আবারো বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ চায় দেশীয় কোম্পানি

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

বিদেশী বিনিয়োগ করতে দেশীয় গ্রুপের আগ্রহ আবারো দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি গ্রুপ আবার বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছে। এসব কোম্পানি বলেছে, স্বল্প পরিসরে হলেও তাদেরকে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দিলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে এবং একই সাথে দেশের লোকও বিদেশে এসব শিল্পকারখানায় কাজ করার সুযোগ পাবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ চেয়ে আমাদের কাছে আবেদন করে। এর আগেও তিনটি গ্রুপ আবেদন করেছিল। তাদের প্রস্তাবগুলো অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাঠানোও হয়েছিল। কিন্তু তা ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন আমরা দেখব নতুন করে যারা আবেদন করছে তাদের প্রস্তাবগুলো কতখানি বাস্তবসম্মত। বাস্তবসম্মত না হলে তা অনুমোদনের কোনো সুযোগ নেই। কোন কোন গ্রুপ নতুন করে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ চেয়েছে সেগুলোর নাম দেয়া সম্ভব নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে এর মধ্যে দেশের একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর নাম রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জানা গেছে, এর আগে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ চেয়ে আকিজ, হা-মীম ও নিটল-নিলয় গ্রুপ অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করে। প্রাথমিকভাবে এ তিনটি ব্যবসায়িক গ্রুপ বিদেশে মোট তিন কোটি ৭৪ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করার কথা বলেছে, বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ৩০০ কোটি টাকারও বেশি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (সাবেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ) সূত্রে জানা গেছে, তিন ব্যবসায়িক গ্রুপের প্রস্তাব অনুযায়ী মালয়েশিয়ায় দু’টি কোম্পানি অধিগ্রহণে আকিজ জুট মিলস লিমিটেড ২ কোটি মার্কিন ডলার, হাইতিতে একটি তৈরী পোশাক কারখানা স্থাপনে হা-মীম গ্রুপ ১ কোটি ৪৪ হাজার মার্কিন ডলার ও আফ্রিকার গাম্বিয়ায় একটি ব্যাংক (গাম্বিয়া কমার্স অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল ব্যাংক লিমিটেড) স্থাপনে নিটল-নিলয় গ্রুপ ৭০ লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করতে চায়। বিদেশে বিনিয়োগের অনুমতি চেয়ে গ্রুপ ও প্রতিষ্ঠান তিনটি ইতোমধ্যেই পৃথকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছেও আবেদন করেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়, বিদেশে ইকুইটি বিনিয়োগের আবেদন দিন দিন বাড়ছে। তবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশে কোম্পানি অধিগ্রহণে এত বিপুল অর্থ পাঠানোর নজির নেই।
এই বিনিয়োগ প্রস্তাব অনুমোদনের আগে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়ার সুপারিশ করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যথেষ্ট উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। গত বছরের নভেম্বরের যা ছিল দুই লাখ ৭৭ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। এই তারল্য অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। এ প্রেক্ষিতে জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ন্যূনতম স্থানীয় বিনিয়োগ জিডিপির ৩২ ভাগ হওয়া প্রয়োজন। এ পর্যায়ে স্থানীয় বিনিয়োগ উৎসায়িত না করে বিদেশে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া যথাযথ হবে কি না তা সতর্ক বিবেচনার দাবি রাখে।’
সূত্র জানায়, দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিদেশে ইকুইটি বিনিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদনে বৈদেশিক রিজার্ভ পরিস্থিতি, বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবে ভারসাম্য, জিডিপির কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়ানো প্রভৃতি বিষয় পর্যালোচনা করে সতর্কভাবে তা বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিদেশে ইকুইটি বিনিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করা হলে রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
উপরন্তু বিদেশে বিনিয়োগপ্রসূত রিটার্ন এ দেশে প্রত্যাবাসন হবে কি না, তাও নিশ্চিত নয়।
এসব দিক বিবেচনায় চারটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলো হচ্ছেÑ বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত না হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা; ওই বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত উপার্জন ও মূল বিনিয়োগকৃত অর্থ দেশে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করা; প্রস্তাবিত খাতে অর্থ বিনিয়োগ করা হলে এতে দেশ অধিকতর লাভবান হবে কি না, তা বিবেচনা করা এবং বিদেশে মূলধন বিনিয়োগের ফলে সেখানে এ দেশীয় কর্মসংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত করা।
রিজার্ভের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বিদেশে ইকুইটি বিনিয়োগের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি। বর্তমানের রিজার্ভ দিয়ে সাত থেকে আট মাসের পণ্য ও সেবা আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও রিজার্ভ প্রবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধি ও রফতানি প্রবৃদ্ধির বর্তমান হার খুবই ধীরগতি সম্পন্ন। এ ছাড়া গত ডিসেম্বর থেকে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি খাত উদ্বৃত্ত থেকে হ্রাস পেয়ে ঘাটতি অবস্থানে রয়েছে। গত ১ মার্চ পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদি ঋণের স্থিতির পরিমাণ ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। অন্য দিকে রিজার্ভের অর্থ থেকে প্রতি বছর দুই বিলিয়ন ডলার (২০০ কোটি ডলার) নিয়ে পাঁচ বছরে ১০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে ‘বাংলাদেশ সার্বভৌম সম্পদ তহবিল’ এবং আড়াই বিলিয়ন ডলার দিয়ে ‘রফতানি উন্নয়ন তহবিল’ গঠন করেছে সরকার। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশে ইকুইটি বিনিয়োগের প্রস্তাব বিবেচনা করা হলে রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.