ঐতিহাসিক চাঁনমুইল্ল্যা গাঙ
ঐতিহাসিক চাঁনমুইল্ল্যা গাঙ

ঘুরে আসুন চাঁনমুইল্ল্যা গাঙ

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

চাঁনমুইল্ল্যা গাঙ। স্মৃতির ক্যানভাসে আঁকা যেন এক টুকরো জীবন্ত ছবি। ইতিহাস বলে যুগ যুগ ধরে মানুষের মুখে মুখে ফেরা লোকজ বাংলা পুরাণ-আখ্যান বেহুলা-লখিন্দরে বর্ণিত চরিত্র চাঁন সওদাগরের নামানুসারে গাঙটির নামকরণ করা হয়েছে। সওদাগরের জাহাজ একসময়ে এই অঞ্চলের প্রমত্তা ও খরস্রোতা সুবিশাল খিরি নদী অববাহিকায় ভেড়ে বলে কথিত আছে। খিরি নদীর একটা অংশের নাম চাঁনমুইল্ল্যা গাঙ। যা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। শুধু তা-ই নয়, খিরি নদীর পাড়ের ২০০ বছরের পুরনো প্রকাণ্ড তেঁতুলগাছটি আজো নীরবে দাঁড়িয়ে আছে মহাকালের সাক্ষী হয়ে।

ইতিহাস ও ঐতিহ্যে ভাস্বর চাঁনমুইল্ল্যা গাঙ সুষ্ঠু ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং উপযুক্ত প্রচারণা না থাকার কারণে সেভাবে পরিচিত নয়। যদিও বর্তমানে সরকার গাঙটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে প্রকল্প অনুমোদনসহ ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। সর্পিলাকৃতি নদীটির নজরকাড়া সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক নৈসর্গিকতা যেকোনো ভ্রমণপিপাসুর মন আকৃষ্ট না করে পারে না।

একসময় কত পণ্য-মালবাহী জাহাজ ও রঙ-বেরঙের নাও, বজরা, পানসি, ভেলা কিংবা ডিঙি ভাসিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যাতায়াত করত। গাঙটির নাব্যতা ও আগের মতো খরস্রোতা না থাকায় স্বাভাবিক সৌন্দর্যে কিছুটা ভাটা পড়েছে। বর্ষায় চিত্র আবার ভিন্ন। দু’কূল ছাপিয়ে গাঙের উপকূলে দিগন্তবিস্তৃত ফসলের মাঠকে প্লাবিত করে। অবারিত রূপসৌন্দর্যের মধ্য দিয়ে সাপের মতো এঁকেবেঁকে বয়ে যাওয়া গাঙের চিত্তাকর্ষক সুষমা প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে দোলা দিয়ে যায়।

হঠাৎ একদিন আমার দুই বন্ধু এসে বলল, চাঁনমুইল্ল্যা গাঙে নৌকা ভাসাবে। ব্যস, কয়েক বন্ধু মিলে একদিন নৌকা ভাসিয়ে দিলাম প্রিয় গাঙের বুকে। বন্ধুদের দু-একজন উচ্চস্বরে গান গাইতে লাগল। আমরা আরো সামনের দিকে এগোতে লাগলাম।

হঠাৎ পাওয়া এক চিলতে আনন্দ নিস্তরঙ্গ কর্মময় যাপিত জীবনকে মুহূর্তে প্রশমিত করে দিলো। বিমূর্ত প্রকৃতির স্নিগ্ধতায় হারিয়ে যেতে লাগলাম। বিস্তীর্ণ ফসলের সমারোহ ও সারি সারি গাছগাছালির বিস্ময়কর বাংলার রূপসৌন্দর্য যেন নতুন করে দৃষ্টি ধরা পড়ল। মনের অজান্তে কখন যেন গুন গুন করে গেয়ে উঠি, ‘আমি বাংলার গান গাই’।

গ্রাম্য ছেলেদের নদীতে সাঁতার কাটা, জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য ছিল অপূর্ব। গাঙের উপচে পড়া জলতরঙ্গ পাড়ি দিয়ে দুলতে দুলতে ছোট্ট নৌকাখানা আরো সামনের দিকে এগোতে থাকে। কেউ কেউ এগিয়ে এলো আমাদের সাহায্য করতে। সহজ-সরল মানুষগুলোর আতিথেয়তা, সৌজন্যবোধ ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন আমাদের মুগ্ধ করে দিল। নাগরিক কোলাহলে বেড়ে ওঠা যান্ত্রিক মানুষগুলোর সাথে গ্রামীণ পটভূমিতে বেড়ে ওঠা এ মানুষগুলোর আকাশপাতাল পার্থক্য।

গাঙের নৈসর্গিক ও দৃষ্টিনন্দন রূপে আমরা মুগ্ধ হয়ে রইলাম। সবুজ শ্যামলের দিগন্ত প্রসারিত প্রকৃতিকে পেছনে ফেলে আমরা যখন ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন পশ্চিমাকাশে রক্তলাভ সূর্যটাও নিভু নিভু করছে টুপ করে অস্তমিত হওয়ার জন্য। আর পেছনে বারবার হাতছানি দিয়ে ডাকছে অবারিত সৌন্দর্যের, হারিয়ে যাওয়া খিরি নদীর বুকচিরে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক চাঁনমুইল্ল্যা গাঙ।

কোথায় থাকবেন
কুমিল্লা বিশ্বরোডের পাশে অবস্থিত আধুনিকতার সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধায় ঠাসা হোটেল নূরজাহান-ই হতে পারে ভ্রমণপিয়াসীদের রাত্রিযাপনের সবচেয়ে ভালো জায়গা। এ ছাড়া প্রত্যেকের বাজেট অনুযায়ী ছোট বড় মানসম্মত অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.