স্মার্টকার্ডে প্রায় হাজার কোটি টাকা গচ্চা

নিজস্ব প্রতিবেদক

বন্ধ রয়েছে নাগরিকদের জন্য উন্নতমানের স্মার্টকার্ড উৎপাদন। চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে ৯ কোটি স্মার্টকার্ড ছাপিয়ে তা ভোটারদের মাঝে বিতরণের কথা ছিল। ফ্রান্সের ওবারথুর টেকনোলজি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতায় ৮৭ ভাগ কাজ বাকি রেখেই গত মাস থেকে উৎপাদন বন্ধ হয় স্মার্টকার্ডের। ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় হাজার কোটি টাকা।
এ দিকে চুক্তি লঙ্ঘন, রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা ক্ষুণœ, প্রতিষ্ঠানকে ইমেজ সঙ্কটে ফেলে দেয়া এবং আর্থিক ক্ষতিÑ এই চার কারণে ওবারথুর সংস্থার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে আইডিয়া প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। এর জন্য সুপ্রিম কোর্টের আইন বিশেষজ্ঞ কিউসি আজমালুল হককে আইনি পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্র্তৃপক্ষ।
জাতীয় নিবন্ধন অনুবিভাগের ডিজি এবং আইডিয়া প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জে. মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম বলেন, ওবারথুর চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, ব্যর্থতা আছে। সব কিছু মিলিয়ে এখন পর্যন্ত কাজ (পারসোনালাইজেশন) হয়েছে মাত্র ১২.৪১ শতাংশ। তাদের যে ব্যর্থতা তাতে কোনোভাবেই ওবারথুরকে ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। চুক্তি ভঙের কারণে রাষ্ট্রের সঙ্গে যে প্রতারণা করেছে সেজন্য তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনে যেখানে যাওয়া দরকার সেখানে যাওয়া হবে। তবে, প্রতিষ্ঠানটি যদি সহজে আসে তাহলে সহজে মীমাংসা হবে এবং তারা যদি জটিল পথে যায় তখন প্রয়োজনে বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া হবে। ডিজি বলেন, স্মার্টকার্ড পারসোনালাইজেশনসহ সমস্ত কাজ এখন দেশেই করা হবে। কাজটি যেভাবে করা যায় সেভাবেই আমরা অগ্রসর হচ্ছি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্মার্টকার্ড প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয় ১৩৭৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্মার্টকার্ড মুদ্রণ থেকে বিতরণ পর্যন্ত হিসাব ধরেই অর্থ বরাদ্দ করা হয়। ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান ওবারথুর টেকনোলজির সঙ্গে ব্লাঙ্ক কার্ড উৎপাদন, সাপ্লাই এবং মুদ্রণ ও বিতরণে চুক্তি হয় ৮০৯টি কোটি টাকার। ২০১৫ সালের ১৪ জানুয়ারি চুক্তি অনুযায়ী দেড় বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে ফ্রান্স থেকে ৯ কোটি কার্ড উৎপাদন করে বাংলাদেশে আমদানীকরণ, ইসির পারসো সেন্টারে মুদ্রণ করে উপজেলা-থানা পর্যায়ে বিতরণ করা এবং সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের এ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ প্রদান ও ডকুমেন্টেশন হস্তান্তর করার কথা ছিল।
কিন্তু ওবারথুর কার্যক্রম সম্পাদনে বিভিন্ন সমস্যা, অজুহাত উপস্থাপন করতে থাকে। একপর্যায়ে কার্ডের হলোগ্রাম সমস্যার জন্য তারা দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে এবং দ্বিতীয় পক্ষের সঙ্গে চুক্তির নামে প্রকল্পের অনুমোদন গ্রহণ করে। চুক্তির মেয়াদের দেড় বছরে ৯ কোটির মধ্যে কার্ড মুদ্রণ হয় ১.৫১ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ৯৮.৪৯ শতাংশ এবং উপজেলা-থানা পর্যায়ে বিতরণ হয় মাত্র ১.১৩ শতাংশ এবং ব্যর্থতা ছিল সংস্থার ৯৮.৮৭ শতাংশ।
এত ব্যর্থতার পরও ফ্রান্সের ভিতথ্রি থেকে ব্লাঙ্ক কার্ড উৎপাদন করে সাপ্লাই করা যথা সময়ে সম্ভব হবে নাÑ এ অভিযোগ হাজির করে আরো এক বছর মেয়াদ বাড়িয়ে সময় নির্ধারণ হয় গত ৩০ জুন ’১৭। হলোগ্রাম সমস্যার জন্য কার্ড উৎপাদন বন্ধ থাকায় যথাসময়ে কার্ড উৎপাদন ও পারসোনালাইজেশন নিশ্চিত করার স্বার্থে ফ্রান্সের ভিতথ্রির পাশাপাশি চীনের শেনজেকে কার্ড উৎপাদনের অনুমতি দেয়া হয়।
