামিনের দরখাস্ত এবং দ্য কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর ১৮৯৮-এর ২০৫ ধারার দরখাস্ত আইনানুগ প্রক্রিয়া পালনপূর্বক মঞ্জুরক্রমে সসম্মানে জামিন প্রদান করা হয়। আমি ইউএনও সাহেবের আদালত কক্ষ ত্যাগের পরে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয় এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি পরিহারের জন্যই তৎক্ষণাৎ জামিনের দরখাস্তের আদেশ না দিয়ে কাগজাত দাখিল হলে শুনানি অন্তে আদেশ দিব বলে উদ্ভূত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছি।’

মানবাধিকার আইনের নীতিমালা মতে, একজন অভিযুক্তকে অবশ্যই নিম্নলিখিত সুযোগ দিতে হবে।
ক) সুস্পষ্ট অভিযোগ লিখিতভাবে আনতে হবে। খ) অভিযোগ সমর্থনে প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। গ) অভিযোগ প্রমাণে সাক্ষীদের জবানবন্দী নিতে হবে। ঘ) অভিযুক্তকে অভিযোগকারী ও তার সাক্ষীদের জেরার সুযোগ দিতে হবে। ঙ) অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সুযোগ ও সময় দিতে হবে। চ) অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজ পছন্দ মোতাবেক বিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগের এবং পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। ছ) আত্মপক্ষ সমর্থনে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাক্ষ্য ও সাক্ষী উপস্থাপনের সুযোগ দিতে হবে।

‘কগনিজেন্স’ পাওয়ার মানে অপরাধ আমলে নেয়ার ক্ষমতা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ে বলা আছে, ‘কগনিজেন্স পাওয়ার’ একটি বিচারিক ক্ষমতা। এটা সর্বতোভাবেই বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ। সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, বিচারপতি এ টি এম আফজাল, বিচারপতি মোস্তাফা কামাল ও বিচারপতি লতিফুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে ওই অভিমত দিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন- ডিসিরা ও তাদের অধীনস্থ নির্বাহী হাকিমরা কি বিচারক? বিচারক না হলে তাদের বিচারিক প্রক্রিয়ায় ঢুকতে দেয়া হবে কেন?

সম্প্রতি ডিসিরা ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬০ ও ২৬২ ধারা ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশের তফসিলের পেটে ঢুকিয়ে দেয়ার আবেদন করেছেন, কিন্তু সিআরপিসির সংশোধন ছাড়া এটা করা যাবে না। অবশ্য তাতে কী? কেমন করে সংসদে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করাতে হয়, সেটা তারা বিলক্ষণ জানেন। সরকারি দলকে টোপ দেয়া সহজ। সামনে নির্বাচন। ডিসিরা হবেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। নির্বাচন হবে দলীয় সরকারের অধীনে। তখন নির্বাহী হাকিমরা ‘নির্বাচনে ঘুষ’, ‘এক ব্যক্তির পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির ভোট দেয়ার’ মতো নির্বাচনী অপরাধের সংক্ষিপ্ত বিচার করতে পারবেন।

আসামি আইনজীবীর সুবিধা পান। মোবাইল কোর্টে তা-ও লাগে না। কগনিজেন্স পাওয়ার দেয়া হলে কোর্টগুলো আরো বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। সিআরপিসিতে ১৯০ ধারার ৪ উপধারাটির সংযোজন তাই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রতি অব্যাহত হুমকি। ডিসিদের কগনিজেন্স পাওয়ার দেয়া হলে দেশে রাতারাতি একটি ব্যাপকভিত্তিক সমান্তরাল বিচার বিভাগের জন্ম নেবে। তখন আদালতপাড়ার চিত্র বদলে যাবে। খুনখারাবি, রাহাজানি, ছিনতাই, টেন্ডার-সন্ত্রাস কিংবা বাড়ি দখল অপরাধ যতই জঘন্য হোক, ডিসিরা এসংক্রান্ত অভিযোগ, মামলা ইত্যাদি হয়তো আমলে নিতে শুরু করবেন। এর সবচেয়ে বড় মওকা হবে জামিন দেয়া।

