হজ : আধ্যাত্মিক চেতনার সম্মিলন

ডক্টর শাহ মুহাম্মাদ আবদুর রাহীম

হজ ইসলামি জীবনব্যবস্থার অন্যতম বুনিয়াদি ইবাদত। এর শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক ইবাদতের অনন্য সমন্বয়। হজের ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব অপরিসীম।
হজ শব্দের শাব্দিক অর্থ কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানের উদ্দেশ্যে সঙ্কল্প করা, ইচ্ছা করা, তথা জিয়ারত বা দর্শনের সঙ্কল্প করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় হজ হচ্ছেÑ নির্দিষ্ট দিবসগুলো পবিত্র কাবা শরিফ এবং তার সন্নিহিত কয়েকটি পবিত্র স্থানে আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশ মোতাবেক অবস্থান, জিয়ারত, তাওয়াফ ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা নির্দিষ্ট স্থানে, নির্দিষ্ট সময়ে আর নির্ধারিত ক্রম অনুসারে পালন করাকে হজ বলে। বিত্তশালী ও সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর জীবনে একবার হজ করা ফরজ। অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী জিলহজ চান্দ্রমাসের ৮ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়ে মক্কার বায়তুল্লাহ বা কাবা শরিফ ও সন্নিহিত কয়েক স্থানে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল স:-এর নির্দেশ অনুযায়ী জিয়ারত, তাওয়াফ, সায়ী ও অবস্থান করা এবং নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানাদি পালন করার নাম হজ।
সর্বপ্রথম হজরত ইবরাহিম আ: কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে আল্লাহর নির্দেশিত নিয়মে হজ প্রবর্তন করেন। মুসলিম উম্মাহর ওপর নবম হিজরি সালে হজ ফরজ হয়। শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারী নির্বিশেষে প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জীবনে একবার হজব্রত পালন করা ফরজ। হজের ফরজিয়াত কুরআন, হাদিস ও ইজমার দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত।
হজ ফরজ হওয়ার শর্ত হচ্ছে
১। মুসলিম হওয়া, ২। সুস্থ মস্তিষ্ক হওয়া, ৩। প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া, ৪। স্বাধীন হওয়া, সুস্থ হওয়া, ৫। যাতায়াত ও মক্কায় অবস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ থাকা, ৬। পথ নিরাপদ থাকা, ৭। ফিরে আসা পর্যন্ত পরিবার-পরিজনের জন্য প্রয়োজনীয় খরচের ব্যবস্থা থাকা, ৮। মহিলাদের জন্য স্বামী অথবা এমন কোনো আত্মীয়-সহযাত্রী হওয়া, যার সাথে বিয়ে হারাম। এরূপ অবস্থায় জীবনে একবার হজ পালন করা ফরজ।
হজের উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য
সালাত, জাকাত ও সাওমের পরে ইসলামের বুনিয়াদি ইবাদতের চতুর্থ বিষয় হলো হজ। এর মধ্যে সালাত ও সাওম সর্বজনীন। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবার ওপর ফরজ। কিন্তু জাকাত ও হজ কেবল ধনীদের জন্য। জাকাত প্রতি বছর একবার আর হজ জিন্দেগিতে একবার ফরজ।
হজ প্রকৃতপক্ষে তৌহিদের বাস্তব প্রশিক্ষণ ও বাস্তব মহড়া। আল্লাহর জিকিরের একটি বিজ্ঞানসম্মত কর্মসূচি। আল্লাহর বিভিন্ন আয়াত ও নিদর্শন হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে তাঁকে প্রাণভরে ডাকার, তাঁর ডাকে সাড়া দেয়ার এ এক অতি উত্তম ব্যবস্থা। এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও প্রভুত্ব মেনে নিয়ে তাঁর বান্দাদের সাথে, ধনী-গরিব নির্বিশেষে সাদা-কালো, আরব-আজম একাকার হওয়ার, একাত্মতা ঘোষণা করার এর চেয়ে উত্তম ব্যবস্থা আর হতে পারে না।
