ঐতিহ্যের নৌকাবাইচ

শওকত আলী রতন আবদুর রাজ্জাক

‘আল্লায় বলিয়া নাও খোল রে/ভাই সক্কলি।
আল্লাহ বলিয়া খোল/ওরে আল্লাহ বল নাও খোল/শয়তান যাবে দূরে।’
নৌকাবাইচের সময় মাঝিমাল্লারা সমবেত কণ্ঠে যেসব গান গায়, এটি অন্যতম জনপ্রিয় সারিগান। শিশু-কিশোর থেকে বৃদ্ধ সবাই আগ্রহ নিয়ে ছুটে চলেন নৌকাবাইচ দেখতে। প্রমত্তা নদীবে সঙ্গীতের তাল-লয়ে মাঝিমাল্লাদের বৈঠার ছন্দময় প্রতিযোগিতায় নদী-জল আন্দোলিত করে যে মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের অবতারণা হয়, তা অতুলনীয়। আবেগ-উত্তেজনার নৌকাবাইচ হয়ে ওঠে আপামর মানুষের নির্মল আনন্দের খোরাক।
নৌকাবাইচ উৎসব যুগ যুগ ধরে বাাংলা সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। আমাদের দেশের প্রধান প্রধান নদ-নদীতে বর্ষা মওসুমে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে রয়েছে বাংলা সংস্কৃতির অন্যতম এই উৎসব। তবে অতীতের মতো নৌকাবাইচের জৌলুশ না থাকলেও বাইচপ্রেমীদের কাছে কদর কমেনি একটুও। দেশের ছোট-বড় সব ক’টি নদীতেই নৌকাবাইচ হয়ে থাকে কমবেশি। তবে যুগ যুগ ধরে দেশের অনেক জেলায় নৌকাবাইচ ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা, বাগেরহাট, রাজশাহী, সিলেট ও হবিগঞ্জ। এসব নদীতে মূলত বর্ষা মওসুমে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে তাকে। নৌকাবাইচ অনুষ্ঠানে পাশর্^বর্র্তী বেশ কয়েকটি জেলার নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তাই প্রস্তুতিও থাকে ব্যাপক। বাইচের নৌকাগুলো খুব সরু ও লম্বা হয়ে থাকে। একটি নৌকায় কমপক্ষে ৫০ জন আর সর্বোচ্চ ১০০ জন মাঝি থাকে। আবার নৌকায় ওঠার আগে অনেক আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। সবাই পাক-পবিত্র হয়ে একই রঙের গেঞ্জি গায়ে এবং মাথায় একই রঙের রুমাল বা পট্টি বেঁধে নেয়। সবার মধ্যখানে থাকেন নৌকার নির্দেশক। তিনিই অন্য মাঝিদের নিয়ন্ত্রণ করেন এবং তাদের মনকে নানাভাবে চাঙ্গা করেন। নৌকায় দুই পাশে মাঝিরা সারি বেঁধে বসেন বৈঠা হাতে। মাঝিদের বৈঠা টানাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য একজন পরিচালক থাকে, যাকে বলা হয় গায়েন। প্রতিযোগিতার সময় দলের অন্য সদস্যদের গানের সুরে সুরে অনুপ্রাণিত করে থাকেন। মাঝিরা একত্রে জয়ধ্বনি দিয়ে নৌকা ছেড়ে এক সাথে কোনো একটি গান গাইতে আরম্ভ করেন এবং সেই গানের তালের ঝোঁকে ঝোঁকে বৈঠা টানেন; ফলে কারো বৈঠা ঠোকাঠুকি না লেগে একসাথে পানিতে অভিঘাত সৃষ্টি করতে থাকে। পরিচালক কাঁসার থালার মধ্যে লাঠি দিয়ে আঘাত করলে যে শব্দের সৃষ্টি তার তালে তালে বৈঠা ও গানের গতি বজায় রাখতে সাহায্য করে। অন্য সব নৌকাকে পেছনে ফেলে নিজেদের নৌকাকে সবার আগে যাওয়ার চেষ্টায় প্রয়োজনে কাঁসার থালার শব্দে বৈঠার গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয় এবং সেই সাথে গানের গতিও বেড়ে চলে। এ ছাড়া এই সময় দেহ ও মনের উত্তেজনার বশেই গানের মধ্যে ‘হেঁইয়ো, হেঁইয়ো’ এ ধরনের শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। সারা দেশের মতো ঢাকার জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় নৌকাবাইচ একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট তারিখে ইছামতি নদীতে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। প্রায় ২০০ বছর আগে থেকে নবাবগঞ্জের ইছামতি নদীতে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তাই এ উপজেলার ছোট বড় সবার কাছে নৌকাবাইচ সমান গ্রহণযোগ্য একটি উৎসব। প্রতি বছর বাংলা ক্যালেন্ডারকে অনুসরণ করে ভাদ্র মাসের ৩ তারিখ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত টানা নৌকাবাইচ হয়ে থাকে নদীর বিভিন্ন স্থানে। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার ইছামতি নদীর দাউদপুরে ১১ ভাদ্র শুক্রবার হাজার হাজার নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে নৌকাবাইচ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। নবাগঞ্জের দাউদপুরের ইছামতি নদীতে নৌকাবাইচ ২০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। নারী-পুরুষ সবাই একসাথে এ নৌকাবাইচ উপভোগ করে থাকেন। এলাকার মুরব্বিদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রায় ২০০ বছর আগে দাউদপুর এলাকার তৎকালীন হিন্দু জমিদার দাউদপুর নদীতে নৌকাবাইচের প্রচলন শুরু করেন এবং সেই থেকে আজো একই নিয়মে চলে আসছে এ উৎসব। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণের সর্ববৃহৎ নৌকাবাইচ এটি। নৌকাবাইচকে ঘিরে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে ইছামতি নদীর তীরে। নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে সকাল থেকে নদীর দুই পাড়ে মেলা বসে। দোকানিরা হরেক রকম জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসেন বিকিকিনির উদ্দেশ্যে। বেচাকেনাও হয় বেশ ভালো। পড়ন্ত বিকেলে নৌকাবাইচকে ঘিরে দাউদপুরের ইছামতি নদীতে তীরে হাজার হাজার নারী-পুরুষ জড়ো হয় নৌকাবাইচ দেখার জন্য। এ প্রতিযোগিতা দেখতে পিছিয়ে থাকে না শিশু-কিশোররা। মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় নদীর দুই পাড়। এ ছাড়া নৌকাবাইচ উপলে এখানে এক সপ্তাহ আগে থেকে নানা আয়োজন ও উৎসব চলে। দাউদপুরের এই নৌকাবাইচকে উপলক্ষ করে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়স্বজন বেড়াতে আসেন। নৌকাবাইচের মূল প্রতিযোগিতা শুরু হয় পড়ন্ত বিকেলে। মূল প্রতিযোগিতা দেখার জন্য নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন হাজার হাজার দর্শনার্থী।
প্রতিযোগিতার জন্য ছুটে চলা নৌকার পিছু নেয় আয়োজক কমিটির বেশ কয়েকটি ইঞ্জিতচালিত ট্রলার। কোনো অঘটন ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে এদের রক্ষায় এগিয়ে আসেন কমিটির লোকজন। তাই এ সময় খুবই সতর্ক অবস্থায় দেখা যায় তাদের। তবে মজার ব্যাপার হলো দুটি নৌকার মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় তখন টিকে থাকার জন্য বৈঠা দিয়ে আঘাত করে এ সময় জলতরঙ্গের সৃষ্টি তা দেখার জন্য অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। সবার দৃষ্টি থাকে নৌকার দিকে।
ইছামতি নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলে নৌকাবাইচ। এর মধ্যে সোল্লা, বোয়ালি, ভাঙাভিটা, ধাপারি, কলাকোপা, দেওতলা, দীঘিরপাড় ও দাউদপুর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী নৌকার মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী নৌকার মালিককে আকর্ষণীয় পুরস্কার দেয়া হয় আর অন্য নৌকার মালিকদের অংশগ্রহণের জন্য দেয়া হয় নগদ টাকা।
এ বছর ইছামতি নদীর নৌকাবাইচে মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও ঢাকা জেলার সাভার, দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলা থেকে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০টির মতো নৌকা প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এদের মধ্যে মাসুদরানা, রাজ, আল্লার দান, জিন্দাশাহ্, রিয়াদ এন্টারপ্রাইজ, দাদা-নাতি, মায়ের দোয়া, গয়ান তরী, খানবাড়ি, মোতালেব দেওয়ান, শোকচাঁন তরী ও সোনার চাঁন উল্লেখগোগ্য। এ ব্যাপারে খান বাড়ির নৌকার মালিক শাখাওয়াৎ হোসেন জানান, একটি নৌকা বাইচে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত করতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার মতো খরচ হয়। আর প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আমরা নামমাত্র পুরস্কার পাই। তার পরও প্রতি বছর এ দাউদপুরের নৌকাবাইচে আসি আনন্দের জন্য। নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে স্থানীয় লোকজন প্রতি বছর এ নৌকাবাইচের আয়োজন করে। এ ব্যাপারে নবাবগঞ্জ বাইচ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক রাশিম মোল্লা বলেন, নৌকাবাইচকে টিকিয়ে রাখতে হলে নৌকার মালিকদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে। তাদের প্রতিটি নৌকাবাইচে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। এ জন্য সরকারি ও বেসরকারি পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, নৌকাবাইচ বাঁচাতে হলে আমাদের নদী বাঁচাতে হবে।

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.