যে কোরবানি শোকের

ইদ্রিস রিয়াদ

অফিস থেকে আসার পর শিমুকে জিজ্ঞেস করলাম, বড় ভাইয়েরা গরু কিনতে গেছে? শিমু আমার টাই খুলতে খুলতে বলল, না বড় ভাই, মেঝো ভাই তোমার জন্যই অপো করছে। তুমি এলে এক সাথে যাবে।
আমি খুব তাড়াতাড়ি ফ্র্রেশ হয়ে সামান্য খেলাম। আমার বড় দুই ভাই প্রবাসে থাকেন। আমিই কেবল স্থানীয় পৌরসভা অফিসের সচিব। তাই ভাইয়েরা আমাকে নিয়েই যেকোনো কিছু করতে চায়। আমি এলাকায় আছি বলে জানাশোনা ভালো এটাই তাদের ধারণা।
আমি রুমের দরজা পেরুলাম। আবার ফিরে এসে শিমুকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার রাসু কই?
ও বড় ভাইয়ের কাছে আছে।
আচ্ছা ওকে।
আমি, বড় ভাই আর মেজো ভাইয়ের উদ্দেশে পা বাড়ালাম ড্রইংরুমে।
বড় ভাইয়ের কোলে বসা রাসু। আমার কলিজার অবিচ্ছেদ্য অংশ আমার এই চার বছরের পিচ্চিটা। ও দুনিয়ায় আসার পর থেকেই যেন আমার জীবন মূলত শুরু হয়েছে। কী সুন্দর সুন্দর কথা বলে ইদানীং। অবশ্য শিমুও সুন্দর কথা বলে। ছোট শিশুরা মায়ের প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকে বিশাল একটি জীবন। আমার সকাল আর বিকেলজুড়ে এখন সোনামণি রাসুর বসবাস।
বড় ভাই আমাকে দেখেই রওনা হলেন, সাথে মেঝো ভাইও। বড় ভাইয়ের কোলে রাসু। আমি বড় ভাইকে বললাম, রাসু কোথায় যাচ্ছে?
হাটে।
না না, কী বলেন বড় ভাই? ওখানে অনেক ঝামেলা। হাজার হাজার মানুষ।
আরে কিচ্ছু হবে না, ওকে আমি রাখব।
তবুও ভাইয়া।
আরে সকাল থেকে ও কাঁদছে, রেডি হয়ে আছে।
ভাইয়ার জোরাজুরিতে আর শিমুর হ্যাঁ সূচক ইশারা পেয়ে আমি আর কথা বললাম না। রাসু হাততালি দিচ্ছে অবিরত। লাল পাঞ্জাবি পরা রাসুর মুখে চুমু এঁকে দিলাম। বড় ভাই আর রাসু এক রিকশায়, আমি আর মেজো ভাই অন্য রিকশায় রওনা হলাম। রাসু সে রিকশার পেছনের ফর্দা সরিয়ে মাঝে মধ্যে আমাকে দেখে। হাত নাড়িয়ে ইশারা দেয়। আমি বাবা হওয়ার গৌরব অনুভব করি।
গরুর বাজারে গিয়ে বড় ভাই ভিড় দেখে খুব বেশি ভেতরে গেলেন না। রাসু আর উনি হাসিল কালেকশনের টেবিলের পাশে দাঁড়ালেন। ছেলেরা বড় ভাইকে একটা চেয়ার এনে দিলো। ওরা আমাকে চেনে। হাট ইজারা নিতে পৌরসভায় গিয়ে আমাকে চিনেছে। বড় ভাই আর রাসুকে সেখানে রেখে আমরা মূল বাজারে প্রবেশ করলাম। রাসু এত গরু দেখে আনন্দে আত্মহারা। ওকে একটা চুমু দিয়ে আমরা চললাম।
