শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত স্থান :  নয়া দিগন্ত
শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নির্ধারিত স্থান : নয়া দিগন্ত
বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ অর্থায়ন

শাহজাদপুরে হচ্ছে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়

শফিউল আযম বেড়া (পাবনা)

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম গোচারণ ভূমি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের রাউতরা বাথান। ব্রিটিশ আমলে নীলকর সাহেবদের নীল চাষ তদারকির নীলকুঠি ছিল বাথান এলাকার বুড়িপোতাজিয়া মৌজার কুঠিরভিটায়। ইতিহাস খ্যাত এই স্থানসহ এর পাশের রাউতগাড়ি, রামকান্তপুর ও হান্নি মৌজায় বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ প্রয়াস ও অর্থায়নে ১০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে দেশের ৩৮তম পাবলিক বিশ^বিদ্যালয় ‘রবীন্দ্র বিশ^বিদ্যালয় বাংলাদেশ’। 

বড়াল, গোহালা, ধলাই, সোনাই, চিকনাই ও বলেশ^রী নদী বেষ্টিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি রাউতরা বাথান। মাঠ ভরা গরুর পাল, দিগন্তজোড়া শস্য, রাখালের বাঁশির মধুর সুর, জেলেদের মৎস্য আহরণের উৎসব, পাল তোলা নৌকায় নায়রি যাত্রা, মাঝির ভাটিয়ালি গান, গাঁয়ের কৃষাণী বধূর কলসি কাঁখে ঘরে ফেরা, মাছরাঙা, গাংচিল, পানকৌরির জলকেলি, ডাহুকের ডাক, শালিকের কিচিরমিচির, বকের ঝাঁকের উড়ে চলা, শিয়ালের হুক্কাহুয়া, গোচারণ ভূমিতে গরুর পালের হাম্বা হাম্বা ডাক, বাতাসে সোনালি ধানের দোলা, পড়ন্ত বিকেলে নদীর ঢেউয়ের সাথে সোনারোদের ঝিকিমিকি ভরা পূর্ণিমায় অবগাহন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বড় আকৃষ্ট করত। এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বার বার এই শাহজাদপুরে ছুটে আসতেন। তার বহু লেখায় তিনি এ প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন। তার ছিন্নপত্রে তিনি লিখেছেন, আমি এখানে এলে এক ধরনের আলাদা প্রশান্তি অনুভব করি, যা অন্য কোথাও পাই না। তিনি শিলাইদহ থেকে বোটে করে শাহজাদপুরের কাচারি বাড়িতে আসা-যাওয়ার পথে এই বাথান এলাকা অতিক্রমের সময় এর সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করতেন আর মুগ্ধ হতেন।

কবির সেই মনোমুগ্ধকর স্মৃতিকে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শাহজাদপুর রাউতরা বাথানের গোচারণ ভূমিতে বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন। এ বিশ^বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় ‘রবীন্দ্র বিশ^বিদ্যালয় বাংলাদেশ’, যা চলতি সেশন থেকে ক্লাস শুরুর মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন হবে। ইতোমধ্যেই মহামান্য রাষ্ট্রপতি রবীন্দ্র বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ চূড়ান্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন। অপর দিকে বিশ^বিদ্যালয় নির্মাণ স্থানে যেতে রাউতারা সড়কের পোতাজিয়া কবরস্থান থেকে বাথান এলাকা পর্যন্ত দুই  কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ ও পাকাকরণের কাজ শেষ হয়েছে। 

এ দিকে ভিসির আবাসস্থল, প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক ভবন প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে শাহজাদপুর উপজেলার বিসিক বাসস্ট্যান্ডে অবস্থিত সুইটড্রিম হোটেলকে প্রশাসনিক ভবন, শাহজাদপুর সরকারি কলেজের ড. মযহারুল ইসলাম বিজ্ঞান ভবন, বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ, হজরত মখদুম শাহদৌলা রহ: ডিগ্রি কলেজ, শাহজাদপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ, শাহজাদপুর মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের নবনির্মিত ভবনকে ক্লাসের জন্য অ্যাকাডেমিক ভবন হিসেবে অস্থায়ীভাবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এ ব্যাপারে লিখিত অনুমতি নিয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে।

শাহজাদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রফেসর আজাদ রহমান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার আলীমুন রাজীব এ বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, চলতি সেশনেই শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ^বিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু হবে। ইতোমধ্যেই ভিসি নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাই দ্রুতগতিতে এর সব প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া এ বিশ^বিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণস্থান বাথান ভূমির কুঠিরভিটা এলাকায় যেতে সড়ক পাকাকরণের কাজ শেষ হয়েছে। পিডি নিয়োগ হলেই বাথানে মাটিভরাট ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয়ে যাবে। এ ছাড়া শিগগিরই শিক্ষক ও অন্যান্য পদে লোকবলও নিয়োগ দেয়া হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

শাহজাদপুরের মুক্তিযোদ্ধা মো: সাইফুদ্দিন (তারা) বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই শাহজাদপুরে। তারই নামে এখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, এ জন্য আমরা গর্বিত ও আনন্দিত। এ অঞ্চলের অনেক গরিব মেধাবী শিক্ষার্থী অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন না। এ বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে সেখানে গরিব শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হবে। শত শত মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আসবে। এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।

শাহজাদপুর সদরে কথা হয় আলমগীর, কালাম, সামাদ, জব্বার, মন্টু, শাহন, সোহেলসহ আরো অনেকের সাথে। তারা জানালেন, এই বাথান ভূমিতে রবীন্দ্র বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ায় তারা মহাখুশি ও আনন্দিত। স্বল্পখরচে বাড়ির ভাত খেয়ে তাদের সন্তানেরা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাবে। এটা তাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া, যা তারা কখনো স্বপ্নেও ভাবেবনি। আজ তা বাস্তবে পরিণত হওয়ায় তারা মহাখুশি ও আনন্দিত। তারা অপেক্ষার প্রহর গুনছেন, কবে চালু হবে এর পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.