বিশাল সাইজের একটি কোরবানির গরু
বিশাল সাইজের একটি কোরবানির গরু

একটি বিশাল গরু এবং মা-মেয়ে ও বাবার গল্প

জোবায়ের রাজু

বাবা সন্ধ্যার পরপরই বিশাল সাইজের একটি কোরবানির গরু নিয়ে বাসায় ফিরলেন। গরু দেখে তো আমার চোখ ছানাবড়া। এত বড় গরু আর কোনো ঈদে আমাদের কেনা হয়নি। অন্যান্য বারের চেয়ে এবারের গরুটা সাইজে বেশ বড় দেখে আমাদের পরিবারে যতটা আনন্দ বয়ে যাওয়ার কথা, তার কোনোটাই হচ্ছে না। কাল ঈদ। মা ব্যাকুল হয়ে নিরিবিলি কাঁদছেন। রোজী আপা নিরস মুখে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত বিষণ্ন চোখে ঈদের চাঁদ দেখছে। বড় দা কিছুক্ষণ পর বন্ধুদের সাথে আড্ডা শেষে বাসায় ফিরবে। বাবা গরু কিনে এনে উঠোনের পাশে কদম তলায় বেঁধে রাখলেন। এবারের কোরবানির গরু নিয়ে ঘরের কারোরই তেমন সাড়া নেই। বাড়িময় এক নীরব শোক বইছে।

এক সপ্তাহ আগে আমাদের বাড়িটা একটা শোকের কারখানা হয়ে গেছে। আমাদের সবার প্রিয় ছোটবোন শ্যামা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। যাওয়ার সময় রোজী আপার ঘরে ছোট্ট একটা কাগজে তার বাড়ি পালানোর গল্প লিখে গেছে।

আমরা কেউ জানতাম না, দুই বছর ধরে রাফি নামে একটি ছেলের সাথে শ্যামার সম্পর্ক আছে। অথচ শ্যামা চিরকাল ছিল প্রেম-ভালোবাসার বিপরীতে। কিন্তু রাফি নামে একটি ছেলের সাথে যে সে লোকচক্ষুর অন্তরালে একটি শাশ্বত সম্পর্ক বহাল রাখবে, আমরা কেউ ধারণাই করতে পারিনি।
অবশেষে গত সপ্তাহে হঠাৎ উধাও হয়ে গেল শ্যামা। তাকে সারা বাড়ি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে রোজী আপার ঘর থেকে উদ্ধার করা হয় শ্যামার হাতের লেখা বেদনার চিঠি। প্রতিটি লাইনে শ্যামা অভিব্যক্তি প্রকাশ করে গেছে রাফিকে ঘিরে। শ্যামার চিঠি আমাদের হাতে আসার পর বদলে গেছে বাড়ির চেহারা। শোকে কাতর হয়ে উঠে আমাদের নুরজাহান মঞ্জিল।

এই আকস্মিক ঘটনায় বাবা খুব সহজে নিজেকে বদলে ফেললেন। তিনি দাবি করলেন, শ্যামা নামে তার কোনো মেয়ে ছিল না। যে মেয়ে বংশের মানমর্যাদা নষ্ট করে, তাকে তিনি কখনো ক্ষমা করবেন না। বাবার সিদ্ধান্তে প্রতিবাদ করার সাহস আমরা পাইনি। তাই হয়তো মা নীরবে চোখের জল মুছে গেছেন। বাকরুব্ধ হয়ে গেল রোজী আপা আর বড় দা।

আজ ঈদ। বড় দা, আমি আর বাবা ঈদগাহ থেকে নামাজ শেষে বাসায় ফিরলাম। গরু জবাইয়ের নানা সরঞ্জাম নিয়ে আমরা হুজুরের অপেক্ষায় আছি। একটু পর ছুরি হাতে হুজুর আসবেন পশু কোরবানি করতে। বাবা একটি খাতায় লিখছেন কার কার নামে কোরবানি দেয়া হবে। আমাদের ঘরের প্রত্যেক সদস্যের নামের পাশাপাশি আমার জান্নাতবাসী দাদা-দাদীর নামও দেখা যাচ্ছে। বাবা শ্যামার নাম লিখেননি। অথচ প্রতিবার কোরবানির নাম লেখার তালিকায় সবার আগে দেখা যেত শ্যামার নাম। এবার শ্যামার নাম না দেখে এই প্রথম আমার বুক হু হু করে উঠল। শ্যামাকে কি বাবা সত্যিই পর করে দিচ্ছেন? আমার বুকের অতল এক গহীন ব্যথায় চিনচিন করছে।

ঘর থেকে ভেসে এল বাবা-মা’র উঁচু গলা। মা কান্নারত কণ্ঠে বাবাকে কি যেন বলতেই বাবা হুঙ্কার ছেড়ে বললেন-‘না ওই মেয়ের নামে কোনো কোরবানি দেয়া হবে না, কখনো না...।’ আমি বুঝলাম আসল রহস্য। শ্যামার নামে কোরবানি দিতে মা বাবার কাছে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তাতে বাবার মন গললো না। বাবার মন এত শক্ত হয়ে গেল কিভাবে?

