বিমানবন্দরে আগুন : কর্তৃপক্ষের গাফিলতি স্পষ্ট

কাজে আসেনি ২ কোটি টাকার ডিটেক্টর মেশিন

মনির হোসেন

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গঠিত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল এভিয়েশনের দু’টি তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। মূল টার্মিনাল ভবনের তিনতলায় এয়ার ইন্ডিয়াসহ ৩টি এয়ারলাইন্সের অপারেশন্স কার্যালয়ে গত শুক্রবার এ আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস এয়ার ইন্ডিয়া ও তার পাশে থাকা কাতার এয়ারওয়েজ ও সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের অফিস থেকে পুড়ে যাওয়া কম্পিউটারের যন্ত্রাংশসহ কিছু আলামত সংগ্রহ করে। একই সাথে সিভিল এভিয়েশনের বিদ্যুৎ বিভাগের (ইএম) নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট ১০-১২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবানবন্দী গ্রহণ করেছে। তবে এয়ারলাইন্সের অফিস সংশ্লিষ্ট কারো বক্তব্য তারা নিতে পারেনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আগুন লাগার পেছনে প্রাথমিকভাবে অনেক দুর্বলতা তারা খুঁজে পাচ্ছেন। এর মধ্যে বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় স্থায়ীভাবে অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা থাকা উচিত ছিল, যেটি তারা পাননি। তা ছাড়া ফায়ার ডিটেকশন অ্যালার্ম সিস্টেম সাম্প্রতিক সময়ে লাগানোর কথা বলা হলেও সেগুলো যথাসময়ে কাজ করেছিল কি না সেসবের তথ্য রেকর্ডসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কাছে।
এ দিকে আগুন লাগার নেপথ্য কারণ উদঘাটনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পাশাপাশি সিভিল এভিয়েশন অথরিটির পরিচালকের (প্রশাসন) নেতৃত্বে গঠিত অপর একটি তদন্ত কমিটিও তদন্তকাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে।
বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, গতকাল শনিবার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের গঠিত তিন সদস্যের তদন্তকারী দলের প্রধান উপপরিচালক দেবাশীষ বর্ধন ও অপর দুই সদস্য বিমানবন্দরে যান। তারা বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত এয়ার ইন্ডিয়ার পুড়ে যাওয়া অফিস, পাশের কাতার এয়ারওয়েজ ও সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের অফিস পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়া এয়ার ইন্ডিয়ার কান্ট্রি ম্যানেজার, স্টেশন ম্যানেজার, কাতার এয়ারওয়েজ ও সাউদিয়া এয়ারলাইন্সের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেন। তবে তারা সবাই আপসেট থাকায় কারো কাছ থেকে আগুন লাগার ব্যাপারে কোনো জবানবন্দী নিতে পারেননি। তবে এয়ার ইন্ডিয়ার তালাবদ্ধ অফিসের সম্ভাব্য যে স্থান থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে, এমন জায়গার ছবি ও পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, আসবাবপত্রসহ কিছু আলামত তদন্তকারী দলের সদস্যরা সংগ্রহ করেন। এর পরই সিভিল এভিয়েশনের বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ১০-১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর জবানবন্দী গ্রহণ করেন তারা।
গতকাল ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের উপপরিচালক ও তদন্ত কমিটির প্রধান দেবাশীষ বর্ধন নয়া দিগন্তকে বলেন, আজ থেকে আমরা ইনভেস্টিগেশন শুরু করলাম। ক্ষতিগ্রস্ত এয়ারলাইন্সের অফিস ভিজিট করলাম। আগুনের সূত্রপাত হতে পারে এমন সব সম্ভাব্য স্থানের ছবিও নিয়েছি। তদন্ত চলমান থাকবে। আজ শুধু বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ কয়েকজনের জবানবন্দী নিয়েছি। তবে সবচেয়ে বেশি পুড়ে যাওয়া এয়ার ইন্ডিয়াসহ আরো দু’টি এয়ারলাইন্সের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলতে চাইলে তারা জানিয়েছেন তারা আপসেট। তাই আগামীকাল তাদের জবানবন্দী নেয়া হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিমানবন্দরে যে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রয়েছে তা ‘ইন ফাইট ফায়ার ফাইটার’। কোনো ভবন বা স্থাপনার জন্য এসব অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে আগুন নেভানোর কাজ করা সম্ভব নয়। ভবনে থাকা অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আগুন নেভাতে কি সংশ্লিষ্টরা ব্যর্থ হয়েছেনÑ এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিমানবন্দরে যে ফায়ার ফাইটার সিস্টেম রয়েছে সেগুলো মূলত ফাইট ওঠানামার কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আগুনের পর যে ধোঁয়া হয়েছিল তাতে ওই অগ্নিনির্বাপক দিয়ে আগুন নেভানো দূরের কথা তার ধারেকাছেও যাওয়া সম্ভব নয়। যেগুলো ছিল সেগুলোও কাজে আসেনি। প্রাথমিক তদন্তে তিনি মনে করছেন, ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যাওয়ার ১৫-২০ মিনিট আগেই আগুন লেগেছিল। কিন্তু ফায়ার ডিটেকশন অ্যালার্ম যথাসময়ে ডিটেক্ট করতে না পারায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে অফিস থেকে আশপাশে। এতে পুরো টার্মিনাল বিল্ডিং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