বিচারের জন্য প্রস্তুত বা রেডি ফর ট্রায়াল বলে একটা কথা আছে। ওই ৪ উপধারা বলেছে, নির্বাহী হাকিমরা শুধু বিচারের জন্য কোনো মামলা বিচারিক হাকিমদের কাছে পাঠাবেন। এর আগেই অনেক পর্যায় পেরোতে হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, তদন্ত ও জামিন। একই সাথে একই ক্ষমতা দেশের বিচারিক আদালতগুলোরও থাকবে। সুতরাং পুলিশ ও টাউটরা মিলে একই মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে ডিসি অফিস ও আদালত চত্বর দুই স্থানে লাইন লাগাবে। যেখানে সুবিধা পাবে, সেখানে তারা মামলা ঠুকতে পারবে। মামলার সংশ্লিষ্ট পক্ষরা এখন সাত ঘাটের পানি খেলে, তখন খাবে চৌদ্দ ঘাটে।

আমরা সংবিধান ও মানবাধিকারের প্রতি হুমকি বিবেচনায় মোবাইল কোর্ট নামের দ্বৈত বিচারব্যবস্থার অবসান চাই। ১৯০ ধারার ৪ উপধারার অবিলম্বে অবসান চাই। সামারি ট্রায়ালের ক্ষমতা দাবি করাকে নির্বাহী বিভাগের পেশাগত অসদাচরণ বলে দেখা উচিত। বিচার বিভাগকে সজাগ থাকতে হবে। মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম অচিরেই উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে বাতিল হবে বলে আশা করি। ভারত ডিসিদের দ্বারা জজিয়তি না করিয়ে যদি সুশাসন ও প্রবৃদ্ধি, দুটোই দিতে পারে তাহলে বাংলাদেশ অক্ষম হবে কেন।

পরিবর্তিত সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চলতে না পারলে আইন তার কার্যকারিতা হারায়। প্রয়োজন হয় সে আইনকে সময়ের উপযোগী করে তোলা। গঠনমূলক সমালোচনার মধ্যেই আইন তার অস্তিত্বের সন্ধান পায়, কিন্তু আজো আমাদের পুরো আইনব্যবস্থায় রয়েছে ব্রিটিশদের শঠতার ছোঁয়া।

উপনিবেশবাদী ব্রিটিশ তাদের দুষ্কর্ম ঢাকতে আইনব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিল। তৎকালীন ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস ১৭৭২ সালে আইনব্যবস্থার গোড়াপত্তন করে তিনিই সর্বপ্রথম আইন ভঙ্গ করেন। তার অধস্তন কর্মচারী জার্মান চিত্রশিল্পীর পরমা সুন্দরী স্ত্রীকে দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে স্বর্ণের দামে খরিদ করেছিলেন। আজকের আদালতে ব্যবহৃত ন্যায়বিচারের প্রতীক দাঁড়িপাল্লাকে তিনিই প্রথম অনৈতিক কাজে ব্যবহার করেন। মূলত ব্রিটিশ আইন তৈরি হয়েছিল শাসন-শোষণের জন্য এবং দরিদ্র কৃষকের জমির খাজনা আদায়ের জন্য কিংবা প্রজাকে কাচারিতে ধরে নিয়ে মারধর, হাত-পা বেঁধে আঁধার কুঠুরিতে ফেলে রাখা, প্রজার স্ত্রী-কন্যাকে বন্ধক হিসেবে আটক রাখা, বিষয়সম্পত্তি ক্রোক করা এবং ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার মতলবে। স্বাধীন বাংলাদেশের আইনব্যবস্থা এখনো তার উত্তরাধিকার বহন করছে কেন?

যে আইন মানবাধিকার রক্ষা করতে পারে না, যে আইন ন্যায়ের নীতিমালা রক্ষা করতে পারে না, যে আইন সংবিধান সমুন্নত রাখতে পারে না, যে আইন সব স্বচ্ছতা, যৌক্তিকতা ও পদ্ধতিগত সংহতি রক্ষা করতে পারে না; সেই আইন জনস্বার্থ রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে সক্ষম, এ কথা বিশ্বাস করার কোনো যৌক্তিক অবকাশ নেই।

এ কথা সত্য, মোবাইল কোর্ট আইন বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, মাদক, বালু উত্তোলন বা খাসজমি দখলের অনেক ঘটনা এবং সফল ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের প্রাণঘাতী কর্মতৎপরতা অনেকাংশে ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু অনাকাক্সিক্ষত প্রয়োগ আইনের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ ও পর্যুদস্ত করবে।

লেখক : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী,
আইন গ্রন্থপ্রণেতা
seraj.pramanik@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.