আরাফাত দিবস এবং কোরবানি : কিছু কথা
আরাফাত দিবস এবং কোরবানি : কিছু কথা

আরাফাত দিবস এবং কোরবানি : কিছু কথা

সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক

বিজ্ঞান যখন দুর্বল ছিল
১৯৫৭ সালে আমার দাদা সৈয়দ মুহাম্মদ ইসমাইল এবং দাদী আমেনা খাতুন হজ করতে গিয়েছিলেন। আমাদের দেশে তথা তখনকার পূর্ব পাকিস্তানে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে কোরবানির ঈদ হয়েছিল ১০ জিলহজ। রেডিওর খবর আর পত্রিকার সংবাদ গ্রামে গ্রামে যেত না। গ্রামের মানুষ চাঁদ দেখার ওপরই নির্ভর করত। জিলহজ মাসের ৯ তারিখকে ইয়াওমুল আরাফাত ধরে নিয়ে অতিরিক্ত ইবাদত-বন্দেগি করত, নফল রোজা রাখত। চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার মানুষ যেদিন ইয়াওমুল আরাফাত বা আরাফাত দিবস উপলক্ষে নফল রোজা রাখছিলেন, সেই দিন কি আসলে সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর অল্প দূরে অবস্থিত আরাফাতের ময়দানে হাজীগণ অবস্থান করেছিলেন, না করেননি সেটা জানার কোনো তাৎক্ষণিক উপায় ছিল না। মানুষ সহজ-সরলভাবে ধর্মীয় বিধান মেনে চলত। জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ৯ জিলহজ ইয়াওমুল আরাফাত হবে এবং ১০ তারিখে কোরবানি হবে, এই ছিল শিক্ষা ও পালনীয় কর্তব্য। 


বিজ্ঞান এখন সবল, কিন্তু
বিজ্ঞান সমস্যা সৃষ্টি করেছে; এই বক্তব্যের জন্য অনেকেই মনঃক্ষুণœ হবেন এবং বলবেন, ‘বিজ্ঞান সাহায্য করছে, সমস্যা সৃষ্টি করেনি।’ শুধু চিন্তার জন্যই কথাটি উপস্থাপন করলাম। ২৬ আগস্ট নয়া দিগন্ত পত্রিকায় আশরাফ আল দ্বীন নামক একজন সম্মানিত ব্যক্তি কলাম লিখেছেন। লেখকের কথার সাথে একমত হবেন, এমন কোনো কথা নেই। সমস্যা অনেকটা এ রকম। পাঠক কলামটি পড়ছেন আজ বুধবার; আগামীকাল বৃহস্পতিবার সৌদি আরবে জিলহজ মাসের ৯ তারিখ। কিন্তু বাংলাদেশে ৮ তারিখ। আগামীকাল সৌদি হিসাব মোতাবেক হাজীগণ আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত থাকবেন। মহান আল্লাহ তায়ালা ১৯৯২ সালের জুন মাসে আমাকে এবং আমার স্ত্রীকে সুযোগ দিয়েছিলেন আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করার জন্য; এটার নাম অকুফে আরাফাহ। আরাফার ময়দানে অবস্থান করা পবিত্র হজের এক নম্বর কাজ এবং এটাই হজের দিন। কিন্তু ঢাকা মহানগরীতে চাঁদের হিসাবে আগামীকাল ৮ তারিখ; আরাফাত দিবস নয়। সম্মানিত পাঠক, আগামীকাল বাংলাদেশ সময় বেলা ১টা-দেড়টার পর থেকে একাধিক চ্যানেলে আরাফার ময়দানের দৃশ্য দেখতে পাবেন বলে আশা করি। হাজী সাহেবানদের দেখা যাবে ইবাদত করছেন; অর্থাৎ তারা আরাফার ময়দানে উপস্থিত। কিন্তু আমাকে ঢাকা বা চট্টগ্রামে মেনে নিতে হবে, আজ আরাফাত দিবস নয়, আগামীকাল আরাফাত দিবস। কারণ, আগামীকাল ৯ তারিখ। মাথার মধ্যে সমস্যাটা ঘুরছে। আমার কাছে সমাধান নেই। অনেকেই সমাধানের জন্য চেষ্টা করছেন। বিজ্ঞানীরা এবং ধর্মীয় বিষয়ে জ্ঞানী ব্যক্তিরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করবেন সমস্যাটির সমাধান করতেÑ এটুকু আবেদন রাখলাম।


