মেহেরপুর থেকে ৩০ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা ৬ সমবায় সমিতি

ওয়াজেদুল হক মেহেরপুর

মেহেরপুরে প্রায় ৩০ কোটি টাকার আমানত নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে ছয়টি সমিতির পরিচালক। এতে জেলার কয়েক হাজার লোক তাদের আমানতের অর্থ হারিয়ে এখন নিঃস্ব প্রায়। এর মধ্যে সর্বশেষ গত জুলাই মাসে কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকা নিয়ে গাঢাকা দিয়েছে ‘জনতা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড’। মেহেরপুর শহরের হোটেল বাজার এলাকায় সমিতির ভাড়া অফিসের দরজায় এখন তালা ঝুলছে। বাড়ির মালিক আব্দুল আওয়াল জানান, ২০১২ সালে তার বাড়ির দ্বিতীয় তলা ভাড়া নিয়ে সমিতির কার্যক্রম শুরু হয়। তাদের কার্যক্রম ভালো মনে হওয়ায় তিনিও তাদের কাছে ছয় লাখ টাকা সঞ্চয় রাখেন। কিন্তু হঠাৎ করে রাতে কিছু না জানিয়ে অফিসে তালা ঝুলিয়ে গাঢাকা দিয়েছেন সমিতির কর্মকর্তারা। আমানতের অর্থ ফেরত পেতে আদালত ও বিভিন্ন দফতরে ঘুরছেন ভুক্তভোগীরা। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তারা।
জেলা সমবায় অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে কুষ্টিয়া জেলা সমবায় অফিস থেকে নিবন্ধন নিয়ে ২০০৩ সালে কার্যক্রম শুরু করে জনতা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড। এরপর ২০১২ সালে মেহেরপুরে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার চার শতাধিক মানুষের কাছ থেকে কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে তারা। এ সমিতির প্রধান কার্যালয় কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া বাজারে। সমিতির চেয়ারম্যানের নাম খন্দকার আবুল কালাম আজাদ (৫০)। ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারই ছোট ভাই খন্দকার শরিফুল আলম। তাদের বাড়ি তারাগুনিয়া গ্রামে। প্রথম দিকে তাদের কার্যক্রম কুষ্টিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পর্যায়ক্রমে তা মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, খুলনা, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী ও রংপুরে বিস্তৃত হয়। এভাবে সারা দেশে প্রতিষ্ঠানটির ৫৬টি শাখা খোলা হয়। যা সমবায় আইনের ২৩-এর (ক) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ওই আইনে বলা হয়েছে, কোনো সমবায় সমিতি তার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোনো শাখা অফিস খুলতে পারবে না। আইন অমান্য করে একের পর এক শাখা অফিস খুললেও সমবায় অফিসের কর্মকর্তারা অদৃশ্য কারণে এ সমিতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমিতির একটি শাখার একজন কর্মকর্তা মোবইল ফোনে জানান, প্রধান শাখাসহ ৫৬টি শাখা থেকে কয়েক হাজার গ্রাহকের শতাধিক কোটি টাকা আমানত জমা নেয় এ সমিতি। গত এক বছর ধরে আমানতকারীরা তাদের টাকা ফেরত চাইলেও তা দেয়া হচ্ছে না। এখন প্রধান কার্যালয় ও সব শাখা অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যার কারণে আমানতকারীদের পাশাপাশি সমিতির শাখাগুলোর প্রায় ৩৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীও পড়েছেন বিপাকে। গাঢাকা দেয়া আবুল কালাম আজাদ ও তার ছোট ভাই খন্দকার শরিফুল আলমের মোবাইল ফোন এখন বন্ধ রয়েছে।
এর আগেও একইভাবে মেহেরপুর থেকে বিভিন্ন সময়ে আইডিয়াল কো-অপারেটিভ সোসাইটি, এভারগ্রিন কো-অপারেটিভ সমবায় সমিতি, বাদিয়াপাড়া সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি, সততা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি, আলবারাকা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতির পরিচালকেরা রাতে তাদের অফিসে তালা ঝুলিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। এ সমিতিগুলো আমানতকারীদের কাছ থেকে জমা নেয়া কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। এসব সমিতির কর্মকর্তারা বিশেষ করে ছোট-বড় ব্যবসায়ী, বিভিন্ন দফতরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের টার্গেট করে। বেশি মুনাফা দেয়ার লোভ দেখিয়ে তাদের কাছে আমানত ও সঞ্চয় জমা রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। ব্যাংক যেখানে সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ মুনাফা দেয় সেখানে এসব প্রতিষ্ঠান ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। বেশি মুনাফার আশায় হাজার হাজার মানুষ তাদের অর্থ আমানত হিসেবে জমা রাখে ওই সব প্রতিষ্ঠানে। মানুষ প্রলোভনে পড়ে লাখ লাখ টাকা আমানত রাখায় জেলা ছেড়ে বাইরের জেলাতেও শাখা অফিস খুলে বসে সমিতিগুলো। যা সমবায় আইনের ২৩ এর (ক) ধারার লঙ্ঘন। আবার কেন্দ্রীয় সমিতি বা জাতীয় সমবায় সমিতির সাথে ‘ব্যাংক’ শব্দ ব্যবহার না করার নির্দেশনা থাকলেও কোনো কোনো সমিতি তাদের নামের সাথে ব্যাংক শব্দও ব্যবহার করে। এসব আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় গেল ১০ বছরে মেহেরপুরে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠে ২২টি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি। আবার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সমিতির সদস্যদের বাইরে অন্য মানুষকেও ঋণ দেয়া হয়, যা সমবায়নীতির পরিপন্থী। এখনো ১৮টি প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষের আমানত জমা রয়েছে প্রায় ২৮ কোটি টাকা। আর ৩০ কোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। ভুক্তভোগীদের অনেকেই তাদের টাকা ফেরত পেতে ঘুরছেন আদালত ও বিভিন্ন দফতরে।
