রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের আহ্বান 
রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের আহ্বান 

রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের আহ্বান 

ইমরান আনসারী, জাতিসঙ্ঘ সদর দফতর থেকে

মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলা অব্যাহত গনহত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তেনিয়ো গুতেরাস। রাখাইন রাজ্যে সংবরণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতি আহ্বান জানান তিনি।অন্যথায় পরিস্থিতি একটি মানবিক বিপর্যয়ের দিকে যাবে বলে সতর্ক করেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব।

শুক্রবার জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব এক বিবৃতিতে তার এ উদ্বেগের কথা জানান।
ওই বিবৃতিতে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আরো জানান, এটি মিয়ানমার সরকারের দায়িত্ব হবে যে রাখাইন রাজ্যে এবং বাংলাদেশে জাতিসঙ্ঘ ও অন্যান্য সহযোগী মানবিক সাহায্য সংস্থার নির্বিগ্নে মানবিক সহযোগিতার কাজ পরিচালনা করার জন্য নিরাপত্তা ও সহযোগিতা প্রদান করা।
সহিংসতার মোকাবেলায় একটি সর্বাত্মক প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

জাতিসঙ্ঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের দেয়া সুপারিশগুলো যথাযথ বাস্তবায়নের প্রতি জোর আরোপ করেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তেনিয়ো গুতেরাস।
উল্লেখ্য গত সপ্তাহের শুরুতে কফি আনানের নেতৃত্বাধীন এডভাইজরি কমিশন অন রাখাইন স্টেইট মিয়ানমারের পশ্চিমা লের রাজনৈতিক , আর্থ-সামাজিক এবং মানবিক উন্নয়নে একটি সুপারিশ-সংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

শরণার্থী রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা করবার জন্য বাংলাদেশ সরকার ও স্থানীয় জনগণের প্রশংসা করেছেন মহাসচিব গুতেরাস। এছাড়া রোহিঙ্গাদের কাছে মানবিক সাহায্য পৌছাতে জাতিসঙ্ঘ ও অন্যান্য সংস্থাগুলোকে সহায়তা করতে বাংলাদেশ সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নেবার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব।

৮ দিনে বাংলাদেশে এসেছে ৬০ হাজার রোহিঙ্গা

জাতিসঙ্ঘ জানিয়েছে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে গত আট দিনে সহিংসতার কারণে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজারে পৌঁছেছে।
জাতিসঙ্ঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বা ইউএনএইচসিআর এর কর্মকর্তা ভিভিয়ান ট্যান বলেছেন, যে ভাবে লোক আসছে তাতে আর কয়েক দিনেই সীমান্তে যে শিবিরটি আছে তা পুরো ভরে যাবে।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব আন্তনিও গুটেরেস সেখানে একটি মানবিক দুর্যোগ তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গত সপ্তাহে সন্দেহভাজন রোহিঙ্গা জঙ্গীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, কিন্তু বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লোকেরা বলছে, সৈন্যরা তাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে এবং তাদের ওপর গুলি চালিয়েছে। মিয়ানমারের সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করছে।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আজ বলেছে, সেখানে কেবল একটি রোহিঙ্গা গ্রামেই সাতশো বাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে বলে তারা স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে দেখতে পাচ্ছে।
এর আগে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়িপ এরদোয়ান যেভাবে রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা করা হচ্ছে তাকে রীতিমত গণহত্যা বলে বর্ণনা করেন।
সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, এখনো প্রতিদিনই হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশ পালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসঙ্ঘের সর্বশেষ হিসেবে আজকে পর্যন্ত ৫৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে।
যদিও বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বিজিবি এবং কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে, সেজন্য তারা সীমান্তে তৎপর রয়েছেন। কিন্তু গত দু'দিন ধরে সীমান্তে কিছুটা শিথিলতা দেখানো হচ্ছে বলে সূত্রগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে বলছে।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলছিলেন, একেবারে দুস্থ মহিলা এবং শিশুদের জন্য কিছু ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করা হচ্ছে।

"আমরা তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছি। ফিরিয়ে দেয়ার পরও মানবিক দিক বিবেচনা করে যারা নিতান্তই অসুস্থ বা বৃদ্ধ মহিলা, শিশু এবং বেশ কিছু আহত, তাদেরকে তো আমাদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা, এগুলো না দিলেই নয়। এটা আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগেও বলেছেন, এখনো আমরা সেটা দিযে চলেছি।"
এইচ টি ইমাম আরও বলেছেন, "মিয়ানমারের অভ্যন্তরে যারা এই আক্রমণের শিকার,তাদের নিরাপত্তা দিতে হলে মিয়ানমারের মধ্যেই দিতে হবে। এটা আন্তর্জাতিক রেড ক্রসই করতে পারে।"
হাজার হাজার শরণার্থী বাংলাদেশে ঢুকে আশ্রয় এবং খাবারের জন্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
কক্সবাজার থেকে রেড ক্রিসেন্ট এর সহকারি পরিচালক সেলিম আহমেদ বলছিলেন, গত ২৫ শে অগাষ্ট মিয়ানমারে সংঘাত শুরুর পর পরই রোহিঙ্গা যারা বাংলাদেশে ঢুকেছে, তাদের বেশির ভাগই উখিয়ার কুতুপালং এ নিবন্ধিত এবং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে।


রোহিঙ্গা গ্রামের ৭০০ বাড়িতে আগুন

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, মিয়ানমার থেকে পাওয়া নতুন উপগ্রহ-চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে একটি রোহিঙ্গা মুসলিম গ্রামের ৭০০-রও বেশি বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, এসব ছবি গভীরভাবে উদ্বেগজনক, এবং এতে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে যে রাখাইন প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে ধ্বংসলীলার মাত্রা আসলে আগে যা ভাবা হয়েছিল তার চাইতে অনেক বেশি।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং সন্দেহভাজন রোহিঙ্গা জঙ্গীদের মধ্যে সংঘর্ষের পর গত সপ্তাহে হাজার হাজার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে ঢুকেছে।
পালিয়ে আসা এই শরণার্থীরা বলছে, মিয়ানমারের সৈন্যরা তাদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
তবে মিয়ানমারের সরকার এ কথা অস্বীকার করেছে। সরকার বলছে, তাদের নিরাপত্তা বাহিনী গত মাসে ঘটা একটি আক্রমণের মোকাবিলা করছে - যাতে রোহিঙ্গা জঙ্গীদের হাতে ২০টি পুলিশ ফাঁড়ি আক্রান্ত হয়েছিল।

জাতিসঙ্ঘের অনুমান অনুযায়ী এ পর্যন্ত ৫৮ হাজার শরণার্থী বাংলাদেশে ঢুকেছে। অন্য আরো প্রায় ২০ হাজার লোক সীমান্ত এলাকায় নাফ নদীর তীর বরাবর আটকে রয়েছে।
মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অফিস বলছে, রাখাইন রাজ্যের সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৪০০ লোক নিহত হয়েছে - যার অধিকাংশই রোহিঙ্গা মুসলিম।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.