জাতীয় খেলা হাডুডু

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

আমাদের জাতীয় খেলা হাডুডু। ‘স্বস্তির নিঃশ্বাসটুকু অন্তত ফেলা যায় এ ভেবে যে, এখনো কাগজে-কলমে, বই কিংবা পুস্তকে আমাদের জাতীয় খেলা হাডুডুই। হাডুডুর অন্য নাম কাবাডি। এখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে খেলাটি অতটা পরিচিত না হলেও পাঠ্যপুস্তকে এখনো হাডুডু বিদ্যমান রয়েছে। একেবারে মুছে যায়নি।’ অথচ একসময় আমাদের লোকজ সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল জনপ্রিয় এই খেলাটি। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরপরই গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আনাচে-কানাচে হাডুডুকে ঘিরে রীতিমতো মেলা বসে যেত। ছেলে-বুড়ো থেকে শুরু করে গ্রাম্য ললনাসহ সবার এক দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল শারীরিক কারসাজি আর কসরতে ভরা খেলাটির ওপর। মুহুর্মুহু হর্ষধ্বনি ও করতালিতে মুখরিত টানটান উত্তেজনাপূর্ণ আবেগতাড়িত সে সময়গুলোর কথা ভুলতে পারলাম কই? অবশ্য কেউ কেউ বলে থাকি, ‘ক্রিকেট নামক বাণিজ্যিক খেলাটির আড়ালে এসব জনপ্রিয় খেলাগুলো চাপা পড়ে গেছে’। সব সম্ভবের দেশ বলেই এমনটা সম্ভব। আশপাশে দেশগুলোর দিকে তাকালেও বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যায়। ভারতের কথাই ধরা যাক, তারা ক্রিকেট পাগল জাতি হিসেবে বিশ্বে সমধিক পরিচিত। তাদের ধ্যানে-জ্ঞানে ও কর্মে ক্রিকেট শুধু ক্রিকেট। তারা তাদের জাতীয় খেলা হকিকে নিয়ে পৃষ্ঠপোষকতার কমতি রাখে না। শুধু তাই নয়, হাডুডু বা কাবাডি খেলা নিয়েও তাদের মাতামাতি কম নয়। আইপিএলের আদলে কাবাডি নিয়েও তারা প্রতি বছর সফলভাবে আয়োজন করে আসছে।

হাডুডু বা কাবাডি এশিয়া মহাদেশের দেশগুলোর একটি জনপ্রিয় খেলা। বিশেষ করে উপমহাদেশের এটি একটি প্রাচীন খেলা। এই উপমহাদেশে অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন নামে এ খেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। যেহেতু আঞ্চলিক খেলা; তাই কোনো বিধিবদ্ধ নিয়মকানুন ছিল না। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী হাডুডু খেলার পোশাকি নাম কাবাডি। কিছু দিন আগে পর্যন্ত হাডুডু খেলাই ছিল বিনোদনের অন্যতম উৎস। হাডুডুু প্রতিযোগিতার বিজয়ী দলকে পুরস্কারস্বরূপ ষাঁড়, খাসি, পিতলের কলসি কিংবা সোনা-রুপার মেডেল উপহার দেয়া হতো। এটি একটি দলীয় খেলা এবং এ খেলায় খরচ বলতে কিছুই নেই। ধারণা করা হয় যে, প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মানুষ এককভাবে বা দলীয়ভাবে শিকার করতে এবং বন্যপ্রাণীর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে শিখেছিল, তখনই কাবাডির সূচনা। পুরো দক্ষিণ এশিয়াতে কাবাডি প্রচলিত থাকলেও এর উৎপত্তিস্থল পাঞ্জাব। কাবাডির উৎপত্তি সম্পর্কে আরেকটি মত হচ্ছে, মহাভারতে বর্ণিত অভিমন্যু কর্তৃক কৌরব সৈন্যদের চক্রব্যূহ ভেদ করার ব্যর্থ চেষ্টার ঘটনা থেকে ধারণা নিয়ে এ খেলার সৃষ্টি হয়।

প্রত্যেক খেলারই একটা নির্দিষ্ট নিয়মনীতি রয়েছে। ওই নিয়মনীতি মেনে খেলাটাকে খেলতে হয়। তদ্রƒপ হাডুডু খেলাও। খেলা শুরু করার আগে এ খেলার বিভিন্ন নিয়ম ও মাঠের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের মাপ জানা থাকা দরকার। 