মেহেরপুর শহরের বোসপাড়ার অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ ইন্সপেক্টর কায়েম উদ্দিন জানান, ২০১০ সালে তিনি অবসরে যান। এ সময় এককালীন ১৩ লাখ টাকা পান তিনি। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা আমানত রাখেন জনতা সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেডের কাছে। প্রতি লাখে মাসিক এক হাজার ৫০০ টাকা করে মুনাফা দেয়ার কথা ছিল। প্রায় এক বছর তাকে ওই হারে মুনাফা দেয়া হয়। এর পর থেকে তারা নানা অজুহাতে অনিয়ম শুরু করে। তিন বছর পরে তার আমানতের টাকা ফেরত চাইলে সমিতির কর্মকর্তারা টালবাহানা করতে থাকেন। হঠাৎ করে একদিন সকালে তিনি দেখেন সমিতির অফিসের দরজায় তালা ঝুলছে। কোনো লোকজন নেই। রাতে পালিয়ে গেছেন তারা। এখন তিনি ঠিকমতো সংসার চালাতে পারছেন না। স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও আত্মীয়স্বজনের কাছে তিনি এখন অসহায়। প্রতারকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এবং টাকা ফেরত পেতে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা সমবায় অফিসার, দুর্নীতি দমন কমিশন, সমবায়মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর দফতরে আবেদন করেছেন তিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ফল পাননি। এ সমিতি ৪০০ গ্রাহকের কাছ থেকে কমপক্ষে পাঁচ কোটি টাকা নিয়ে গাঢাকা দিয়েছে বলেও জানান তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গৃহবধূ জানান, তার স্বামী একজন ছোট ব্যবসায়ী ছিলেন। এক সড়ক দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি অসুস্থ। তিনি তার বাবার জমি বিক্রি করা ১২ লাখ টাকা আমানত রাখেন ওই সমবায় সমিতিতে। প্রতি মাসে শতকরা ১৮ টাকা মুনাফা দেয়ার কথা ছিল। দেড় বছর ঠিকমতো টাকা দেয়া হয়। কিন্তু তিন বছর পর টাকা ফেরত চাইলে তারা নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে। এক সময় পালিয়ে যান সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এখন অসুস্থ স্বামীর জন্য ওষুধ পর্যন্ত কিনতে পারছেন না তিনি। একমাত্র সন্তানের পড়ালেখাও বন্ধ হওয়ার পথে।
হোটেল বাজারের ব্যবসায়ী আবুল বাসার জানান, তিনি তার নিজের ও স্বজনদের ৪০ লাখ টাকা আমানত রাখেন জনতা সঞ্চয় ও ঋণদান দান সমবায় সমিতির কাছে। আমানতের টাকা হারিয়ে এখন তারা সবাই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। স্বজনদের কাছে তিনি এখন হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছেন। সবাই তাকে ধিক্কার জানাচ্ছেন। থানাপাড়ার কাওছার আলী জানান, ১০ বছর বিদেশে থেকে যে টাকা জমিয়েছিলেন তার সবটাই আমানত রাখেন তিনি। ওই টাকা হারিয়ে এখন তিনি নিঃস্ব। সমবায় অফিসে গেলে তারা ওই সমিতির নামে মামলা করতে বলে। থানায় গেলে পুলিশ বলে কোর্টে গিয়ে মামলা করতে। কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছেন না তিনি। তার মতো কয়েক হাজার আমনতকারী সব টাকা হারিয়ে অসহায়ের মতো বিভিন্ন দফতরে ঘুরছেন।
জেলা সমবায় কর্মকর্তা কাজী মিজানুর রহমান বলেন, পালিয়ে যাওয়া সমিতিকে নোটিশ করা হয়েছে। কিন্তু নোটিশ গ্রহণ না করায় তা ফেরত এসেছে। সমিতির কার্যক্রম চলমান অবস্থায় বিষয়টি ধরা পড়েনি। তবে পালিয়ে যাওয়া সমবায় সমিতির কর্মকর্তারা সাধারণত দু’টি খাতায় লেনদেনের রেকর্ড রাখতেন। যার একটি তাদের সামনে উপস্থাপন করা হতো বলে প্রতিয়মান হয়েছে। এ ছাড়া সমিতিগুলো আমানতের টাকা সমিতির সদস্যদের বাইরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও শ্রেণী-পেশার মানুষকে ঋণ দিতো। সেই ঋণ তারা ঠিকমতো আদায় করতে পারছে না।
মেহেরপুর সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. ইনাম হোসেন বলেন, রেজিস্ট্রেশন নিয়ে সমিতি খুলে বসলেই হবে না। সমিতির সাথে সংশ্লিষ্ট সবার আমানত থাকতে হবে। আর সব আমানতকারীর মতামতের ভিত্তিতে সমিতি পরিচালিত হতে হবে। কিন্তু এখানে তা হয়নি। যে সমিতির কর্মকর্তা হয়ে বসেছেন এবং যাদের দিয়ে সে সমিতির কার্যক্রম পরিচালনা করিয়েছেন তাদের কোনো আমানত ওই সমিতিতে ছিল না। যার কারণে তারা অন্যের টাকা নিয়ে পালিয়েছেন। সমবায় আইনটি আরো যুগোপযোগী করে তোলা দরকার বলেও তিনি মনে করেন।
মেহেরপুর জেল প্রশাসক পরিমল সিংহ জানান, যারা পালিয়ে গেছেন তাদের খোঁজখবর নেয়া হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। পাশাপাশি চলমান প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিও নজরদারি রাখা হবে বলে জানান তিনি।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.