কিন্তু সকল প্রকার সহযোগিতা করার পরও ওবারথুর টেকনোলজি প্রকল্প শেষ করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি। উদ্যোগের মধ্যে ছিল পারসোনালাইজেশন মেশিনের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা, সর্বোচ্চ থ্রু পুট অর্জিত হওয়া, অনসাইট মেইনটেইন্যান্স টিমের মাধ্যমে টেকনিক্যাল সাপোর্ট নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় জনবলের সংস্থান করা, রিকভারি পরিকল্পনা পেশ করা ও ট্রেনিং ও ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করা। এসব উদ্যোগের একটিও বাস্তবায়ন না করে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয় প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি তাদের অপেশাদার আচরণের কারণে পরবর্তী মেয়াদ বাড়ানোর পরও গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত মুদ্রণ বন্ধ ছিল।
প্রকল্পের এই নাজুক অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে ইসি। পরিস্থিতি উত্তরণে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সিইসির সভাপতিত্বে কমিশন সচিব ও আইডিয়া প্রকল্প পরিচালক বৈঠক করে। পরে ২১ এপ্রিল সিইসি ওবারথুর শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আরেকটি বৈঠক করে। সেখানেও রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। এই বৈঠকের পর আরো কিছু পদক্ষেপ নেয়ার অঙ্গীকার করে সংস্থাটি, যার মধ্যে ছিল ১০টি মেশিনে সর্বোচ্চ থ্রু পুট করা, অতিরিক্ত ১৫টি মেশিন আনা, অন সাইট সাপোর্ট সার্ভিস নিশ্চিত করা, মেইনটেইন্যান্স টিম ও ইকুইপমেন্ট সরবরাহ, তিনটি শিফট চালু ও অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং ট্রেনিং ডকুমেন্টেশন সম্পন্ন করা। ইসির কাছে সংস্থাটির অঙ্গীকার ছিল গত ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা। এর আগে সংস্থাটিকে ১৫টি নোটিশ ও তাগিদপত্র দেয়া হলেও তারা কোনোটিই আমলে নেয়নি। আর প্রতিশ্রুত ১৫টি মেশিনের পরিবর্তে আটটি আমদানির কথা থাকলেও সেটা পূরণ করেনি।
উল্টো ওবারথুর ই-মেইলের মাধ্যমে গত ১৩ মে ইসির তথ্য ভাণ্ডারে প্রবেশাধিকার ও অডিট করার আগ্রহ দেখায় এবং পুনরায় চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর তাগিদ দেয়। ফলে ৩০ জুনের মধ্যে কার্যকর উন্নতি না করায় ওই সময়ই চুক্তি শেষ হয়।
দেখা গেছে, সর্বশেষ বাড়ানো এক বছর মেয়াদের মধ্যে কোনো উন্নতি ঘটেনি বরং অবনতির চিত্রই ফুটে ওঠে। গত ৩০ জুন পর্যন্ত স্মার্টকার্ড বাস্তবায়নের চিত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্লাঙ্ক কার্ড উৎপাদন ও সাপ্লাইয়ের পরিমাণ ছিল ৬৬.৩৬ মিলিয়ন, অগ্রগতির হার ৭৩.৭৪; ব্লাঙ্ক কার্ড উৎপাদন ও সাপ্লাই বাকি ছিল ২৩.৬৪ মিলিয়ন, এ ক্ষেত্রে কোম্পানির ব্যর্থতা ছিল ২৬.২৭ শতাংশ। একইভাবে কার্ড মুদ্রণ মাত্র ১২.৪১ শতাংশ এবং ব্যর্থতা ৮৬.২১ শতাংশ এবং ওই সময়ে উপজেলা-থানা পর্যায়ে বিতরণে সংস্থাটির ব্যর্থতা ছিল ৮৭.৮০ শতাংশ।
এ দিকে ওবারথুর এই ব্যর্থতা পুষিয়ে নিতে এবার স্মার্টকার্ড মুদ্রণ ও বিতরণ কাজও দেশের অর্থায়ন এবং নিজস্ব উদ্যোগে সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। তারা স্মার্টকার্ড প্রকল্পের অপারেটরসহ টেকনিক্যাল এক্সপার্ট ও সাপোর্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী দিয়ে কাজটি শেষ করবে। মোট ১১৩০ জনবলের সঙ্গে আরো প্রায় ১০০ ডাটা এন্ট্রি অপারেটর নিয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে আইডিয়া কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি সংস্থাটির বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘন ও রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতারণা ও প্রতিষ্ঠানের ইমেজ ও আর্থিক ক্ষতির কারণে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার বিষয়ে বিবেচনা করছে। এর জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত হয়েছে।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.