গরুর হাট বসেছে অনেকটা রাস্তার ওপর। গাড়ি, মানুষ আর গরু-ছাগলে এক বিভীষিকাময় পরিবেশ। হাজার হাজার মানুষের মাঝে আমরা গরু কেনার উদ্দেশ নিয়ে এদিক-সেদিক তাকাচ্ছি। গরু পছন্দ হয় তো দামে হয় না। দাম কম হলে সেই গরু পছন্দ হয় না। একটা মাঝারি গোছের গরু পছন্দ করলেন মেঝো ভাই। গরু ব্যাপারী গরুটা হাঁটিয়ে দেখানোর জন্য দড়ি হাতে নিলেন। ঠিক তখনই বিকট শব্দে কেঁপে উঠল পুরো এলাকা। একটি নয়, পরপর তিনটি বিকট শব্দ। গরু-ছাগল আর হাজারো মানুষের দিগি¦দিক ছুটে চলা আর ধোঁয়ায় অন্ধকারাচ্ছন্ন এক ভয়াবহ পরিবেশ। মানুষের ভয়ার্ত আর্তনাদ আকাশ-বাতাস ভারী হচ্ছে। হাটের ইজারা না পেয়ে একটি প বোমা হামলা করেছে। শত শত মানুষ আহত হয়েছে। রক্তাক্ত হয়েছে পিচঢালা পথ।
আমরা দুই ভাই এই মানুষ আর গরু-ছাগলের মিলিত ভয়াবহতা ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছি হাসিল টেবিলের দিকে। যেখানে আমার রাসু আর বড় ভাই বসা। মেজো ভাই আমার হাত চেপে আছেন শক্ত করে। প্রবাসী ভাইটি নিজ দেশের মানুষের এই নির্মমতা দেখে হয়তো বাকরুদ্ধ। আমরা এগোচ্ছি রাস্তায় পড়ে থাকা ছিন্নভিন্ন পশু আর মানুষের শরীর ডিঙিয়ে। অবশেষে হাসিল টেবিলের কাছাকাছি পৌঁছলাম।
সেখানেও শত শত মানুষের ভিড়। সবাই ঘিরে কী যেন দেখছে। দর্শনার্থীদের অনেকেও আহত। রক্ত ঝরছে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে। আমরা ভিড় সরিয়ে উঁকি দিলাম। তাকিয়েই আমার মুখ থেকে অজান্তে বেরিয়ে আসা আর্তচিৎকার আকাশ-বাতাশ কাঁপিয়ে তুলল। রাসু...
আমার প্রতিটি শিরা-উপশিরায় রক্ত চলাচল যেন থেমে গেল। কলিজাটা যেন এখনই বেরিয়ে আসবে। আমার রাসুর তবিত দেহ আমার বড় ভাইয়ের কোলে। রক্তে আমার রাসুর চেহারাটাও চেনা যাচ্ছে না। বোমার স্পিøন্টারগুলো আমার রাসুর শরীরটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিলো। আমার কান্নার শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছিল হাজারো মানুষের আহাজারিতে। আমি কী জবাব দেবো রাসুর জন্য অপোয় বসে থাকা শিমুকে? অমানুষদের বোমা কি মায়ের মমতা বোঝে?
রাসু আর নাইরে ভাই...
এই বলেই বসা থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন বড় ভাই। তার শরীরেও স্পিøন্টার প্রবেশ করেছে অনেক। বড় ভাইও হাসপাতালের পথে মারা গেলেন।
এখনো প্রতিবছর কোরবানি আসে। সেই জায়গায় হাটও বসে। যে জায়গায় ঈদের আগেই আমরা কোরবানি দিয়েছিলাম দুইজন প্রিয়জন। আমাদের বুকে চিনচিন ব্যথা বাড়ে। শিমুর চোখের জল বাঁধ মানে না। কান্নার মাতম উঠে আমাদের ঘরে। বড় ভাইয়ের ছোট ছেলেটাও বাবাকে খোঁজে, না পেয়ে কেঁদে ওঠে...
দাগনভূঁইয়া, ফেনী

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.