মস্তবড় এক ছুরি নিয়ে হুজুর এলেন। সাথে পাড়ার উৎসুক পিচ্চির দল। বাবার এগিয়ে দেয়া খাতা দেখে হুজুর যাদের নামে কোরবানি দিতে হবে, তাদের নামে দোয়া পড়ছেন। হায়! খাতায় শ্যামার নাম নেই।

কোরবানির জন্য গরুকে বেঁধে শোয়ানো হলো। ছুরি হাতে হুজুর প্রস্তুত। বাবাকে হঠাৎ অন্যরকম দেখাচ্ছে। কি যেন বলতে চাইছেন।

হঠাৎ বাবা হুজুরের দিকে ছুটে গেলেন। মিনমিন স্বরে বললেন- ‘হুজুর, আরেকটা নাম পড়েন। মোসাম্মত রাবেয়া আক্তার শ্যামা।’ বাবার চোখ ভিজে উঠল। পিতৃস্নেহের কাছে অভিমানের বরফ গলতে সময় লাগেনি। হুজুর মনে মনে শ্যামার নাম জপে কোরবানি করলেন।

আমি এক দৌড়ে গেলাম মা’র কাছে- ‘মা, বাবা শ্যামার নামে কোরবানি দিয়েছেন!’ আমি টের পাচ্ছি, এ কথা বলতে গিয়ে আমার গলা কাঁপছে। যেন গলা উপছে কান্না আসবে। আমার কান্না আসার আগেই মা শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন। বাইরে গরুর গলা ফাটানো গোঙ্গানির শব্দ। আমার কান্নার বেগ এত বাড়ছে কেন? শ্যামার জন্য? না আমি কাঁদব না। আজ ঈদ। ঈদের দিনে কান্নাকাটি ভালো না।
আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

 

যে কোরবানি শোকের

ইদ্রিস রিয়াদ

অফিস থেকে আসার পর শিমুকে জিজ্ঞেস করলাম, বড় ভাইয়েরা গরু কিনতে গেছে? শিমু আমার টাই খুলতে খুলতে বলল, না বড় ভাই, মেঝো ভাই তোমার জন্যই অপেক্ষা করছে। তুমি এলে এক সাথে যাবে।
আমি খুব তাড়াতাড়ি ফ্র্রেশ হয়ে সামান্য খেলাম। আমার বড় দুই ভাই প্রবাসে থাকেন। আমিই কেবল স্থানীয় পৌরসভা অফিসের সচিব। তাই ভাইয়েরা আমাকে নিয়েই যেকোনো কিছু করতে চায়। আমি এলাকায় আছি বলে জানাশোনা ভালো এটাই তাদের ধারণা।
আমি রুমের দরজা পেরুলাম। আবার ফিরে এসে শিমুকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার রাসু কই?
ও বড় ভাইয়ের কাছে আছে।
আচ্ছা ওকে।
আমি, বড় ভাই আর মেঝো ভাইয়ের উদ্দেশে পা বাড়ালাম ড্রইংরুমে।


বড় ভাইয়ের কোলে বসা রাসু। আমার কলিজার অবিচ্ছেদ্য অংশ আমার এই চার বছরের পিচ্চিটা। ও দুনিয়ায় আসার পর থেকেই যেন আমার জীবন মূলত শুরু হয়েছে। কি সুন্দর সুন্দর কথা বলে ইদানীং। অবশ্য শিমুও সুন্দর কথা বলে। ছোট শিশুরা মায়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকে বিশাল একটি জীবন। আমার সকাল আর বিকেলজুড়ে এখন সোনামণি রাসুর বসবাস।
বড় ভাই আমাকে দেখেই রওয়ানা হলেন, সাথে মেঝো ভাইও। বড় ভাইয়ের কোলে রাসু। আমি বড় ভাইকে বললাম, রাসু কোথায় যাচ্ছে?
হাটে।
না, না, কি বলেন বড় ভাই? ওখানে অনেক ঝামেলা। হাজার হাজার মানুষ।
আরে কিচ্ছু হবে না, ওকে আমি রাখব।
তবুও ভাইয়া।
আরে সকাল থেকে ও কাঁদছে, রেডি হয়ে আছে।


