কোরবানির পশু যেমন হওয়া চাই
কোরবানির পশু যেমন হওয়া চাই

কোরবানির পশু যেমন হওয়া চাই

মো: বশিরুল ইসলাম

প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য মতে, দেশে সারা বছর প্রায় দুই কোটি ৩১ লাখ ১৩ হাজার গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই করা হয়। এর প্রায় ৫০ ভাগ জবাই হয় কোরবানির ঈদের সময়। সে হিসাবে কোরবানির সময় এক কোটি ১৫ লাখের মতো গবাদিপশু দরকার। এ জন্য পশুর চাহিদা ও মূল্য অনেক বেড়ে যায় তখন।

কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়া চলে খুব তোড়জোড়ে। অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ী ও কৃষক ঈদের দুই-তিন মাস আগে থেকে অতি সহজে গরুর তিন-চার গুণ ওজন বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ডেক্সামিথাসন গ্রুপের ডেকাসন ট্যাবলেট খাওয়ায় এবং বিভিন্ন ভিটামিন ও হরমোনাল ইনজেকশন দেয়। এ ছাড়া ভারত থেকে চোরাপথে আসা নিষিদ্ধ পাম নামক স্টেরয়েড ট্যাবলেট মাত্রাতিরিক্ত হারে গরুকে খাওয়ানো হয়। এসব ক্ষতিকর স্টেরয়েডের কারণে গরুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। অধিক মাত্রায় হরমোন প্রয়োগে গরুর ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ হয়ে থাকে এবং কিডনি অতি দ্রুত অকার্যকর হতে থাকে। শরীরে কোষের মধ্যে পানির পরিমাণ বেড়ে যায় এবং দ্রুত কোষ বিভাজন হতে থাকে। তাই এসব গরু অন্যসব গরুর চাইতে ফোলা থাকে। এ গরু খাবার কম খেয়ে পানির প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায়। শরীরের মাংসল অংশে জোরে চাপ দিলে দেবে যায়। এ গরু মাছি তাড়ানোর জন্য ঘন ঘন লেজ নাড়ায় না। আবার ওষুধের অবশিষ্টাংশ তার মাংসের মধ্যে থেকে যেতে পারে।

এসব গরুর গোশত খাওয়ার পর তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও ধীরে ধীরে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগের সৃষ্টি হয়। গোশতের মাধ্যমে গৃহীত অতিরিক্ত স্টেরয়েডের প্রভাবে কিডনি ও লিভার নষ্ট হয়ে যায়। শিশুরা অল্প বয়সে মুটিয়ে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে বড় হয়ে তাদের চির বন্ধ্যত্ব বরণ করতে হয়। গোশত রান্না করার পরও পশুর দেহে প্রয়োগ করা হরমোন নষ্ট হয় না। বরং উচ্চ তাপে পরিবর্তিত হয়ে জটিল রাসায়নিক পদার্থে পরিণত হয়। তাই গরু-ছাগল কেনার আগে যতটা সম্ভব যাচাই-বাছাই করে নিতে হবে।

গরুর দেহে প্রয়োগ করা স্টেরয়েডের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এসব গরুর গোশত খেলে নানা ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা মারাত্মক আকারে দেখা দিতে পারে। সুস্থ গরুর চোখ বড় ও উজ্জ্বল থাকে, লেজ দিয়ে মাছি তাড়ায়, কান নাড়ায়, অবসরে পান চিবানোর মতো সবসময় জাবর কাটবে। বিরক্ত করলে সহজেই রেগে যাবে। গোবর স্বাভাবিক থাকে, পাতলা পায়খানা করে না। আর মুখের সামনে খাবার ধরলে যদি জিহ্বা দিয়ে টেনে নেয় এবং নাকের ওপরটা ভেজা ভেজা থাকে, তাহলে বুঝতে হবে গরু সুস্থ। অসুস্থ গরু খেতে চায় না। তবে সব গরুই কিন্তু অবৈধভাবে মোটাতাজা করা নয়। এ জন্য বৈজ্ঞানিক ও বৈধ পদ্ধতিও আছে। তা হচ্ছে ‘ইউরিয়া মোলাসেস’ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে গরু স্বাভাবিকভাবেই মোটাতাজা হয়ে ওঠে। বর্তমানে অনেক খামারিই স্বাস্থ্যসম্মত এ পদ্ধতি অবলম্বন করছে।

ব্যবসায়ীরা দূর-দূরান্ত থেকে ট্রাকে বা ট্রলারের সাহায্যে গরু হাটে নিয়ে আসে। ট্রাকে, ট্রলারে গরু এমনভাবে বাঁধা হয় যাতে নড়তে, বসতে না পারে। হাটেও গরুকে সবসময় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। কারণ ক্রেতারা দাঁড়ানো পশুই কিনতে বেশি আগ্রহী। তাই পশুকে বিক্রেতা বসতে দিতে চায় না। ফলে একজন ক্রেতা যখন হাট থেকে গরু কিনে বাড়ি নিয়ে যায়, তখন সেই গরু একবার বসলে আর দাঁড়াতে চায় না। কোনো কিছু খেতেও আগ্রহ প্রকাশ করে না। তখন অনেকেই মনে করে, এই পশু বোধহয় মারাত্মক অসুস্থ। প্রকৃত অর্থে পশুটি তখন খুব ক্লান্ত থাকে। তাই পশুকে বিরক্ত না করে ৮-১০ ঘণ্টা বিশ্রাম দিয়ে তারপর খাবার দিতে হবে। এ সময় পশুর সামনে শুধু ঘাস ও পানি রাখা যেতে পারে; প্রয়োজনে পশু তা গ্রহণ করবে। পশুকে এমন জায়গায় রাখতে হবে, যাতে কোনো অবস্থায়ই বৃষ্টিতে না ভিজে এবং জায়গাটি শুকনো থাকে। প্রয়োজনে একটি অস্থায়ী চালাঘর তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া পশুর শোয়ার জায়গাটিতে পাটের পুরনো বস্তা বিছিয়ে দিতে হবে।

ভারত থেকে আসা গরুগুলো অনেক পথ অতিক্রম করে আসার ফলে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে দেখে বোঝা যায় না এগুলো সুস্থ না অসুস্থ। তাই এ ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আসুন, দেশী গরু কিনে খামারিদের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করি।
লেখক : জনসংযোগ কর্মকর্তা, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
mbashirpro1986@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.