চিন্তার বিশেষ কারণ কী?
এটা নিয়ে কেন চিন্তিত আমি? চিন্তা এ জন্য যে, বছরে দু’টি মাত্র ঈদ। টেলিভিশনের কারণে কোরবানি করা নিয়ে সমস্যায় না পড়লেও ইয়াওমুল আরাফাত দিবস নিয়ে সমস্যায় আছি। কোরবানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। বিজ্ঞানের কথা ওঠায় আরো একটু কথা বলে রাখি। ইন্টারনেটের কারণে মানুষ অনেক কিছু পড়তে পারে। এবার বাংলাদেশে বন্যা হয়েছে। ফেসবুকে একটা মতের অনেক ছড়াছড়ি। আমি তার সাথে দ্বিমত পোষণ করি। কারণ, আমার মতে এটা শরিয়তবিরোধী, আল্লাহর হুকুমের বিরোধী। কিন্তু মতটা কী বলে রাখি; এদের মত হলো এই ‘পশু কোরবানি না দিয়ে, টাকাটা বন্যার্তদের সেবায় দান করলেই তো হয়ে গেল।’ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ফেসবুক পরিচালনা করতে পারেন লাখ লাখ মানুষ। তাদের মধ্য থেকেই অনেক লোক, অল্প পড়েই বা অপ্রাসঙ্গিক হলেও বিরাট বিরাট মতামত ছাপিয়ে দিচ্ছেন অনেকে। তাই ভাবলাম কোরবানির ঈদ উপলক্ষে মনের কিছু আবেগের কথা, ইতিহাসভিত্তিক কথা পাঠকের সাথে শেয়ার করি। 


কোরবানির শুরু
পবিত্র ঈদুল আজহা সারা বিশ্বে মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ও ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর। এ দিনে সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কোরবানি করার অবিস্মরণীয় ইতিহাস রচিত হয়েছে। প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইবরাহিম আ: স্বপ্নযোগে আল্লাহর নির্দেশে প্রাণপ্রিয় একমাত্র সন্তান হজরত ইসমাইল আ:কে মিনা প্রান্তরে কোরবানি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে শিশুপুত্রের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হলো। আল্লাহর নবী আ:-এর ঈমানের চরম অগ্নিপরীক্ষা হয়ে গেল। তাঁর ঐতিহাসিক ও বিস্ময়কর ত্যাগের কারণে পৃথিবীতে মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রবর্তিত হয় আত্মোৎসর্গের মহাপুরস্কার পরম আনন্দ ও চরম খুশির দিন পবিত্র ঈদুল আজহা বা ‘কোরবানির ঈদ’। প্রচলিত হয় পৃথিবীর দেড় শ’ কোটি মুসলমানের জন্য জিলহজ মাসের ১০ তারিখে পশু কোরবানির রেওয়াজ। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সুতরাং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশে নামাজ পড়ো এবং কোরবানি করো।’ 


ইবরাহিম আ:-এর ইতিকথা
কোরবানির কথা বলতে গেলেই অন্যতম প্রধান নবী হজরত ইবরাহিম আ:-এর কথা বলতে হবে। প্রকাশিত অনেক বই আছে, যেগুলোতে নবীগণের জীবনী যথাসম্ভব বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা আছে। জীবনী লেখার জন্য প্রধান ভিত্তি হচ্ছে পবিত্র কুরআনে নবী সম্বন্ধে বর্ণনা এবং পবিত্র হাদিসে তাদের সম্পর্কে উল্লেখ। হজরত ইবরাহিম আ:-এর নাম পবিত্র কুরআনের ২৫টি ভিন্ন ভিন্ন সূরায় ৬৯ বার উল্লেখিত হয়েছে। আমার নিজের সংগ্রহে যে কয়েকটি বই আছে তার মধ্যে একটির নাম হচ্ছে ‘অ্যাটলাস অব দি কুরআন।’ বাংলায় অর্থ করলে দাঁড়াবে কুরআনের মানচিত্র। সহজ ভাষায় বললে দাঁড়ায় পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত নবীগণের এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠী প্রসঙ্গে বর্ণিত স্থানগুলোর এবং তাঁদের চলাচলের পথগুলোর বর্ণনা। এই অ্যাটলাস মোতাবেক, হজরত ইবরাহিম আ: খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ১৮০০ বর্ষের আগে-পরে পৃথিবীতে ছিলেন। খ্রিষ্টপূর্ব বছর ১৮০০ বা অন্য যে সময়েই হোক না কেন, ইবরাহিম আ: যে ছিলেন, সেটা ঐতিহাসিকভাবে সর্বসম্মত একটি তথ্য। মুসলমানদের জন্য এটা অলঙ্ঘনীয় তথ্য ও বিশ্বাস।