ভাইয়ার জোরাজুরিতে আর শিমুর হ্যাঁ সূচক ইশারা পেয়ে আমি আর কথা বললাম না। রাসু হাততালি দিচ্ছে অবিরত। লাল পাঞ্জাবি পড়া রাসুর মুখে চুমু এঁকে দিলাম। বড় ভাই আর রাসু এক রিকশায়, আমি আর মেঝো ভাই অন্য রিকশায় রওয়ানা হলাম। রাসু সে রিকশার পেছনের ফর্দা সরিয়ে মাঝে মাঝে আমাকে দেখে। হাত নাড়িয়ে ইশারা দেয়। আমি বাবা হওয়ার গৌরব অনুভব করি।
গরুর বাজারে গিয়ে বড় ভাই ভিড় দেখে খুব বেশি ভেতরে গেলেন না। রাসু আর উনি হাসিল কালেকশনের টেবিলের পাশে দাঁড়ালেন। ছেলেরা বড় ভাইকে একটা চেয়ার এনে দিলো। ওরা আমাকে চেনে। হাট ইজারা নিতে পৌরসভায় গিয়ে আমাকে চিনেছে। বড় ভাই আর রাসুকে সেখানে রেখে আমরা মূল বাজারে প্রবেশ করলাম। রাসু এত গরু দেখে আনন্দে আত্মহারা। ওকে একটা চুমু দিয়ে আমরা চললাম।


গরুর হাট বসেছে অনেকটা রাস্তার উপর। গাড়ি, মানুষ আর গরু-ছাগলে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ। হাজার হাজার মানুষের মাঝে আমরা গরু কেনার উদ্দেশ নিয়ে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছি। গরু পছন্দ হয় তো দামে হয় না। দাম কম হলে সেই গরু পছন্দ হয় না। একটা মাঝারি গোছের গরু পছন্দ করলেন মেঝো ভাই। গরু ব্যাপারী গরুটা হাঁটিয়ে দেখানোর জন্য দড়ি হাতে নিলেন। ঠিক তখনই বিকট শব্দে কেঁপে উঠল পুরো এলাকা। একটি নয়, পরপর তিনটি বিকট শব্দ। গরু-ছাগল আর হাজারো মানুষের দিগি¦দিক ছুটে চলা আর ধোঁয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ভয়াবহ পরিবেশ। মানুষের ভয়ার্ত আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী হচ্ছে। হাটের ইজারা না পেয়ে একটি পক্ষ বোমা হামলা করেছে। শত শত মানুষ আহত হয়েছে। রক্তাক্ত হয়েছে পিচঢালা পথ।


আমরা দুই ভাই এই মানুষ আর গরু-ছাগলের মিলিত ভয়াবহতা ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছি হাসিল টেবিলের দিকে। যেখানে আমার রাসু আর বড় ভাই বসা। মেঝো ভাই আমার হাত চেপে আছেন শক্ত করে। প্রবাসী ভাইটি নিজ দেশের মানুষের এই নির্মমতা দেখে হয়তো বাকরুদ্ধ। আমরা এগুচ্ছি রাস্তায় পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন পশু আর মানুষের শরীর ডিঙিয়ে। অবশেষে হাসিল টেবিলের কাছাকাছি পৌঁছলাম।
সেখানেও শত শত মানুষের ভিড়। সবাই ঘিরে কী যেন দেখছে। দর্শনার্থীদের অনেকেও আহত। রক্ত ঝরছে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে। আমরা ভিড় সরিয়ে উঁকি দিলাম। তাকিয়েই আমার মুখ থেকে অজান্তে বেরিয়ে আসা আর্তচিৎকার আকাশ-বাতাশ কাঁপিয়ে তুলল। রাসু...


আমার প্রতিটি শিরা-উপশিরায় রক্ত চলাচল যেন থেমে গেল। কলিজাটা যেন এখনই বেরিয়ে আসবে। আমার রাসুর ক্ষতবিক্ষত দেহ আমার বড় ভাইয়ের কোলে। রক্তে আমার রাসুর চেহারাটাও চেনা যাচ্ছে না। বোমার স্পিøন্টারগুলো আমার রাসুর শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিলো। আমার কান্নার শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছিল হাজারো মানুষের আহাজারিতে। আমি কী জবাব দেবো রাসুর জন্য অপেক্ষায় বসে থাকা শিমুকে? অমানুষদের বোমা কি মায়ের মমতা বোঝে?
রাসু আর নাইরে ভাই...


এই বলেই বসা থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন বড় ভাই। তার শরীরেও স্পিøন্টার প্রবেশ করেছে অনেক। বড় ভাইও হাসপাতালের পথে মারা গেলেন।
এখনো প্রতিবছর কোরবানি আসে। সেই জায়গায় হাটও বসে। যে জায়গায় ঈদের আগেই আমরা কোরবানি দিয়েছিলাম দুইজন প্রিয়জন। আমাদের বুকে চিনচিন ব্যথা বাড়ে। শিমুর চোখের জল বাঁধ মানে না। কান্নার মাতম উঠে আমাদের ঘরে। বড় ভাইয়ের ছোট ছেলেটাও বাবাকে খোঁজে, না পেয়ে কেঁদে ওঠে...
দাগনভূঁইয়া, ফেনী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.