করোনারি হৃদরোগীদের জন্য অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট

ডা: গোবিন্দ চন্দ্র দাস

সুপার পোষকগুলো বর্তমানে মেডিক্যাল আর বৈজ্ঞানিক রিসার্চের মনোযোগ আকৃষ্ট করেছে। এগুলো হচ্ছেÑ ভিটামিন ‘এ’, ভিটামিন ‘সি’ ও ভিটামিন ‘ই’-এর অগ্রদূত। এসব পোষক একসাথে মিলে এমন শক্তিশালী জোট তৈরি করে, যেটি শরীরকে
বেশ কিছু রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে, আর বয়স বৃদ্ধির ক্রিয়াকেও হ্রাস করতে পারে। একই সাথে প্রতিহত করে হৃদরোগ। লিখেছেন ডা: গোবিন্দ চন্দ্র দাস
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বেশ কিছু খাদ্যদ্রব্যে পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক রূপে পাওয়া যায় ফল আর সবজিতে, যেগুলো আমরা বেশি পরিমাণে খেতে পারি। বিটাক্যারোটিন, ভিটামিন ‘সি’ আর ভিটামিন ‘ই’-এর অদ্ভুত শক্তির ব্যাপারে প্রচুর অধ্যয়ন করা হয়েছে। স্বাধীনভাবে ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও ‘ই’ সেবন করা ব্যক্তিদের ক্যান্সার, অ্যাঞ্জাইনা আর হৃদরোগ কম দেখতে পাওয়া যায়, আর তাদের আয়ুও লম্বা হয়।
শরীর চালানোর জন্য ভোজন থেকে প্রাপ্ত অক্সিজেনের সঞ্চার হিমোগ্লোবিনের লাল রঙের কণাগুলো দ্বারা হয়, যাতে লৌহ থাকে। রক্তপ্রবাহে অক্সিজেন কোশিকাগুলোকে জীবিত রাখার জন্য গ্রহণ করা হয়। এই ক্রিয়াকে অক্সিডেশন বলা হয়। যদিও এই অক্সিজেন মুক্তকণার নির্মাণও করে, যেটা অধিক পরিমাণে হলে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
মুক্তকণা অক্সিডেশনের ক্রিয়ার সময় সৃষ্টি হয়। যখন শরীর অক্সিজেনের ব্যবহার করে, তখন সেটা এনার্জি তৈরির জন্য ভোজনকে বিঘটিত করে। এটা কীটানু, ওজন আর কার্বন মনো-অক্সাইডও নষ্ট করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় মুক্তকণাও সৃষ্টি হয়। এসব কণা কোশিকাগুলোর ঝিল্লি নষ্ট করে ক্রোমোসোন্স ও জৈবীয় সামগ্রীগুলোর ক্ষতিসাধন করে। এটি মূল্যবান এনজাইমও নষ্ট করে ফেলে। যে কারণে পুরো শরীর নষ্ট হওয়ার প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। এভাবে মুক্তকণা করোনারি হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, কয়েক ধরনের ক্যান্সার, চোখের ছানি, আর্থ্রাইটিস, পারকিনসন্স ও বার্ধক্যের মতো রোগের বড় কারণ হয়ে ওঠে।
মুক্তকণা থেকে হওয়া ক্ষতিকে আমরা দু’ভাবে কমাতে পারি। প্রথমত, আমাদের এমন তত্ত্ব আর গতিবিধি থেকে বাঁচতে হবে, যেগুলো মুক্তকণা সৃষ্টিতে সহায়তা করে, যেমনÑ সিগারেট, দূষণ আর সূর্যের আলট্রাভায়োলেট কিরণ।
দ্বিতীয়ত, এটা সুনিশ্চিত করতে হবে আমরা দৈনিক আহারে ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও ‘ই’ সেবন করে বেশিমাত্রায় অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গ্রহণ করব।
যদিও ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও ‘ই’ মুক্তকণা থেকে হওয়া ক্ষতির সাথে লড়তে সহায়তা করে। বায়ুদূষণও এসব গুরুত্বপূর্ণ পোষক কম করে তোলে। অধ্যয়ন থেকে এটা জানতে পারা গেছে, শহরে বাস করা ব্যক্তিদের মধ্যে যারা দূষিত হাওয়ায় শ্বাস নেন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের স্তর কম থাকে। এর ফলে শরীরে ভিটামিন ‘এ’, ‘সি’ ও ‘ই’ বিপজ্জনকভাবে কমে আসে। এমনটি হলে এগুলোর জায়গা মুক্তকণা নিয়ে নেয় আর অক্সিডেটিভ চাপের সৃষ্টি হয়। আমাদের ভোজনে মুক্তকণা থাকা বিপজ্জনক হয়। এর মুখ্য উৎস হচ্ছে ফ্যাট (যেমনÑ বেশি তাপমাত্রায় রান্না করা তেল) ফ্যাট যে মুহূর্তে গরম করা হয়, তার রাসায়নিক রচনা ভেঙে বিপজ্জনক হাইড্রোলিকস কণা তৈরি করে। কোশিকাগুলো এবং ডিএনএর প্রচণ্ড ক্ষতি করে। (সূর্যমুখী তেলের মতো পোলি-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি তাপমাত্রায় কম স্থায়ী থাকে। এটি জয়তুনের তেলের মতো মোনো-আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের তুলনায় দ্রুত অক্সিডেটেড হয়ে পড়ে।) মেডিক্যাল সায়েন্স সব সময় ভিটামিনের লাভের প্রচার করে এসেছে আর বৈজ্ঞানিকেরাও এই জাদুতত্ত্বের সার্থকতা প্রমাণ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন। অ্যান্টি-অক্সিডেন্টের বিচার সম্বন্ধিত রূপে কিছুটা নতুন।
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্যাথোলজিক্যাল পরিস্থিতিগুলোয় চিকিৎসায় নতুন পথ উন্মুক্ত করে দিয়েছে; যেমনÑ
১) কার্ডিয়োভাস্কুলার রোগÑ সিএইচডি, উচ্চ রক্তচাপ।
২) সেরিব্রোভাস্কুলার রোগ।
৩) মেটাবোলিজম রোগÑ ডায়াবেটিস মেলিটাস।
৪) শিরার রোগÑ এলেজমিট রোগ, মৃগী।
৫) বিপোষক রোগÑ চোখের ছানি, আর্থ্রাইটিস, বার্ধক্য।
৬) ক্যান্সার।

