ধামরাইয়ের কারুকার্যখচিত কাঁসার তৈজসপত্র 
ধামরাইয়ের কারুকার্যখচিত কাঁসার তৈজসপত্র 

ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল শিল্পে দুর্দিন

নবীন চৌধুরী ধামরাই (ঢাকা)

হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঁসা-পিতল শিল্প। আগেকার দিনে কাঁসা-পিতল সামগ্রী গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী হিসেবে দেখা যেত। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এসবের ব্যবহারে দিন দিন ভাটা পড়ছে।

ঢাকা জেলার বৃহত্তম উপজেলা ধামরাই কাঁসা-পিতলের জন্য বিখ্যাত ছিল। আগে শুধু বাংলাদেশ নয়, দেশের বাইরেও ছিল এসব সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা। এ ছাড়া বিদেশী পর্যটকেরা একসময়ে কাঁসা-পিতলের মধ্যে কারুকাজ খচিত জিনিসপত্র নিয়ে যেতেন। কিন্তু সেই কাঁসা-পিতল শিল্পের ঐতিহ্য আজ নানা সমস্যার কারণে দিনে দিনে হারিয়ে যেতে বসেছে। এই শিল্পের সাথে জড়িত শিল্পী ও ব্যবসায়ীরা বর্তমানে অভাব অনটনে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দেখার কেউ নেই। পৈতৃক পেশা ছেড়ে তাদের অনেকে বিভিন্ন পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের সমস্যা সমাধান করে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। 

কথা হয় ধামরাই মেটাল ক্রাফটসের স্বত্বাধিকারী সুকান্ত বণিকের সাথে। প্রায় দু’ শ’ বছর ধরে তারা বংশানুক্রমিকভাবে এ পেশায় আছেন। তিনি বলেন, ধামরাই উপজেলা সদরে নোটা, ঘটি, হাঁড়ি-পাতিল, থালা, গ্লাস, বদনা ও বিভিন্ন শোপিচ, দেবদেবী ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতিসংবলিত জিনিসপত্র তৈরির জন্য স্বাধীনতার আগে প্রায় ৩০-৪০টি কারখানা ছিল। বর্তমানে মাত্র ৪-৫টি কারখানা টিকে রয়েছে। আজকাল প্লাস্টিক, লোহা ও স্টিলের তৈরি জিনিসপত্র সহজলভ্য হওয়ায় কাঁসা-পিতল শিল্পে বেশ ভাটা পড়েছে বলে তিনি জানান। কিন্তু কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্র একবার কিনলে তা ২০-৩০ বছরেরও বেশি ধরে ব্যবহার করা যায়। শুধু তা-ই নয়, যে দামে কেনা হয়েছে বহু বছর ব্যবহারের পর তার চেয়েও বেশি দামে বিক্রি করা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। 

এ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে এসব জিনিসপত্র রফতানির ক্ষেত্রে তেমন একটা বেগ পেতে হতো না। বর্তমানে রফতানি করতে গেলে নানা সমস্যায় পড়তে হয়। এ ছাড়া সারা দিন কাজ করে একজন শ্রমিক যা পান তার চেয়ে বাইরে কাজ করলে অনেক বেশি টাকা আয় করতে পারেন। তাই দিন দিন শ্রমিকের সংখ্যাও কমে গেছে। ধামরাই মেটাল ক্রাফটসে কর্মরত শ্রমিক নিমাই পাল জানান, তিনি আগে বাপ-দাদার সাথে প্রতিমা তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বর্তমানে কাঁসা-পিতল শিল্পে প্রায় ২৩ বছর ধরে কর্মরত। তিনি বিভিন্ন দেবদেবীর ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতির কর্মকার। এখানে তিনি প্রতিদিন পাঁচ শ’ থেকে এক হাজার টাকা আয় করতে পারেন। 

আরো কথা হয় কাঁসা-পিতলের ব্যবসায়ী আনিসুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, বাপ-দাদার পেশায় ২৮ বছর ধরে ধামরাই বাজারে ব্যবসা করে আসছি। স্বাধীনতার পরও এ ব্যবসা ছিল জমজমাট। এ বাজারেই ছিলেন অনেক ব্যবসায়ী। বর্তমানে আছেন হাতেগোনা কয়েকজন। তিনি বলেন, এখন শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন মেয়ের বিয়েতে উপহার হিসেবে কাঁসা-পিতলের কিছু জিনিস কেনেন। তা ছাড়া আর কেউ এসব তেমন কেনেন না। তাই ব্যবসায় ভাটা পড়েছে। 

শিল্পকর্ম ব্যবসায়ী অরুণ বণিক জানান, কাঁসা-পিতলের থালার মধ্যে নকশা করে বিক্রি করলে এক হাজার থেকে এক হাজার দুই শ’ টাকা দাম পাওয়া যায়। এতে লাভ থাকে মাত্র দুই শ’ থেকে তিন শ’ টাকা; কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব ও উচ্চমূল্যের কারণে এ শিল্পের ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। গত ১৪-১৫ বছরে বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে প্রায় তিন গুণ। অন্য দিকে স্টিলের থালা, বাটি, চামচ, গ্লাসসহ বিভিন্ন জিনিসের আধিক্যের কারণে কাঁসা-পিতলের তৈরি জিনিসের চাহিদা কমে গেছে।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.