মনে পড়ে ফেরিওয়ালা আঙ্কেলকে

তারেকুর রহমান

খুব ছোটবেলায় অনেকটা সময় গ্রামে ছিলাম। গ্রামে মাঝেমধ্যে ফেরিওয়ালা আসত। প্রয়োজনীয় নানা জিনিসপত্র তারা বিক্রি করত। আমাদের বাড়িতে প্রায়ই একজন ফেরিওয়ালা আসত। তার কাছ থেকে বাড়ির মহিলারা জিনিসপত্র ক্রয় করত। একদিন আম্মু কিছু জিনিস কিনছিল। তার পাশে আমি দাঁড়িয়ে আছি। ফেরিওয়ালা আমাকে দেখে বলল, বাবু এ দিকে আসো তো। আমি তার কাছে গেলাম। আমাকে জিজ্ঞেস করল, বাবু তোমার নাম কী? নাম বলার পর আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
এর পর থেকে ফেরিওয়ালা যত দিন এসেছে প্রতিদিন আমার জন্য চকলেট নিয়ে আসত। প্রথম প্রথম আম্মু আমাকে তার কাছে যেতে দিত না। গ্রামে একটা কথা প্রচলন ছিল, ছেলেধরা বিভিন্ন ছদ্মবেশে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের ধরে নিয়ে যায়। একদিন তাকে আম্মু খুব বকা দেয়। আমার জন্য কেন চকলেট আনে। অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না। আম্মুর কথা শুনে লোকটার চোখ ছলছল করতে লাগল। আম্মুকে বলল, আপা আসলে আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই। আপনার ছেলের মতো আমারও একটা ছেলে ছিল। কয়েক মাস আগে পুকুরে ডুবে মারা গেছে। ওকে দেখলে আমার ছেলেটার কথা মনে পড়ে। তাই ওকে একটু বেশি আদর করি। ফেরিওয়ালার কথা শুনে আম্মু অবাক হয়ে যায়।
ফেরিওয়ালা লোকটাকে আমি ফেরিওয়ালা আঙ্কেল বলতাম। আর তিনি আমার নাম দিয়েছিলেন বাবু। তিনি আসার সময় আমার জন্য চকলেট নিয়ে আসতেন। আর আমি তাকে প্রতিদিন পান দিয়ে আসতাম। গ্রামে কেউ এলে তাকে পান খেতে দেয়া হতো। চলে যাওয়ার সময় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেন, বাবু ভালো থেকো, আবার দেখা হবে।
গ্রাম ছেড়ে যে দিন আমরা শহরে চলে আসব, সে দিন ভোরে ফেরিওয়ালা আঙ্কেল আমাদের বাড়িতে হাজির হয়। আমার জন্য খুব সুন্দর একটা জামা নিয়ে আসে। আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কান্নাকাটি করে। তখন খুব ছোট ছিলাম, অতকিছু বুঝতাম না।
আজ অনেক বড় হয়েছি। মাঝেমধ্যে ফেরিওয়ালা আঙ্কেলকে খুব মনে পড়ে। আমাদের গ্রামে তেমন যাওয়া হয় না। গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানলাম এখন আর ফেরিওয়ালা আঙ্কেল আসে না। জানি না ফেরিওয়ালা আঙ্কেল বেঁচে আছে কি না।কিন্তু আজও তার ভালোবাসার কথা খুব মনে পড়ে। মনে হয় স্নেহের হাত আমার মাথায় বুলিয়ে দিচ্ছেন। ইচ্ছে করে তার কাছে ছুটে যাই। এই ইটপাথরের নিষ্ঠুর শহরে এরকম ভালোবাসা বেশি মিস করি। ভালো থাকেন ফেরিওয়ালা আঙ্কেল।
মিরপুর , ঢাকা

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.