কালো পলিথিন ও কোরবানির ঈদ

জীবনের বাঁকে বাঁকে
এস আর শানু খান

সেদিন বারে ছিল বোববার। সকালে অনলাইনেই দেখেছিলাম নয়া দিগন্তের অবকাশে আমার একটা লেখা ছাপা হয়েছে। লেখাটা দেখার জন্য বিকেলের দিকে স্টেশনের দিকে গেলাম। স্টেশনে সব সময় সব রকম মিলে। মাঝে মাঝে গত দিনের পেপারও দুই টাকা, পাঁচ টাকা দিয়ে কিনতাম আমি। পেপার কিনে একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে একটু পশ্চিমে এগিয়ে একটা বেঞ্চিতে বসলাম। আমার ঠিক হাত দুই সামনেই রেললাইন। পরপর তিনটার মতো লাইন। তার পরই হলো একটা বড় বস্তি। তারই সামনে অনেক শিশু ছেলেমেয়েরা খেলা করছিল। একদম জীর্ণশীর্ণ জামাকাপড় জড়ানো তাদের দেহ। কাপড় পরা থাকলেও শরীর বেশির ভাগ অংশই দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ ওদের একজন দৌড় দিয়ে একটা লোকের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। লোকটার হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ। সেটাতে কী আছে জানি না। লোকটার সাথে ওদের কথাবার্তা হচ্ছিল কিন্তু আমি একটু দূরে থাকার কারণে সেটা শুনতে পারছিলাম। তবে আকারে ইঙ্গিতে আর লোকটার পলিথিনের ব্যাগটা উঁচু করে ধরে রাখা দেখে বুঝতে পেরেছিলাম যে, হয়তো কিছু খেতে চাচ্ছে। লোকটা একটু গতিতেই হাঁটা শুরু করলেন। শিশুরাও পিছু নিলো। নানা রকম বকাঝকা করছিল মধ্য বয়সী সেই লোকটা। অবশেষে কিছু পথ পেছন পেছন গিয়ে মলিন মুখে ফিরে এলো শিশুরা। এর মধ্যে একটা শিশু খালি গায়ে। একটা ছেঁড়া প্যান্ট পরা। অসহায়ের মতো তাকিয়ে দাঁত দিয়ে হাতের নখ কামড়াচ্ছিল। দেখে খুব খারাপ লাগল। আমার পকেটের আবহাওয়া তখন ভালোই গরম ছিল। আর সপ্তাহখানেক পরেই কোরবানির ঈদ। বাড়ি থেকে আব্বু টাকা পাঠিয়েছে ঈদের জামাকাপড় কেনার জন্য। ছোট ভাই অনু আর আমার জামা, প্যান্ট কিনতে হবে। আমি চায়ের বিল মিটিয়ে রেললাইন পার হয়ে ওই পাশে গেলাম। শিশুদের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম ওই লোকটার কাছে কী চেয়েছিলে, যাকে উদ্দেশ করে কথাটা বলেছিলাম সে কিছু বলার আগেই ওদের মধ্যে থেকে বলে বসলÑ কেন মামা আপনি কি সেটা আমাদের কিনে দেবেন। আর একজন বলে উঠল তাহলে কিন্তু সবাইকেই দিতে হবে মামা। আমি বললাম আচ্ছা দিব। একজন আর একজনকে ইশারা মেরে বলল, ওই সনি আর তুরবিনকে ডেকে নিয়ে আয়। পরে বস্তি থেকে আরো দু’জন এলো। ওরাও ছোট। বুঝলাম ওরা একসাথে বেড়ায় হয়তো। এরই মধ্যে একজন এসে আমার হাত ধরে জোড়াজুুড়ি করছিল। শিশুরা ঠিক এমনটাই একটু স্নেহ পেলেই, একটু আদরের পরশ পেলেই গোলাপের পাপড়ির মতো মেলিয়ে যায়। জানতে চাইলাম কী চাই। বলল, সবাইকে একটা করে পলিথিনের কালো ব্যাগ কিনে দিতে হবে। আমি আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলাম পলিথিনের ব্যাগ দিয়ে কী করবে? তাও আবার কালো ব্যাগ। ওরা বলতেই চাইল না। অবশেষে আমি কিনে দিতে গেলাম। এবং কিনেও দিলাম। কেনার সময় হিসাব করলাম ওরা সংখ্যায় ছিল ছয়জন। কিন্তু পলিথিন কিনতে হলো দশটার মতো। কেউ বলে তার ছোট ভাইয়ের জন্য একটা। কেউবা বলে তার চাচাতো বোনের জন্য।
অবশেষে সবাইকে একটা কলা আর একটা পাউরুটি কিনে দিয়ে এক জায়গায় বসে শুনেই ফেললাম ওদের পলিথিনের ব্যাগের উদ্দেশ্যটা। ওরা সবাই কোরবানির দিন এই পলিথিন নিয়ে সারা শহর টইটই করে বেড়াবে। এক টুকরা গোশত পাওয়ার আশায়। সাদা পলিথিন হলে মানুষ দেখে আর নানা রকম কথা বলবে সেই ভয়ে কালো পলিথিন ওদের পছন্দ। সেদিন ওদের চোখে মুখে কোরবানির যে আমেজটা আমি খুঁজে পেয়েছিলাম সেটা ছিল অবর্ণনীয়। বড্ড ইচ্ছা হচ্ছিল সেদিন যদি কোনো দিন আল্লাহ টাকার মালিক করেন আর কোরবানি করার মতো তৌফিক দান করেন তাহলে ওই বস্তিতে গিয়ে কোরবানি করব। ওদের নিয়ে কাটাব সে কোরবানির ঈদ।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.