কোরবানি : ফাজায়েল ও মাসায়েল

মুফতি মো: আব্দুল্লাহ


সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, যিনি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানি করা বিধিবদ্ধ করেছেন; যেন তারা তাঁরই প্রদত্ত চতুষ্পদ জন্তু আল্লাহর নামে কোরবানি করতে পারে। তাঁর প্রিয় হাবিব সা:-এর প্রতি, তাঁর আল, আসহাব ও আহলে-বায়তের প্রতি অগণিত দরুদ ও সালাম, যাঁর মাধ্যমে এ কোরবানি করার মাহাত্ম্য, আদর্শ, বিধিবিধান, কল্যাণ, পন্থা-পদ্ধতি শেখার সৌভাগ্য আমরা পেয়েছি।
কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। ভোগের মানসিকতা পরিহার করে ত্যাগের মহিমায় অভ্যস্ত হওয়ার জন্য এটি একটি শিক্ষামূলক ইবাদত। স্বভাবগতভাবে আমরা সব সময় নিজের ভোগবিলাসের চিন্তায় মগ্ন থাকি। যে কারণে ত্যাগের অভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইসলামি শরিয়ত ‘কোরবানির বিধান বিধিবদ্ধ করেছে। পশু জবাইয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের সত্তার মাঝে লুকিয়ে থাকা পাশবিকতা, দোষত্রুটি, পশু-প্রবৃত্তি বিসর্জন দিতে শিখব; তাতেই আমাদের কোরবানি সার্থক হবে।
কোরবানির অর্থ : আরবি ‘কুরবান’ ও ‘কুরবাতুন’ শব্দের অর্থ হচ্ছে নৈকট্য লাভ করা, হোক তা পশু কোরবানির দ্বারা বা অন্য কোনোভাবে। একইভাবে ‘কুরবাতুন’ যেসব নেক আমল দ্বারা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা হয় যেমন ইবাদত-আনুগত্য, কল্যাণকাজ ইত্যাদি (আল-মুসতালিহাত ওয়াল-আলফায়ুল-ফিকহিয়্যা : খ-৩, পৃ-৮০, দারুল-ফাজিলাহ, কাহেরা, মিসর) বাংলা ভাষায় ‘কোরবানি’ মানে ত্যাগ, উৎসর্গ করা, পশু কোরবানির মাধ্যমে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তবে হাদিস, ফিকাহ-ফতোয়া ইত্যাদি গ্রন্থে ‘কোরবানি’র পরিবর্তে ‘উজহিয়্যা’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।
পারিভাষিক অর্থে, ‘‘আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনকল্পে কোরবানির দিনে যে পশু জবাই করা হয়, তারই নাম ‘কোরবানি’। একই কারণে কোরবানির দিনকে ‘ইয়াওমুল-আজহা’ ও কোরবানির ঈদকে ‘ঈদুল-আজহা’ বলা হয়।’’ (কাওয়াইদুল-ফিকহি : মুফতি আমিমুল ইহসান র. পৃ-১৮২)
ফাজায়েল : মহানবী (স) ইরশাদ করেন : ‘ঈদুল আজহার দিনগুলোতে মহান আল্লাহর কাছে আদমসন্তানদের সর্বাধিক প্রিয় আমল হচ্ছে, তাদের পশু কোরবানি করা। আর এ পশুর শিং, লোম ও খুর কিয়ামত দিবসে তার পক্ষে (সাক্ষী হিসেবে) উপস্থিত হবে। এ কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো। (তিরমিজি ও ইবনে মাজা)।
মাসায়েল : কোরবানি কার জন্য ওয়াজিব? যাদের ওপর জাকাত বা ফিতরা ওয়াজিব হয়ে থাকে তাদের ওপর কোরবানিও ওয়াজিব। তবে পার্থক্য শুধু এটুকু যে, জাকাতের ক্ষেত্রে নিসাব পরিমাণ সম্পদ সারা বছর হাতে থাকা শর্ত; আর ফেতরা ও কোরবানির ক্ষেত্রে যথাক্রমে ঈদুল ফিতরের দিন ও কোরবানির তিন দিন ওই পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই ফিতরা ও কোরবানি ওয়াজিব হয়ে থাকে।
কোরবানির সময় : ১০ জিলহজ ফজরের পর হতে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত, এ তিন দিন কোরবানি করার সময়। তবে প্রথম দিনে বেশি সাওয়াব পাওয়া যায়।
বিধি মোতাবেক যেখানে জুমা ও ঈদের সালাত জরুরি হয়ে থাকে সেখানে ঈদের সালাতের আগে কোরবানি করা বৈধ নয়। আর যেখানে বিধি মোতাবেক। ঈদের জামাত জরুরি হয় না সেখানে ফজরের পরই কোরবানি করা যায়।
নিজের কোরবানির পশু নিজ হাতে জবাই করা উত্তম; তবে মেয়ে লোক হলে অথবা অন্য কোনো কারণে অপর কাউকে দিয়ে জবাই করলেও বাধা নেই।