সিভিল এভিয়েশনের একটি সূত্র জানিয়েছে, কিছু দিন আগেই বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ, বিমানবন্দর টার্মিনালসহ পুরো টার্মিনাল বিল্ডিংয়ে ২ কোটি টাকারও বেশি টাকা খরচ করে ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম লাগানো হয়; যাতে আগুন লাগার সাথে সাথে কোথা থেকে ও কিভাবে আগুন লেগেছে তা স্ক্রিনে শনাক্ত হয়ে যাবে। আর এ কাজটি করেছেন সিভিল এভিয়েশনের ঠিকাদার উইং কমান্ডার (অব:) নাসির উদ্দিন। অভিযোগ রয়েছে, কাজটি ঠিকভাবে করা হয়নি। এ ব্যাপারে ঠিকাদার নাসিরের সাথে গতকাল বিকেলে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের তদন্ত দলের প্রধান দেবাশীষ বর্ধন নয়া দিগন্তকে বলেন, আগুনের ঘটনায় আমরা অনেক দুর্বলতা খুঁজে পাচ্ছি। তবে এখনো কী কারণে আগুন লাগতে পারে সেটি জানতে পারিনি। একইভাবে ক্ষয়ক্ষতিও তদন্তসাপেক্ষ। তবে এর মধ্যে ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম হচ্ছে অন্যতম। তিনি বলেন, সিভিল এভিয়েশনের প্রকৌশলীরা আমাদের কাছে দাবি করেছেন, ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম কাজ করার কারণেই আগুনের বিষয়টি সাথে সাথে বিমানবন্দরের স্ক্রিন বোর্ডে ভেসে উঠেছিল। ওই স্ক্রিনে উঠেছিল ‘ফায়ার অন এয়ার ইন্ডিয়া অফিস’। তাদের বক্তব্য মতে আমরা তাদের কাছে আগুন লাগার কতক্ষণ পর ফায়ার ডিটেকশন ডিসপ্লেতে শো করেছিল সেই তালিকা চেয়েছি রেকর্ডসহ। এ ছাড়াও আগুন লাগার স্থান থেকে ৩০ ফুট দূরে পানির লাইন ছিল। তবে সেটিতে পানির প্রেসার ছিল কম। দুর্বল থাকায় পানি সরবরাহও ঠিকমতো হয়নি। এসব দুর্বলতা উল্লেখ করার পাশাপাশি কিভাবে বিমানবন্দরের ফায়ার সার্ভিস সিস্টেম নিরাপদ থাকবে আমরা তদন্ত শেষে প্রতিবেদনের সুপারিশে উল্লেখ করব। একই সাথে গাফিলতির সাথে যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে তাদের নামও দেবো।
ফায়ার ডিটেকশন সিস্টেম কাজ করেছিল কি না তা জানতে গতকাল শনিবার দুপুরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কাজী ইকবাল করিমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি টেলিফোন ধরেননি। তবে বিমানবন্দরের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা রাশিদা সুলতানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, মি. নাসির ফায়ার ডিটেকশনের অ্যালার্ম শনাক্তে যে ইকুইপমেন্ট লাগিয়েছেন, সে কারণেই তো এয়ার ইন্ডিয়ার অফিসে আগুন লাগার ঘটনা সহজে ডিটেক্ট হয়েছে। না হলে আমরা কিভাবে জানলাম? তদন্ত কমিটির সদস্যরা অনুসন্ধান করে কোনো অনিয়ম পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজকে তো ছুটির দিন। তবে ওনারা তদন্তকাজ করছেন। এ ব্যাপারে আমি কিছু বলতে পারছি না। তবে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা সব ঠিক আছে।
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার বেলা ১টা ৩৭ মিনিটে বিমানবন্দরের মূল ভবনের তিনতলার এয়ার ইন্ডিয়ার তালাবদ্ধ অফিসে হঠাৎ আগুন ধরে যায়। এর পরই তা মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে পুরো বিমানবন্দরের অভ্যন্তরের আশপাশে। এ সময় বিদেশগামী যাত্রীরা কেউ বোর্ডিং কার্ড নিচ্ছিলেন, কেউ ইমিগ্রেশনে লম্বা লাইনে ছিলেন। কেউবা কাস্টমস সম্পন্ন করছিলেন। স্টাফরা ছিলেন যার যার কাজে ব্যস্ত। এর পরই পুলিশ, র‌্যাব, আনসারসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বিমানবন্দরের ভেতর থেকে সবাইকে বের করে দেন। এর পরই একটানা দেড় ঘণ্টা চেষ্টার পর ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ও সিভিল এভিয়েশনের ২টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণ করে। আগুনে কয়েক কোটি টাকার আসবাবপত্র পুড়ে যায় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এতে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম ৩ ঘণ্টা বন্ধ থাকে। অনেক যাত্রীর স্বজন বাইরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এর জের পড়ে বিমানবন্দর গোলচত্বরেও। সেখানে বহু গাড়ি আটকা পড়ে। বিকেল ৫টায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হজ ফাইটসহ অন্যান্য ফাইটের অপারেশন শুরু হয়। এ সময় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে নির্ধারিত সময়ে ১৮টি ফাইট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। সেগুলো এক থেকে ৪-৫ ঘণ্টা বিলম্বে বিমানবন্দর ত্যাগ করে।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.