মাঠের সাইজ : ৪২ ফুট লম্বা ও ২৭ ফুট চওড়া। খেলার মাঠকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ভাগকে কোট বলা হয়।

মোট সময় : ৪৫ মিনিট (২০ মিনিট + ৫ মিনিট + ২০ মিনিট) অবশ্য মাঝের ৫ মিনিট বিরতি দেয়া থাকে।

খেলার নিয়ম : হাডুডু খেলার শুরুতে খেলোয়াড়দের দু’টি দলে ভাগ করে নিতে হয়। প্রতিটি দল তাদের দলনেতা নির্বাচন করে। নেতার অধীনে দুই দলে সমানসংখ্যক খেলোয়াড় থাকে। সাধারণত খেলোয়াড় থাকে ১২ জন। তবে প্রতিবার সাতজনের দল নিয়ে খেলতে হয়। দুই পক্ষের দুই দল মুখোমুখি অর্ধ-বৃত্তাকারে দাঁড়ায়। খেলা শুরু হলে একপক্ষ দম রেখে হাডুডু বা কাবাডি বলতে বলতে ডাক দিতে থাকে এবং মধ্যরেখা পার হয়ে বিপক্ষের কাউকে ছুঁয়ে দম থাকা অবস্থায় দ্রুত পালিয়ে আসতে চেষ্টা করে। যদি কাউকে ছুঁয়ে আসতে পারে তবে সে ‘মরা’ বলে গণ্য হয়। আবার আক্রমণকারী যদি বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়দের হাতে ধরা পড়ে তবে সে-ও মরা বলে গণ্য হয়। একজন মরা খেলোয়াড় আর খেলতে পারে না, তাকে কোটের বাইরে অপেক্ষা করতে হয়। যদি মরা দলের কেউ প্রতিপক্ষের কাউকে ছুঁয়ে আসতে পারে তবে মরা পুনরায় বেঁচে যাবে। আক্রমণে পরাজিত হওয়াকে মরা এবং বিজয়ী হওয়াকে বাঁচা বলে। এই খেলার মজার একটা নিয়ম আছে। সেটা হলো ৮০ কেজি বেশি ওজনের কাউকে এই খেলায় নেয়া হয় না। এই খেলা পরিচালনা ও বিচারকার্য করে থাকেন একজন রেফারি, দু’জন আম্পায়ার, একজন স্কোরার।

হাডুডু খেলাটি এখনো বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় মাঝে মধ্যে দেখা যায়। খোঁজ-খবর পেয়ে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার ভুশ্চি এলাকার কিছু আগ্রহী ও উৎসাহী তরুণদের পাওয়া গেছে, যারা শখের বশে হাডুডু বা কাবাডির মতো জনপ্রিয় খেলাটি আজও খেলে থাকেন। তারা দেশীয় ঐতিহ্য ও কৃষ্টি-কালচারকে ধারণ করার প্রয়াসে হাডুডু ছাড়াও ফুটবল, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার কিংবা আজকের জনপ্রিয় ক্রিকেটসহ অপরাপর বিভিন্ন খেলাগুলোও নিয়মিত চর্চা করে থাকেন। এ বিষয়ে কথা বলতে এতদাঞ্চলের হাডুডু খেলার বিশেষজ্ঞ ও একসময়ের তুমুল খেলোয়াড় জুলফে আলীর মালের সাথে যোগাযোগ করি। তাকে প্রশ্ন করার পর জানতে পারি, তরুণদের এই নিজস্ব উদ্যোগে তিনি আবেগে আপ্লুত ও খুশি। কারণ শারীরিক কসরত ও ব্যায়াম-কৌশলে ভরা খেলাটিকে তিনি খুব শৈশব থেকে ভালোবাসেন। কোথাও হাডুডু খেলা হলে তিনি এখনো আবেগে আপ্লুত হন এবং ছুটে চলে যান খেলা দেখতে। অনেক সময় খেলোয়াড়দের নিজে থেকে বিভিন্ন টিপস বা কৌশল বাতলে দেন। নিজের অভিজ্ঞতা তরুণদের মাঝে শেয়ার করেন। যে সময়ে তিনি নিয়মিত হাডুডু খেলা খেলতেন। সে সময়ের কথা বলতে গিয়ে তার চোখ আনন্দে চিক চিক করে ওঠে। তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বললেন, হাডুডু খেলায় শরীর মন সতেজ, চাঙা ও প্রফুল্ল থাকে।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.