তাঁর দুই পুত্র ইসমাইল আ: এবং ইসহাক আ:, উভয়েই নবী ছিলেন। ইবরাহিম আ: এবং ইসমাঈল আ:-এর মধ্যে যে ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল সেটি পবিত্র কুরআনে একাধিক স্থানে উল্লিখিত আছে। এই ঘটনা সচেতন মুসলমানেরা জানেন এবং সচেতন খ্রিষ্টানরাও জানেন। স্বপ্নে আল্লাহ তায়ালার প্রদত্ত হুকুম মোতাবেক মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ইবরাহিম আ: তাঁর পুত্র ইসমাইলকে কোরবানি করতে প্রস্তুত ছিলেন। আল্লাহ তায়ালার হুকুমে এবং বন্দোবস্তে, সর্বশেষ মুহূর্তে, ইসমাইল আ:-এর বদলে একটি দুম্বা কোরবানি হয়। ইবরাহিম আ:-এর ত্যাগের মানসিকতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প মহান আল্লাহ তায়ালাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করে। এ ঘটনাটিকে মহান আল্লাহ তায়ালা মিল্লাতে ইবরাহিমের জন্য ইবাদতের অংশ করে দিয়েছেন। সেই থেকে আমরা মুসলমানেরা জিলহজ মাসের ১০ তারিখ পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করি। হজরত ইবরাহিম আ:-এর মর্যাদা এতই উঁচু যে, নামাজের মধ্যে যে দরুদ পড়া হয়, সে দরুদ শরিফেও ইবরাহিম আ:-এর নাম, আমাদের প্রিয় রাসূল সা:-এর নামের পরপরই উল্লিখিত আছে। 


কোরবানির মূল মর্ম আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন
পবিত্র ঈদুল আজহায় মূল অভিব্যক্তি হলো ত্যাগ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আল্লাহ সন্তুষ্টির প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে অনেক বেশি কিছু বলার দরকার নেই। মহান আল্লাহ তায়ালাই আমাদের সৃষ্টিকর্তা, আমাদের লালন-পালনকর্তা, আমাদের প্রতিপালনকারী, আমাদের রিজিক ও সম্মান প্রদানকারী। অতএব আমরা যার ওপর সর্বতোভাবে নির্ভরশীল, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের কর্মটি প্রয়োজনীয়Ñ এটা অতি স্বাভাবিক একটি বিষয়। বরং আলোচ্য বিষয় হতে পারেÑ ওই সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য, আমরা কে কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করব বা কষ্ট করব, এই চেষ্টার অংশ হিসেবেই আল্লাহ তায়ালা একটি বিধিবদ্ধ প্রক্রিয়া দিয়েছেন। সেটি হলো এই কোরবানি।

পশুর রক্ত বা মাংস মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে পৌঁছে না এবং আল্লাহ তায়ালা সেই পশুর রক্ত বা মাংসের জন্য অপেক্ষাও করেন না। যেটি আল্লাহ তায়ালার কাছে পৌঁছবে এবং যার জন্য আল্লাহ তায়ালা অপেক্ষা করবেন, সেটি হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা এবং সন্তুষ্টি অর্জনের স্পৃহা। মনে করুন, এক লাখ টাকা দিয়ে একটি গরু কেনা গেল। এক লাখ টাকা দিয়ে গরু কেনার উদ্দেশ্য যদি হয় মানুষকে এরূপ দেখানো যে, অনেক দামি একটা কোরবানি দিলাম, যেন মানুষ সেটা দেখে অভিভূত হতে পারে।

কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালা অভিভূত বা সন্তুষ্ট না হওয়ারই সম্ভাবনা। মহান আল্লাহ তায়ালা চান কষ্টার্জিত সম্পদ থেকে কিছু অংশ ব্যয় করে আমি একটি পশু ক্রয় করি এবং সেটি আল্লাহর রাস্তায় কোরবানি দিই। আল্লাহর কাছে এটাই গ্রহণযোগ্য যে, আমার সম্পদ থেকে কতটুকু ব্যয় করলাম এবং সেখানে কোনো লোক দেখানো মনোভাব থাকে না। কোরবানির পশুর গোশত কোরবানিদাতার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীরা একটি সুন্দর বণ্টনব্যবস্থার মাধ্যমে ভোগ করতে পারেন। এর মাধ্যমে সামাজিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।