এর মাধ্যমে মাল খরচ করার এবং কষ্ট সহ্য করার বাস্তব ট্রেনিং হয়। হজ সাধারণত ধনী লোকেরাই করেন। তাদের সম্পদ থাকার কারণে তারা নিজ নিজ দেশের মানুষের মধ্যে সামাজিকভাবে মোটামুটি প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারীও হয়ে থাকেন। এদের মধ্যকার সম্পদের বড়াই, বংশের গৌরব প্রভৃতি মনের রোগের এটা একটা সুচিকিৎসার ব্যবস্থা। এ যুগের শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তানায়ক সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী রহ: এ সম্পর্কে বলেছেন, ‘কাবা বায়তুল্লাহ যেন দুনিয়ার হৃদপিণ্ড। দেহের সকল অংশের রক্ত যেমন হৃৎপিণ্ডে এসে পরিশুদ্ধ হয়ে আবার সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি সারা দুনিয়ার মানুষ পৃথিবীরূপ দেহের রক্ত হিসেবে (কাবা) রূপ এই হৃৎপিণ্ডে এসে ভিড় জমায়। আর পরিশুদ্ধ হয়ে আবার বিশ্বরূপ দেহের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। সত্যি যদি হজের এ অন্তর্নিহিত তাৎপর্য উপলব্ধি করে দুনিয়ায় মুসলমান হজ পালন করতেন; তাহলে গোটা দুনিয়ায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও মানুষের বিশ্বভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে একটি সফল সমাজ বিপ্লব সংঘটিত হতে পারত।
‘একমাত্র আল্লাহর জন্য হজ ও ওমরা পরিপূর্ণভাবে আঞ্জাম দাও।’ (সূরা বাকারা ২ : ১৯৬)।
হজ একটি সার্বিক ইবাদত : ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ হজ একটি সার্বিক ইবাদত। হজ একাধারে দৈহিক, আর্থিক ও মানসিক ইবাদত। এ অনন্য ইবাদত দ্বারা নিষ্ঠা, তাকওয়া, নম্রতা, আনুগত্য, আল্লাহপ্রাণতা, প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা শুদ্ধি, ত্যাগ, কোরবানি, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর নৈকট্য ও সান্নিধ্য প্রভৃতির প্রেরণা ও ভাবাবেগ পৃথকভাবে বিকাশ লাভ করে।
আল্লাহর নির্দেশ পালন : মহান আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক সক্ষম ও সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর হজ ফরজ করে দিয়ে ঘোষণা করেন : ‘করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে কাবাগৃহে হজ করা প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তির ওপর ফরজ।’ (সূরা আলে ইমরান ৩:৯৭)। আর মুসলিমগণ হজ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর এ নির্দেশই পালন করে থাকেন। হজ পালন না করলে কঠিন গুনাহ হবে। হজ পালন না করার পরিণতির কথা বর্ণনা করে হজরত উমর রা: বলেনÑ
‘আমার ইচ্ছে হয় এসব শহরে লোক পাঠিয়ে খবর নিই, যারা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ পালন করছে না। তাদের ওপর জিজিয়া ধার্য করি। ওরা মুসলিম নয়। ওরা মুসলিম নয়।’ (মুনতাকি)।
আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন : হজ পালনের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। তাই বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একমাত্র বিশ্ব প্রভু আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রেজামন্দি হাসিলের প্রবল বাসনায় বিশ্ব মুসলিম আল্লাহর ঘর কাবার পানে ছুটে আসে এবং তাঁরই দরবারে হাজিরা দেয়।
ইসলামের ওপর টিকে থাকা : যার ওপর হজ ফরজ করা হয়েছে সে যদি বিনা কারণে হজ পালন না করে, তাহলে ধর্মচ্যুতি হওয়ার আশঙ্কা আছে। মহানবী সা: ঘোষণা করেন : ‘কোনো অবশ্যম্ভাবী ও প্রত্যক্ষ প্রতিবন্ধকতা, অত্যাচারী রাজা অথবা কোনো রোগের কারণ ব্যতীত যার হজে গমন করাতে বাধা না থাকে, সে যদি হজ না করে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে হয় ইহুদি হয়ে মরুক কিংবা খ্রিষ্টান হয়ে মরুক, তাতে আল্লাহর কিছুই যায় আসে না।’
পাপ মোচন : যে ব্যক্তি করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ পালন করে। আল্লাহ পাক তার যাবতীয় পাপ মাফ করে দেন। সে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়। নবী করিম সা: এ মর্মে বলেনÑ ‘পানি যেমন ময়লা-আবর্জনা ধুয়ে পরিচ্ছন্ন করে দেয়। হজও তদ্রƒপ গুনাহ দূর করে পবিত্র করে দেয়।’ (বুখারি)।
‘যে ব্যক্তি এ গৃহের নিকটে আসে এবং নির্লজ্জ কথা না বলে ও দুষ্কৃতি না করে তবে সে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে নিজ ঘরে ফিরে।’ (বুখারি, মুসলিম)।
দোজখের শাস্তি হতে পরিত্রাণ : হজ দোজখের আগুন হতে পরিত্রাণ দেয়। মহানবী সা: বলেনÑ ‘আল্লাহ যাকে হজ পালনের সামর্থ্য দিয়েছেন; যদি সে হজ না করে ওই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। তাহলে সে দোজখের যন্ত্রণাদায়ক আগুনে পতিত হবে।’ (মিশকাত)।
আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উপায় : হজ পালনকারী মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করতে পারে। ইহরাম, তাওয়াফ, তালবিয়াহ, নগ্নপদ, শূন্য মাথা, স্বল্প পরিচ্ছদ, প্রস্তর নিক্ষেপ, আরাফাতে অবস্থান, কোরবানি, মাথা মুণ্ডন প্রভৃতি আনুষ্ঠানিকতা এর আধ্যাত্মিকতার অপরূপ নিদর্শনের পরিচয় বহন করে। তাওহিদের লীলাভূমি, নবী-রাসূলদের পবিত্র ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত পৃথিবীর আদিনিবাস কাবার জিয়ারত হজ পালনকারীর হৃদয়মনকে আল্লাহর প্রেমে গভীরভাবে আকৃষ্ট, উদ্বেলিত, আন্দোলিত, হিল্লোলিত ও বিমোহিত করে তোলে। বান্দা এখানে তাঁর প্রভুর নিবিড় সান্নিধ্য প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করে। সুতরাং মানবজীবনে হজ একটি বহু কাক্সিক্ষত বিষয়।
অফুরন্ত সাওয়াব ও জান্নাত লাভ : হজ পালনে অফুরন্ত সাওয়াব হাসিল হয়। রাসূলুল্লাহ সা: হজের ফজিলত বর্ণনা করে বলেন, আল্লাহ তায়ালা আরাফার দিবসে ফেরেশতাগণকে ডেকে বলেনÑ ‘হে ফেরেশতারা! তোমরা দেখো, আমার বান্দাগণ কী প্রকারে বহু দূর-দূরান্ত থেকে আজ আরাফার মাঠে ধুলোবালুর সাথে মিলিত হচ্ছে। তোমরা সাক্ষী থাকো, যারা আমার ঘর (কাবা) জিয়ারত করতে এসে এত কষ্ট স্বীকার করছে, অবশ্যই আমি তাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিলাম। তখন শয়তান নিজ হাত কপালে মারতে মারতে শতবার দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকে।’ হজ আদায়ের জন্য বের হয়ে মৃত্যুবরণ করলেও অশেষ সাওয়াব হাসিল করা যায়। এ মর্মে মহানবী সা: বলেনÑ ‘যে ব্যক্তি হজ, ওমরা অথবা জিহাদের জন্য বের হয়ে পথের মধ্যে মারা যায়, আল্লাহ তার জন্য গাজী, হাজী ও ইহরামকারীর সাওয়াব লিখে দেন।’ (মিশকাত)।
এককেন্দ্রমুখিতা : হজ মুসলমানদের এক ও অভিন্ন কেন্দ্রের অভিমুখী করে গড়ে তোলে। ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠী, গোত্র, ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা, বর্ণ, ভাষা ইত্যাদির ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্বের সব বিশ্বাসী মানবতা একই আল্লাহর ঘর কাবায় এসে একাকার হয়ে এক অখণ্ড উম্মাহর অপরূপ নিদর্শন স্থাপন করে। আল্লাহর জমিনে পবিত্র কাবা স্থাপনের যে উদ্দেশ্য আল্লাহ ঘোষণা করেছেন, সে উদ্দেশ্যের সাথে সবাই নিজেদের একাত্ম করে নেয়।
আল্লাহর খলিফার বৈশিষ্ট্য অর্জন : মানুষ এ ধরণীতে আল্লাহর বান্দা ও তাঁরই খলিফা। স্বেচ্ছাচারী কিংবা নিরঙ্কুশ স্বাধীন সার্বভৌম হয়ে জীবন যাপন করার অধিকার কারো নেই। আল্লাহ আইনের কাছে শর্তহীন আত্মসমর্পণ এবং আল্লাহর আইনের প্রতিনিধি হওয়ার উপযোগী বৈশিষ্ট্য অর্জনের এক দুর্লভ সুযোগ করে দেয় হজের অনুষ্ঠানমালা।
মুসলিম হিসেবে, আল্লাহর বান্দা হিসেবে ও আল্লাহর খলিফা হিসেবে হাজীদের মধ্যে হজের অনুষ্ঠানমালা তীব্র দায়িত্বানুভূতির উন্মেষ ঘটায়।
নতুন চেতনাশক্তির উন্মেষ : কাবা বিশ্বমানবতার হেদায়েতের কেন্দ্রবিন্দু। পৃথিবীতে এর অবস্থান মানবদেহে হৃৎপিণ্ডের মতোই। হৃৎপিণ্ড মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থেকে রক্ত চুষে পরিশোধিত করে আবার দেহের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়। তখনই মানবদেহ সুস্থ ও সবল হয়ে ওঠে; হয়ে ওঠে বলীয়ান। ঠিক একইভাবে প্রতি বছর কাবার আদর্শ বিশ্বের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আল্লাহর বান্দাদের একই কেন্দ্রবিন্দুতে সমবেত করে। তাদের মনে সে ঈমানের দ্বীপশিখা জ্বালায়, যে ঈমানের মশাল জ্বালিয়ে মানবতাকে চলার পথের সন্ধান দিয়ে গেছেন যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় নবী-রাসূলগণ। দেহে হৃৎপিণ্ডের পরিশোধিত রক্তপ্রবাহের মতো তারা নিজ নিজ এলাকা, দেশ ও জনপদে ফেরে ঈমানের নতুন প্রেরণা আর সংগ্রামের নবতর চেতনা নিয়ে। এভাবে প্রতি বছর গোটা দুনিয়ায় মুসলিম জনপদ এক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামী চেতনায় জেগে ওঠে।
লেখক : গবেষক

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.