কোরবানির পশু জবাই করার সময় মুখে নিয়ত করা বা দোয়া উচ্চারণ করা জরুরি নয়; করলে ভালো। তাই কেবল অন্তরে নিয়ত রেখে মুখে সশব্দে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করলেই কোরবানি সহি-শুদ্ধ হয়ে যায়।
কোরবানি শুধু ব্যক্তির নিজের ওপর ওয়াজিব হয়। পুত্র-কন্যা বা স্ত্রীর কোরবানিযোগ্য সম্পদ থাকলে, তাদের কোরবানি পৃথকভাবে তাদের ওপর ওয়াজিব হবে। তাই পূর্ব-আলোচনা ব্যতীত এবং একে অপরকে দায়িত্ব বা অনুমতি প্রদান ব্যতীত কোরবানি করলে তা শুদ্ধ হবে না। সন্তান নাবালক হলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। সুতরাং নাবালকের সম্পদ থাকলেও তা থেকে কোরবানি করা বৈধ নয়। একইভাবে যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব সে নিজের ওয়াজিব পরিহার করে স্ত্রী, বাবা-মা বা অন্য কারো নামে কোরবানি করলে তা শুদ্ধ হবে না।
নিজের ওয়াজিব পালনের পাশাপাশি সামর্থ্য থাকলে, নফল হিসেবে মহানবী সা:-এর নামে, জীবিত বা মৃত পিতা-মাতা, দাদা-দাদী, শ্বশুর-শাশুড়ি, পীর-ওস্তাদ প্রমুখের পক্ষেও কোরবানি করা উত্তম।
কোরবানির পশু : ছাগল, খাসি, পাঁঠা, দুম্বা, ভেড়া নর-মাদি জন্তুতে শুধু একজন বা এক নামেই কোরবানি করা বৈধ হয়। আর গরু, মহিষ ও উটÑ এ তিন প্রকারের জন্তুতে এককভাবে অথবা সর্বোচ্চ সাতজনে মিলে কোরবানি দেয়া বৈধ হয়। তবে শরিকদের কারো অংশ এক-সপ্তমাংশের কম হলে কোরবানি শুদ্ধ হবে না।
কোরবানির গোশত : কোরবানির গোশত কোরবানিদাতা, ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ সবাই খেতে পারে। এমনকি অমুসলিমদেরও তা প্রদান বা আহার করা বৈধ। তবে জাকাত, ফিতরা ও কোরবানির চামড়া ইত্যাদি বাধ্যতামূলক দানগুলো অমুসলিমদের প্রদান বৈধ নয়। তা ছাড়া কোরবানির গোশতের ক্ষেত্রে সাধারণ বিধান হচ্ছে, তা তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজে, এক ভাগ স্বজনদের এবং এক ভাগ গরিবদের প্রদান ‘মুস্তাহাব’ তথা ভালো। কিন্তু প্রয়োজনে তার ব্যতিক্রম বা কমবেশি করলেও কোনো পাপ হবে না। অবশ্য যত বেশি পরিমাণ গরিবদের দেয়া হবে তত বেশি উত্তম ও অধিক সাওয়াব পাওয়া যাবে।
মান্নতের কোরবানি, অসিয়ত পালনের কোরবানি এবং যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব ছিল কিন্তু বিশেষ কোনো কারণবশত কোরবানির সুনির্দিষ্ট তিন দিনে তা পালন করতে না পারায়, পরে তা কাজা করছেনÑ এ তিন প্রকার কোরবানির গোশত নিজে বা ধনী কাউকে দান বা আহার বৈধ নয়। তা কেবল গরিবদের মাঝেই বণ্টন করতে হবে।
কোরবানির চামড়া : কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রয়ান্তে তা কেবল ফকির-মিসকিনের হক হয়ে যায়। যে কারণে চামড়ার মূল্য একমাত্র তাদেরকেই দেয়া যাবে যারা বিধি মোতাবেক জাকাত, ফিতরা গ্রহণ করতে পারে। কোনো ধনী ব্যক্তিকে যেমনিভাবে জাকাত, ফিতরা দেয়া যায় না; কোরবানির চামড়াও দেয়া যায় না। একইভাবে তা ব্যাপক জনকল্যাণমূলক কোনো কাজে বা প্রতিষ্ঠানেও প্রদান করা জায়েজ নয়। যেমনÑ মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানা, হাসপাতাল বা কোনো সমিতি, সংস্থাকে।
কোরবানির নিয়ম : কোরবানি করার নিয়ম হচ্ছে, জন্তুটিকে কিবলামুখী শায়িত করে যথাসাধ্য অধিক ধারালো চুরি, চাকু দ্বারা জবাই করবে। ‘ইন্নি ওয়াজ্জাহতু...’ আরবি দোয়াটি পাঠান্তে, কার কার বা কয়জনের পক্ষে কোরবানি হচ্ছে তা আগে জেনে নিয়ে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে জবাই করবেন।
মহান আল্লাহ আমাদের জেনে-শুনে, নিষ্ঠাপূর্ণ ও সহিভাবে কোরবানি করার তাওফিক দিন। আমিন!
(তথ্যসূত্র : আল-বাহরুর রায়িক : খ-৯ জাকারিয়া বুক ডিপো, দেওবন্দ, ভারত; আলমগিরি; ফতোয়া শামি : খ-৯, জাকারিয়া বুক ডিপো দেওবন্দ, ভারত ইত্যাদি।)
লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.