ভিটামিন ‘এ’
ভিটামিন ‘এ’ দুই প্রকারের হয়। প্রথমত, পশুদের থেকে প্রাপ্ত উৎপাদন। যেমনÑ গোশত আর দুধে পাওয়া যায়। একে রেটিনল বলা হয় এবং দ্বিতীয়ত, ফল আর সবজিতে পাওয়া যায়, যাকে ক্যারোটিন বলা হয়। বিটাক্যারোটিনই অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রূপে কাজ করে।
শরীরের বিকাশ ও সুস্থ রাখতে ভিটামিন ‘এ’-এর প্রয়োজন হয়। এর অভাব হলে ত্বক আর চোখ অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে, সুস্থ হাড় ও ভালো দাঁত তৈরি হতে সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদি এর অভাবের চিকিৎসা সময় থাকতে না করা হলে ব্যক্তি পুরোপুরি অন্ধও হতে পারেন। ভারতে অন্ধত্বের কারণগুলোর মধ্যে সাধারণ কারণ হচ্ছে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব। বিটাক্যারোটিন বেশ কিছু ফল আর সবজিতে পাওয়া যায়, যেমনÑ পালংশাক, ধনেপাতা, বাঁধাকপি, গাজর, আম, টমাটো ইত্যাদি। শরীরে এই ক্যারোটিন, ভিটামিন ‘এ’তে পরিবর্তিত হয়। বিটাক্যারোটিন রান্না করলে বা আলট্রাভায়োলেট কিরণের ফলে নষ্ট হয় না।
একজন বয়স্ক ব্যক্তির প্রতিদিন ৬০০ মিলিগ্রাম রেটিনল বা ২৪ মিলিগ্রাম বিটাক্যারোটিন প্রয়োজন হয়। বাড়ন্ত শিশু, গর্ভবতী মহিলা আর অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এ প্রয়োজন আরো বেশি হয়। এক মিলিগ্রাম বিটাক্যারোটিন = ০.২৫ মিলিগ্রাম রেটিনল।
বিটাক্যারোটিন দু’ভাবে কাজ করে। প্রথমে এর কিছু অংশ ভিটামিন ‘এ’তে পরিবর্তিত হয়, আর অবশিষ্ট বিটাক্যারোটিন অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রূপে কাজ করে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, বিটাক্যারোটিন আর ভিটামিন ‘এ’-এর মধ্যে যেন ভ্রমের সৃষ্টি না হয়, কারণ এ দুটো হচ্ছে আলাদা আলাদা বিষয়। আমাদের শরীর বিটাক্যারোটিনকে ভিটামিন ‘এ’তে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়।
যদিও দীর্ঘ সময় ধরে বেশি পরিমাণে ভিটামিন ‘এ’ সেবন করা ক্ষতিকারক লক্ষণ সৃষ্টি করতে পারে। যেমনÑ মাথাব্যথা, গা গোলানো, বমি, আলস্য, শুষ্ক ত্বক, ঠোঁট ফাটা ইত্যাদি।
ভিটামিন ‘এ’-এর প্রয়োজন শরীরের বিকাশ ও সুস্থ রাখার জন্য হয়। এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার মধ্যে একটি হচ্ছেÑ আমাদের কোশিকাগুলোকে স্বরক্ষাত্মক কবচ বা ঝিল্লি প্রদান করা। এটি মিউকাস ঝিল্লিকেও সুরক্ষিত রাখে। এটি ফ্যাটে গলে যায়। মাছের লিভারের তেল হচ্ছে ভিটামিন ‘এ’-এর ভালো প্রাকৃতিক উৎস।
বিটাক্যারোটিন হচ্ছে গাছ থেকে পাওয়া প্রাকৃতিক পদার্থ। সর্বপ্রথম এটা গাজরে পাওয়া গিয়েছিল। এ জন্য গাজরপরিবারকে ক্যারোটেনয়েডস নাম দেয়া হয়েছিল। ক্যারোটেনয়েডসে বেশ কিছু রঙিন পদার্থ রয়েছে, যেগুলো প্রকৃতিতে দেখতে পাওয়া রঙের ভাণ্ডার। বিটাক্যারোটিন গাঢ় লাল-কমলা রঙের হয় এবং হলুদ আর কমলা গাঢ় সবুজ রঙের সবজিতেও ক্যারোটিন থাকে, কিন্তু ক্লোরোফিলের কারণে হলুদ আর কমলা রঙ চাপা পড়ে যায়। কিন্তু অসংখ্যবার এটি চাপা পড়তে পারে না। যেমনÑ লাউতে।
বিটাক্যারোটিন হচ্ছে শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্টগুলোর অন্যতম, যেটি গাছকে সূর্যের আলট্রাভায়োলেট কিরণে পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। এটি হচ্ছে প্রকৃতির সঠিক রক্ষক। তরমুজ, বেদানা, আঙুর, আম, গাজর, আলু, পালংশাক, টমেটো, আজওয়াইন, জলকুম্ভি ও ফুলকপির মতো ফল আর সবজিতে বিটাক্যারোটিন থাকে।

