নাটালি সিসান
নাটালি সিসান

ডিজিটাল যাযাবর নাটালি সিসান

মো: আবদুস সালিম

নাটালি সিসান। সবাই তাকে চেনেন নাটালি নামে। প্রায় ৩৭ বছর বয়সী এই নারী নিউজিল্যান্ডের নাগরিক। পৃথিবীর অন্যতম সুখী ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যে সৌন্দর্যমণ্ডিত দেশ নিউজিল্যান্ড। ধনী বা সুখী হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কঠোর পরিশ্রম করেছেন নাটালি সিসানও। জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করার জন্য অনেক ধরনের কাজই করেছেন তিনি। চাকরি, ব্যবসা ইত্যাদি করে আন্তর্জাতিক যাযাবর হিসেবে নাম লিখিয়েছেন।

তাকে এখন বিশ্বের মানুষ ‘ডিজিটাল নোম্যাড’ বলে ডাকে। অর্থাৎ এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘোরাই যেন তার কাজ। তাতে প্রচুর পরিশ্রম হলেও তিনি মনে করেন, এতে পরিশ্রমের চেয়ে আনন্দই বেশি। অর্থাৎ অন্য সাধারণ নারীদের মতো সাধারণ জীবন পরিচালনা বেছে নেননি নাটালি। উচ্চশিক্ষিত একজন প্রযুক্তিবিদ তিনি। মেধাবী নাটালি ইচ্ছা করলেই একজন প্রকৌশলী হতে পারতেন। তাতে জীবন চালাতেন স্বাচ্ছন্দ্যে। তার পরও তিনি বেছে নেন যাযাবর বা ছন্নছাড়া জীবনকে।

যারা তার সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না তারা মনে করতে পারেন, তার যাযাবর হওয়া বা ঘরছাড়া হওয়া কপাল দোষে। অথচ অনেকে জানেনই না নাটালি একজন ভালো ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা। বেশ বড় পদে চাকরি করতেন করপোরেট একটি অফিসে। কাজে ভালো বলে পদোন্নতিও হয়। তার বেতন বা পারিশ্রমিক অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছিল লন্ডনে থাকা অবস্থায়। তারপর চাকরি ছেড়ে বিনিয়োগ করেন লন্ডনের একটি প্রতিষ্ঠানে। এরপর কানাডায় চলে আসেন যুক্তরাজ্য ছেড়ে। একটি প্রযুক্তি উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানে ব্যবসায়িক সহযোগী হিসেবে কাজ করেন কানাডার ভ্যানকুভারে। তখন তিনি মনে করেন, বিশ্বে নারী অংশগ্রহণ খুবই কম প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে। তাই তিনি চিন্তা করেন নারীদের এ সমস্যা কাটাতে। তার কমবেশি ভূমিকা থাকা দরকার।

তিনি ব্লগ লেখা শুরু করেন। পাশাপাশি চালান অনলাইন কোচিং করানোর কাজ। থাকার জায়গা নিয়ে যেন সামান্যতম দুশ্চিন্তা বা মাথাব্যথা নেই। অর্থাৎ যেখানে রাত সেখানেই কাত। তবে একটা বিষয় তার মাথায় আসে। আর তা হলো, যেখানে থাকা হোক আর যা খাওয়া হবে তার জন্য তো টাকা লাগবে। এ সংক্রান্ত বুদ্ধিও পেয়ে যান তিনি।

তিনি দেখেন, তার কাছে থাকা যে ভ্রমণব্যাগ তার দাম ভালোই। সিদ্ধান্ত নেন এই ব্যাগ বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে তা দিয়ে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাবেন। পরে ব্যবসা থেকে যে আয় হবে তা দিয়ে ব্যাগ ছাড়াও আরো অনেক কিছু কিনবেন। এভাবে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে নাটালির ব্যবসা। তার ব্যবসার অন্যতম উপকরণ হচ্ছে ল্যাপটপ। ব্যবসায়িক জিনিসগুলো রাখার জন্য জোগাড় করেন ছোট একটি স্যুটকেস। আর এখন সুখেই আছেন নাটালি। তা শুরু চার-পাঁচ বছর আগে।

তিনি এখন নিজেকে পরিচয় দেন ‘স্যুটকেস উদ্যোক্তা’ হিসেবেও। কারণ তা বিক্রি করাতেই দেশে দেশে যাওয়ার পথ আরো সুগম হয়। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এ সংক্রান্ত বইও লিখেছেন তিনি। তাতে প্রশংসাও পেয়েছেন বেশ। নাটালি বলেন, ‘আমার স্যুটকেস আর ল্যাপটপ আমি যে দেশে রাখি, মনে হয় সেই দেশই আমার ঘরবাড়ি। এতেই বোঝা যায় বিশ্বের মানুষকে তিনি আপন করে নিতে পেরেছেন। না হলে হয়তো এ যাত্রা এক দিন থেমে যেত। বেশির ভাগ কাজ সারেন অনলাইনে। কারণ তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধার কারণে বিশ্ব আজ হাতের মুঠোয়। তবে বেশি দিন থাকেন না কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা জায়গায়। এক জায়গায় গিয়ে কাজের ফাঁকে তিনি নতুন আরেক জায়গায় যাত্রার পরিকল্পনা করেন। তিনি দেখেন তাতে তার যাযাবরগিরি ভালোই চলে।

তার আয়ের উৎস অনেক। অর্থ আয় হয় নিজের ব্লগের বিজ্ঞাপন থেকে। এফিলিয়েট মার্কেটিং থেকেও পয়সা আসে ভালোই। বিক্রি করেন নিজের তৈরী ডিজিটাল পণ্য। বেচেন প্রোগ্রামও। আর এ সংক্রান্ত কোচিং করান যোগাযোগমাধ্যম স্কাইপে। তাতে পেরেশানি কম হয়। অনেক শিক্ষার্থী ভালোই বুঝতে পারেন পাঠ্যবিষয়। নাটালি মনে করেন, বিশ্বে ভালো ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তাদের গুরুত্ব আছে। এ ক্ষেত্রে সরকারগুলোর আরো বেশি নজর দেয়া দরকার। তাতে এ সংক্রান্ত উৎসাহ বাড়বে।

এখন পর্যন্ত নাটালি ভ্রমণ করেছেন ৬৫টির বেশি দেশ। তিনি বলেন, ‘১০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। আর সে দিনই আমার মন শান্তি পাবে।’ ভ্রমণ, খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভালোই সাশ্রয়ের পথ বের করেছেন। যার কারণে সব ব্যয় বাদ দিলেও প্রতি মাসে বেঁচে যায় দুই হাজার ডলারেরও বেশি।

তিনি বলেন, বেঁচে যাওয়া এই অর্থ কাজে লাগানো হবে আরো নারী উদ্যোক্তা তৈরিতে। আর সেই সুদিনের অপেক্ষায় আছি। তাতে বিশ্বে এ সংক্রান্ত ভারসাম্যহীনতা কমে আসবে। দেশে দেশে সাফল্যের সাথে ঘুরতে পারেন বলে নিজেকে তিনি একজন বিশ্বনাগরিকও মনে করেন।

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.