মা (ছবি : প্রতিকী)
মা (ছবি : প্রতিকী)

মায়ের তুলনা মা

নয়া দিগন্ত অনলাইন

অসুস্থ সখির শিয়রে জেগে নেই কেউ। যে যার মতো ঘুমে বেভোর। কিন্তু পঁচাত্তর-ঊর্ধ্ব মা ঠিকই জেগে আছেন। সখির হাত তার হাতের মুঠে বন্দী করে। বারবার করছেন জিজ্ঞাসা, পায়ে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে! একটু তেল মালিশ করে দেবো? দেবো কি আদা চা করে? সখি জানে, তার ভেঙে যাওয়া ব্যন্ডেজ করা পায়ে যাবে না তেল মালিশ করা। আর আদা চা খেলে ব্যথা তো কমবেই না, বরং রাতের ঘুম যাবে পালিয়ে। তবু সখি মুখে কিছু বলে না। বরং মায়ের হাতে হাত রেখে অনেক অংশে ব্যথার উপশম রোধ করেই পাচ্ছে স্বস্তি।

মুনার মা গত হয়েছেন দুই যুগ হতে চলল। কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও সে তার মাকে পারছে না ভুলতে। কোনো খাবার খেতে গেলে মায়ের কথা মনে পড়ে। মুখ মুছতে গেলে খড়ের চুলার ধোঁয়ার গন্ধমাখা আঁচল খুঁজে ফেরে। মাইগ্রেনের অসহ্য ব্যথায় কপালে মায়ের আশির্বাদী হাত এখনো হাতড়ে ফেরে। তবে বাস্তবে কোনো একজন মায়ের অনুভূতির ছোঁয়া পেতে সে ছুটে যায় শহর থেকে দূরে, বহু দূরের এক গ্রামে। ‘মা’ আয়শা খাতুনকে শুধু বলে- আসছি আমি।

মুনা যখন ওই বাড়িতে পা রাখে, তখন সন্ধ্যা হতে বেশি দেরি নেই। কাদামাখা পিচ্ছিল পথ। দেখে মনে হচ্ছিল মাত্র কিছুক্ষণ আগেই বৃষ্টি হয়েছে। অবশেষে ঘরে ঢোকামাত্রই আয়শা খাতুনের অকৃত্রিম আহ্বান। চোখে পড়ে ঘরের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা বাজার। জোড়ায় জোড়ায় দেশী মুরগি আঙিনায় বাঁধা। মুনা প্রশ্ন না করে পারে না। জানতে চায় আমি আসার সংবাদ শুনেই কি ঘোর বর্ষার সন্ধ্যায় এই আয়োজন? মা আয়শা খাতুন তার মাতৃসুলভ ভঙ্গিতেই বলেন, মায়ের কাছে আসছেন, মায়ের ভালোবাসা গ্রহণ করবেন না?

গ্রামে মাত্র দুই দিন হাট বসে। এই দুই দিনে কেনাকাটা না করতে পারলে, পুরো সপ্তাহ বাড়ির আঙিনায় রোপণ করা শাকসবজি, পুকুরের মাছ, পোষা হাঁস-মুরগি হয় প্রধান ভরসা। তাই ঝুঁকি নেননি। আগেভাগেই বাজারের পর্ব সেরেছেন বলেও জানান এই মা। মুনা তিন দিন ছিল ওই মায়ের কাছে। তার আন্তরিকতা অকৃত্রিম ভালোবাসায় ভুলে যেতে বসেছিল এই নারী তার সত্যিকারের মা নন। সম্পর্কের কেউ নন। কিন্তু সেই থেকে এক মুহূর্তের জন্যও অস্বীকার করতে পারেননি মায়েদের পরিচয় কেবলই মা। ভুলতে পারেননি বিদায়পর্বে আয়শা খাতুনের অশ্রু। যে অশ্রুর কোনো রঙ ছিল না। ছিল একটিই ভাষা- তা হলো অকৃত্রিম ভালোবাসা।

জেরিন হাওলাদার। একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। সারাক্ষণ নানাবিধ কর্মব্যস্ততায় থাকতে হয়। টেবিলে কলম রাখারও মুহূর্ত সময় তার হয়ে ওঠে না। সারাক্ষণ মিটিং-সংবাদ সম্মেলন, উপস্থিতদের সাথে কর্মপরিকল্পনা করেই যায় সময়। কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও এক-আধটু অবসর পেলেই ফোন হাতে তুলে নেন। নেন মায়ের অভিযোগ অনুযোগ নীরবে নিজের ঘারে তুলে।

জেরিন বলেন, মা আমাদের ৯ ভাই-বোনকে মানুষ করতে অনেক কষ্ট সহ্য করেছেন। দিন-রাত করেছেন পরিশ্রম। ভালো খেতে পাননি। পরেননি দামি কাপড়। তবু মায়ের মুখের হাসি হয়নি মলিন। কখনো তার শোয়ার জন্য ছেঁড়া কাঁথাও জোটেনি। কিন্তু ছেঁড়া বিছানায় শুয়েও তিনি স্বপ্ন দেখতে ভুলতেন না। সব সময়ের জন্য রাখতেন আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে। সব সময়ের জন্য জোগান অনুপ্রেরণা উৎসাহ। মা আমার কম শিক্ষিত হলেও তার শিক্ষিত মানুষ, শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ছিল বরাবরই। ইচ্ছে ছিল প্রতিটি সন্তানকে সুশিক্ষিত করার। শিক্ষার বলে অভাবের আঁধার ঘুচাবার।

মায়ের সব ইচ্ছা মহান আল্লাহ পূরণ করেছেন। আমরা প্রায় সব-ভাইবোনই শিক্ষার আলোয় পথ চলছি মাকে অনুপ্রেরণার কেন্দ্র মনে করেই। আসলে শুধু আমার মা নন, পৃথিবীর প্রতিটি মা-ই বোধ করি এমন। সন্তানদের ঘিরেই জীবন। এদের নিয়েই সব ব্যস্ততা কর্মচঞ্চল জীবন, আশা-ভরসাও বলে জানান বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠিত এই মানুষটি। একজন মহৎ হৃদয়বান মায়ের সন্তান।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.