ভিটামিন ‘সি’ (এসকরবিক এসিড)
অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রূপে কাজ করা ছাড়াও ভিটামিন ‘সি’-এর আরো বেশ কিছু গুণ রয়েছে। এটি শরীরের বিকাশ আর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গÑ মাঢ়ি, দাঁত, রক্তের নাড়ি আর হাড়ের ক্ষতি পূরণ করতেও সহায়তা করে। এটা শারীরিক ব্যবস্থায় শামিল থেকে ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাস সংক্রমণের সাথে লড়তেও সহায়তা করে। ভিটামিন ‘সি’-এর অভাবে হ্যামারেজ ক্ষতস্থান শুকাতে সময় নেয়া, স্কার্বি, মাঢ়ি দিয়ে রক্ত পড়া, হাড় গঠনে ধীর গতি ইত্যাদি লক্ষণ দেখতে পাওয়া যায়। ভিটামিন ‘সি’ আমলাতে পাওয়া যায়। ভিটামিন ‘সি’-এর ভালো উৎস হচ্ছে রসযুক্ত ফল। যেমনÑ পাতি লেবু, মুসম্বি, কমলা, পেয়ারা আর সবুজ পাতাওয়ালা সবজিÑ পালংশাক ইত্যাদি।
কাটা আর রান্না এটি নষ্ট করে দেয়। একজন বয়স্ক ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন এর প্রয়োজন হচ্ছে ৪০ মিলিগ্রাম। এটি শরীরে জমা হয়ে থাকে না, অতিরিক্ত প্রস্রাবের সাথে শরীর থেকে বেরিয়ে যায়।

ভিটামিন ‘ই’
ভিটামিন ‘ই’ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে আর ঝিল্লির ওপরে জমা হয়। যার কারণে এটিকে প্যারক্সাইডসের ক্রিয়া থেকে রক্ষা করে। অক্সিজেনের বিষাক্ত প্রভাবও আটকে দেয়। এটি অক্সিজেন মুক্তকণাগুলোকে মজবুত করে শরীরের বিভিন্ন রোগের সাথে লড়ার শক্তি প্রদান করে আর হৃদরোগ থেকেও সুরক্ষা দেয়। ভিটামিন ‘ই’ গম, অঙ্কুরিত আনাজ, গোটা আনাজ, সালাদ ইত্যাদিতে পাওয়া যায়।

লেখক : অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, করোনারি আর্টারি ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড রিগ্রেশন সিএডিপিআর সেন্টার, ৫৭/১৫ পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা। ফোন : ০১৯২১৮৪৯৬৯৯

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.