এ নৃশংসতার শেষ কোথায়
এ নৃশংসতার শেষ কোথায়

এ নৃশংসতার শেষ কোথায়

উম্মে ইয়াসমীন

পত্রিকার পাতা খুললেই ধর্ষণের খবর চোখে পড়ে। একদিন বগুড়ায় কোনো মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলো তো পরদিন নারায়ণগঞ্জে। তার পরদিন খোদ রাজধানীতে নির্মম নৃশংসতার শিকার হতে হচ্ছে ছোট্ট শিশুকে। এ অবস্থা কি চলতেই থাকবে? এর কি কোনো প্রতিকার নেই? এখন পর্যন্ত এমন ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির নেই। অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া না হলে, এ ধরনের অপরাধ কমবে না; বরং বাড়তেই থাকবে

 

বগুড়ায় কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের পর চুল কর্তন
(৩০ জুলাই দৈনিক নয়া দিগন্ত)
এক ছাত্রীকে কলেজে ভর্তির প্রলোভন দেখিয়ে বাসায় ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে বগুড়ার শ্রমিক লীগের নেতা তুফান সরকার। এ ঘটনার বিচার চাইতে গেলে তুফান সরকারের স্ত্রী ও এক মহিলা কাউন্সিলর মেয়ে ও মাকে নির্যাতন করে মাথার চুল কেটে দেয় এবং শহর ছেড়ে চলে যেতে বলে। মেয়েটির মা পুলিশে অভিযোগ করলে পুলিশ মা-মেয়ের অবস্থা খারাপ দেখে হাসপাতালে ভর্তি করে এবং তুফান গ্রেফতার হয়। বর্তমানে মা-মেয়ের ঠিকানা সেফ হোমে।

নির্মম নৃশংস
(১ আগস্ট দৈনিক প্রথম আলো)
ছোট্ট তানহা বাবা-মায়ের সাথে থাকত রাজধানীর বাড্ডার আদর্শনগরে ভাড়াবাসায়। তানহার লাশ পাওয়া যায় টয়লেটে। খবরে প্রকাশ, তানহাদের পাশের ঘরে থাকত শিপন নামে এক ব্যক্তি। শিপন খাবারের লোভ দেখিয়ে তানহাকে ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। শিশুটি চিৎকার করলে তাকে গলা টিপে হত্যা করে।

সখীপুরে সাত মাস আটকে রেখে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণ
(৪ আগস্ট নয়া দিগন্ত)
টাঙ্গাইলের সখীপুরের জঙ্গলের ভেতর পরিত্যক্ত একটি ঘরে এক তরুণীকে সাত মাস আটকে রেখে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে। এলাকাবাসী মুমূর্ষু অবস্থায় মেয়েটিকে উদ্ধার করেন। পুলিশ পরদিন তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ঘটনায় বাদি হয়ে মেয়েটির ভাই বাদল মিয়া নামে একজনকে আসামি করে মামলা করেন।

ওপরের ঘটনাগুলো এক সপ্তাহে সংবাদপত্রে প্রকাশিত আলোচিত ঘটনা।
শুধু এ কয়টিই নয়, একই সময় আরো প্রকাশিত হয়েছে ধর্ষণের অনেক ঘটনা। এর মধ্যে ধর্ষণের কারণে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ায় শরীয়তপুরে দশম শ্রেণীর এক ছাত্রীর আত্মহত্যার অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীতে আপন ফুফার হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে বাকপ্রতিবন্ধী এক অন্তঃসত্ত্বা তরুণী। রাজশাহীতে দুই ফেসবুক বন্ধুর হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা এক তরুণী।
এ ছাড়া গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে চলন্ত ট্রাকে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে এক ১৬ বছরের কিশোরী। এসবই সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর।
তাও আবার সব নয়। এ ছাড়া অনেক ছোট হেডলাইনে খবর থাকে ধর্ষণের। হেডলাইন ছোট হলেও ঘটনার নৃশংসতা কম নয় কোনো অংশে। গত কয়েক দিনে সংবাদপত্রে এত ধর্ষণের ঘটনা এসেছে যে, অভিভাবকেরা আতঙ্কিত- তার মেয়েটি রক্ষা পাবে তো এসব নরপশুর হাত থেকে! ছোট তানহার মতো একটি শিশুও রেহাই পায়নি যেখানে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য মতে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে নারী শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ১৬০টি, ফেব্রুয়ারি মাসে এক হাজার ১৭১টি, মার্চ মাসে এক হাজার ৪৭৭টি, এপ্রিল মাসে এক হাজার ৩৮৬টি, মে মাসে এক হাজার ৭১৯টি এবং জুন মাসে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে এক হাজার ৪২১টি।

অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় মাসে ৩৭১ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মেয়ে ও শিশু ২৬৩ জন। নারী ১০৫ জন, বাকি তিনজনের বয়স জানা যায়নি।

ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে ৯ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। ৩৬ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২৬৩ জন শিশুর মধ্যে আটজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ৫৩ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। দুই শিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে। এই সময়ে আরো ৪৮ জন নারী ও শিশুকে ধর্ষণে চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

এ পরিসংখ্যান আমাদের আতঙ্কিত করে। এ পরিসংখ্যান ভয়াবহ। তবে বাস্তবতা হয়তো আরো ভয়াবহ। কারণ সব ঘটনা কখনোই পরিসংখ্যানে আসে না। নির্যাতনের শিকার অনেক পরিবারই এ জাতীয় ঘটনা চেপে যায়। আর যারা বিচার চায়, তারাও তো বিচার পায় না অনেক ক্ষেত্রে। কারণ এ জাতীয় ঘটনা যারা ঘটায় তারা সমাজে প্রভাবশালী। অনেক ক্ষেত্রেই এরা সরকারি দলের ছত্রছায়ায় স্থান পায়। তাই দোষীরা ধরা পড়লেও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না।

এ ঘটনাগুলো বলছে- মেয়েরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তায়, যানবাহনে কোথাও নিরাপদ নয়। তাহলে উপায়। মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমাদের দেশে কড়া আইন আছে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ কি আছে? আছে কি সমাজের সচেতনতা। আছে কি পরিবারগুলোতে নৈতিক শিক্ষা। আমাদের দেশে পরিবারে মেয়ে বিপদে না পড়ার জন্য যত উপদেশ দেয়া হয়, ছেলেসন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেয়ার কি ততটা চেষ্টা করা হয়। আমি বলব, অনেক ক্ষেত্রেই সেটা করা হয় না। আমাদের উচিত, ছেলেদের ছোটবেলা থেকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা। কোনটা ভালো কোনটা মন্দ সে পার্থক্য বুঝানো উচিত। ছোট বেলা থেকে মেয়েদের সম্মান করতে শেখানো উচিত।

তবে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে আইনের শাসন। প্রশাসনকে আরো কঠোর হতে হবে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে। এসব নরপশুদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হতে হবে। কোনো একজন অপরাধীও যেন আইনের হাত থেকে বাঁচতে না পারে। আর গোটা সমাজকে হতে হবে সচেতন। শুধু আমার কন্যানয় সমাজের সব মেয়েই যেন নিরাপদে থাকতে পারে, এ জন্য প্রতিটি অভিভাবককে সজাগ থাকতে হবে। তাহলেই হয়তো সমাধান হতে পারে এ সমস্যার। এখনি যদি মেয়েদের নিরাপত্তার যথাযথ ব্যবস্থা আমরা নিতে না পারি, তাহলে এ সমাজে খারাপ মানুষের হাত থেকে কেউই রেহাই পাবে না।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.