গুরমিত সিং ও বিভক্ত ভারতীয় সমাজ

আহমেদ বায়েজীদ

উগ্রতার আরেকটি ভয়াবহ রূপ দেখল ভারত। স্বঘোষিত ধর্মগুরু গুরমিত রাম রহিম সিংয়ের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হতেই ভয়াবহ তাণ্ডব শুরু হয় দু’টি রাজ্যে। নৈরাজ্য ঠেকাতে গিয়ে গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। নিহত হয়েছে ৩৮ জন। মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। পরিস্থিতি এতই খারাপ ছিল যে, আদালত নয়, রায় ঘোষণা করা হয়েছে জেলখানায় বিশেষ আদালত বসিয়ে। গুরমিত সিংয়ের ঘটনা প্রকাশ্যে আশার পর থেকে উন্মোচিত হচ্ছে এ ঘটনার নেপথ্যের অনেক দিক। তার বিলাসী জীবন, রাষ্ট্রের মধ্যে আরেক রাষ্ট্র স্টাইলের আশ্রম ব্যবস্থা, বৈষম্যময় ভারতীয় সমাজব্যবস্থা, রাজনীতিকদের নীরব সমর্থনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে আধুনিক যুগেও ভারতের এই গুরুদের কর্মকাণ্ড নিয়ে।
হরিয়ানা রাজ্যের সিরসা শহরের এক আশ্রমের প্রধান গুরমিত রাম রহিম সিং। শুধু আশ্রম বললে ভুল হবেÑ তার আশ্রম ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগত। আশ্রমকেন্দ্রিক তার জগত হলেও তার ভক্ত ছড়িয়ে রয়েছে সারা ভারতে। বিভিন্ন ভক্ত পরিবার থেকে নারী সদস্যদের পাঠানো হতো তার সেবা করার জন্য। আশ্রমকেন্দ্রিক অপরাধের স্বর্গরাজ্য কায়েম করলেও গুরমিতের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস করত না। ধর্ষণ, হত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। দিনের পর দিন সেবিকাদের ধর্ষণ করে চলেছেন তিনি। গুরমিতের নির্যাতনের শিকার নারীরা বাড়ি ফিরে অভিযোগ করলেও অন্ধভক্ত হওয়ায় অনেক পরিবার এসব কথা বিশ্বাস করত না। বিভিন্ন সময় কিছু অভিযোগ উঠলেও ব্যাপক প্রভাবশালী এই ‘বাবা’র বিরুদ্ধে সাক্ষীর অভাবে কিছুই প্রমাণ করা যায়নি। তবু ২০০২ সালে গুরমিতের দুই সেবিকা সাহস করে এগিয়ে আসেন। তাদেরই একজন নাম প্রকাশ না করে চিঠি লেখেন তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারি বাজপেয়ির কাছে। সেই চিঠিতে পাঞ্জাবের ওই নারী তুলে ধরেন গুরমিতের আশ্রম ও তার ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের কথা। গা শিউরে ওঠার মতো বর্ণনা সেই চিঠিতে। এবার এগিয়ে আসেন হরিয়ানার দৈনিক পত্রিকা ‘পুরা সচ্’-এর সাংবাদিক রামচন্দ্র ছত্রপতি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নিজের সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন সেই চিঠি। সে ঘটনার ‘ফল’ও ভোগ করতে হয়েছে তাকে। রামের শিষ্যদের হাতে জীবন দিয়েছেন তিনি। তার পরও ধর্ষণের শিকার সেই দুই নারী হাল ছাড়েননি। অবশেষে দীর্ঘ ১৫ বছর পর তারা বিচার পেয়েছেন নির্যাতনের। দুই মামলায় ২০ বছরের কারাদণ্ড ও ৩০ লাখ রুপি জরিমানা হয়েছে গুরমিতের।
গুরমিত সিংয়ের ঘটনায় ভারতের সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার আরো একটি করুণ চিত্র ফুটে উঠল। দেশটির বিভিন্ন স্থানে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ভক্ত বানিয়ে আশ্রমের নামে নতুন সাম্রাজ্য কায়েম করা ‘বাবাদের’ কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তদন্ত করার দাবি উঠেছে জনগণের মধ্য থেকে। কাষ্ঠভিত্তিক ভারতীয় বর্ণবাদী সমাজব্যবস্থার দুর্দশা আরো একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এ ঘটনা। দরিদ্র, অশিক্ষিত, সামাজিকভাবে নিগৃহীত, নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই বেশির ভাগ ভক্ত হচ্ছে এসব আশ্রমের। তাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে আশ্রমগুরুরা গড়ে তুলছে নতুন সাম্রাজ্য। অধিকারহীন এসব মানুষকে গুরমিত সামাজিক মর্যাদা ও বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়েছিলেন সে কথা সত্য। ভক্তদের মধ্যে বিভিন্ন দাতব্য কর্মকাণ্ডও চালাতেন তিনি, যে কারণে তার জন্য জীবন দিতেও পিছপা হয়নি এই ভক্তরা। বিবিসি ওয়ার্ল্ডের ভারত প্রতিনিধি সৌতিক বিশ্বাস তার এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, ‘গুরু বা এই জাতীয় ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর উত্থান দেখিয়ে দেয় যে ভারত কতটা বিভক্ত। শুক্রবারের সহিংসতা আরো একবার দেখিয়ে দিল যে, গুরুরা কিভাবে একটি সমান্তরাল রাষ্ট্র চালাতে পারে এবং রাষ্ট্র দৃশ্যত ক্ষমতাহীন হয় তাদের কাছে।’ সংবাদ বিশ্লেষক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এক সামূহিক বিশ্বাসে ভর করে গড্ডলিকা প্রবাহে নিয়ত প্রবহমান আমরা। তর্কের আবহ ফিরুক, যুক্তির চর্চা হোক। এই ভণ্ড গুরুদের দিন শেষ না হলে তা কোনো দিনও হবে না।’ এ ঘটনায় দায় এড়াতে পারে না প্রশাসন ও রাজনীতিবিদেরা। দিনের পর দিন প্রশাসনের নাকের ডগায় চলেছে এই আশ্রম। ছিল না কোনো নজরদারি।
কলকাতার বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার লিখেছে, ‘এ ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনও। আদালতের তীব্র ভর্ৎসনার মুখে পড়েছে রাজ্য প্রশাসন, প্রধানমন্ত্রী তথা কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়েও আদালত প্রবল অসন্তোষ ব্যক্ত করেছে।’ ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে গুরমিত সিংয়ের সাথে দহরম মহরমের। রায়ের পর তার শিষ্যদের তাণ্ডবের পরও ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের পক্ষ থেকে জোরালো কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এর নিন্দা জানালেও স্থানীয় বিজেপি প্রায় চুপই ছিল।
ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক স্বাতী চতুর্ভেদী এনডিটিভির অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে লিখেছেন, ‘এমনকি ধর্ষণ ও খুনসহ আরো গুরুতর অভিযোগে সিং অভিযুক্ত হওয়ার পরও কোনো দলের কোনো নেতা ভোটের জন্য তার সমর্থন চাইতে বিবেকের দংশনের শিকার হননি।’ বিভিন্ন সময় অনেক রাজনীতিকেই দেখা গেছে গুরমিতের কাছে সমর্থন চাইতে। ২০১৪ সালের হরিয়ানার নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থীরা তার সমর্থন চেয়েছেন বলে জানা যায়।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.