আমাদের পরিবেশ বৈরী
মানুষের মনে যেন ত্যাগের মনোভাব সৃষ্টি হয়, তার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা বারবার তাগাদা দিয়েছেন। সব ধর্ম প্রচারক এই মর্মে তাদের অনুসারীদের তাগাদা দিয়েছেন। বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেও এরূপ ত্যাগের স্পৃহা সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়া হয়। ‘ত্যাগের স্পৃহা’ এটি আমার কলামের পরবর্তী অংশের উপজীব্য। বিদ্যমান পুঁজিবাদী ও ভোগবাদী অর্থনীতি এবং দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ত্যাগ নামক স্পৃহাকে উৎসাহিত করে না। আমাদের প্রয়োজন হচ্ছে, সমাজে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা যেন মানুষের মনে ত্যাগের স্পৃহা সৃষ্টি হয়। মনে করুন সরকার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের দাবির মুখে ৭.৫ পার্সেন্ট ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিলো। এটা সরকারের পক্ষ থেকে ছাত্রদের জন্য একটি ত্যাগ। 


ত্যাগের সামাজিক উদাহরণ 
আজকাল সামাজিক দায়িত্ব পালন তথা করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (সংক্ষেপে সিএসআর) নামক কথাটা মিডিয়ার কারণে সুপরিচিত। মনে করুন, একটি বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা শিল্পগোষ্ঠী যার নাম ‘মরুভূমি গ্রুপ’, তারা সিএসআর কার্যক্রমের অংশ হিসেবে দূরবর্তী গ্রামে একটি ভগ্নপ্রায় প্রাইমারি স্কুলের বিল্ডিংকে নতুন বানিয়ে দিলো। এটা হলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, ওই গ্রামের জনগণের জন্য মরুভূমি গ্রুপের পক্ষ থেকে ত্যাগ স্বীকার। মনে করুন, ‘শ্রী সাহস নারায়ণ তালুকদার’ নামক এক ব্যক্তি তার জন্মস্থান গ্রামে মন্দিরের পাশে একটি ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করে দিলেন যাতে করে গ্রামবাসী আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ খাবার পানি পায়। এটা হলো গ্রামবাসীর জন্য তার পক্ষ থেকে একটি ত্যাগ স্বীকার। মনে করুন, জনৈক ধনী ব্যক্তি ‘জনাব আলী চৌধুরী তার গ্রামে একটি মাদরাসা এটারই পাশাপাশি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপনের জন্য ছয় শতাংশ জমি ওয়াকফ করে দিলেন।

এটি হলো জনাব চৌধুরীর পক্ষ থেকে নিজের গ্রাম ও চারপাশের জনপদের মানুষের শিক্ষার জন্য ত্যাগ স্বীকার। একটি সাংসারিক উদাহরণ দিই। বহু ক্ষেত্রেই সংসারে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানসন্ততি রেখে বাবা মারা যান। তখন ছোট ভাইবোনদের মানুষ করার দায়দায়িত্ব সর্বজ্যেষ্ঠ ভাই নিজের কাঁধে তুলে নেয়। এ সূত্রেই মনে করুন, পাঁচটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেসন্তান রেখে কোনো একটি সংসারের বাবা ‘কালু মিয়া’ মারা গেলেন। সর্বজ্যেষ্ঠ সন্তানের বয়স ১৮ বছর; সবে এইচএসসি পাস করেছে। সেই ১৮ বছর বয়স্ক সন্তান শুধু নিজের লেখাপড়ার খরচ মিটানোর জন্য চাকরি করতে পারত, কিন্তু সে এই বয়সেই ছোট ভাইদেরও পড়ানোর দায়িত্ব নেয়। ছোট বোন থাকলে, বোনকে লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নেয়। এটা হলো বড় ছেলের পক্ষ থেকে পরিবারের জন্য ত্যাগ স্বীকার।


মনের পশুত্বকে জবাই করতে হবে
ঈদুল আজহার দিনে একটা মানসিক কর্ম বা সরেজমিন কর্ম হলো টাকা খরচ করে, গরু বা ছাগল কিনে কোরবানি দেয়া তথা ত্যাগ স্বীকার করা এবং অন্য যে কর্মটি সম্পাদন করা উচিত সেটা হলো, নিজেদের ভেতরের পশুত্বকে চিহ্নিত বা আবিষ্কার করা এবং সেই পশুত্বকে দমন করা। এই প্রক্রিয়া যদি অনুসরণ করা হয়, তাহলে আমার মনের ভেতরে ত্যাগ স্বীকার করার প্রবণতা সুদীপ্ত ও প্রখর করতে পারব বলে বিশ্বাস করি। আমার মূল্যায়নে, বর্তমান সমাজে খুব কম লোকই এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন। অতএব খুব কম লোকই আন্তরিক ত্যাগ স্বীকারে অধিকতর আগ্রহী হন। অন্য একটি কথা হলো, প্রক্রিয়া অনুসরণ না করার ফলে হয়তো বা নিজের পশুত্বকে তো দমন করতে পারলামই না, ত্যাগ স্বীকারের মনোভাব প্রখর করতে পারলামই না, বরং লোক দেখানোর মতো একটা মন্দ কাজ করলাম। 


আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ
ঈদুল আজহার ত্যাগ ও কোরবানির মূল উদ্দেশ্য আল্লাহর নৈকট্য ও অপার সন্তুষ্টি লাভ করা। কোরবানির লক্ষ্যই হলো নিজের নফস বা আত্মা তথা আমিত্বকে আল্লাহর রাহে সমর্পণ করা এবং নিজের প্রিয় বস্তু বা ধনসম্পদ আল্লাহর নামে বিলিয়ে দেয়া বা উৎসর্গ করা। গৃহপালিত গরু, মহিষ, উট, ভেড়া, ছাগল, দুম্বা প্রভৃতি চতুষ্পদ জন্তুর যেকোনো একটি দিয়ে কোরবানি দেয়া যায়। মুসলমানেরা আল্লাহর কাছে যেমনভাবে আত্মসমর্পণ করেন, তা হলো যখন পশু কোরবানি করা হয় তখন পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি স্মরণ করা হয়, ‘ইন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।’ অর্থাৎ নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎগুলোর প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। (সূরা আল-আনয়াম, আয়াত : ১৬২)।

আল্লাহর কাছে কখনো কোরবানিকৃত পশুর রক্ত, গোশত, হাড় ইত্যাদি পৌঁছে না; শুধু পৌঁছে আন্তরিকতা ও খোদাভীতি। কে কত বড় মোটাতাজা পশু আল্লাহর নামে কোরবানি বা উৎসর্গ করল এবং কত বেশি দামে ক্রয় করল, তা তিনি দেখেন না; বরং তিনি দেখেন তাঁর বান্দার মনের অবস্থা। মানুষ কি লোক দেখানোর জন্য কোরবানি করল, নাকি সত্যি সত্যিই আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় করল তা-ই তিনি দেখেন এবং সে অনুপাতে আল্লাহ তার উৎসর্গকৃত পশুকে কবুল করে থাকেন। 


ঈদুল আজহার দিনে পশু কোরবানি করাই সর্বোত্তম ইবাদত। রাসূলুল্লাহ সা: সব সময় কোরবানি করেছেন এবং সামর্থ্যবান মুসলমানদের কোরবানি করতে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘কোরবানির দিন মানবসন্তানের কোনো নেক আমলই আল্লাহর কাছে তত প্রিয় নয়, যত প্রিয় রক্ত প্রবাহিত করা বা কোরবানি করা। কোরবানির পশু তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ কিয়ামতের দিন এনে দেয়া হবে। কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে সম্মানিত স্থানে পৌঁছে যায়। সুতরাং তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি করো।’ (তিরমিজি ও ইবনে মাজা)। বস্তুত ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি ত্যাগের প্রতীকী অনুষ্ঠান। সারা বিশ্বের মুসলমানদের ত্যাগ-তিতিক্ষা, স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ ও আত্মোপলব্ধির শিক্ষা, ঈদুল আজহার চেতনায় আল্লাহর রাহে নিজের সর্বস্ব সর্বোপরি প্রিয় বস্তুকে কোরবানি দেয়ার সুদৃঢ় প্রত্যয়ের মধ্যে নিহিত। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে কোরবানির ঈদ আত্মশুদ্ধি ও আত্মত্যাগের নামান্তর। আমরা যেন কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা উপলব্ধি করতে সক্ষম হই।
উপসংহার


সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে লিখছিলাম। ইনশাআল্লাহ আগামী দু’টি বা তিনটি কলাম ওই প্রসঙ্গেই থাকবে। গত বুধবারের কলামটি ওই প্রসঙ্গেই ছিল। সুন্দর ঈদ করুন, বানভাসি মানুষের জন্য একটু চেষ্টা সবাই করবÑ এই চিন্তা নিয়েই আজকের কলাম শেষ করলাম। 


লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি 
যোগাযোগ : mgsmibrahim@gmail.com

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.