পাকিস্তানকে দূরে ঠেলে দেয়া কি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব?

হাসান শরীফ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই তার নতুন আফগান-নীতি ঘোষণা করেছিলেন। ২১ আগস্ট আমেরিকান জনগণের উদ্দেশে ভাষণদানের সময় কিভাবে আফগানিস্তানে লড়াই করবেন তা নিয়ে কথা না বলে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিষোদগার উগড়ে দিলেন। পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেয়, তারা যদি এই নীতি না বদলায় তবে দেখে নেয়া হবে। বেশ বড় ধরনের হুমকিই ছিল এটা।
ট্রাম্পের বক্তৃতায় ভারতকে গুরুত্ব দেয়ার কথাও বলা হয়েছিল। আফগানিস্তানে তিনি ভারতকে আরো বেশি সম্পৃক্ত হতে বলেন। মনে হচ্ছিল, তিনি এই অঞ্চলের সর্দারি ভারতকে দিয়ে দিয়েছেন। আর তার অর্থ হলোÑ পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয়।
এরপর নানা ধরনের কথা ওঠে। পাকিস্তান কী করবে এই প্রশ্নটি বারবার উচ্চারিত হতে থাকে।
কিন্তু এখন? পাকিস্তান ওই হুমকির মুখে নতজানু হয়নি। বরং মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই সমীকরণ বদলে গেছে। ট্রাম্পের ওই ঘোষণার পর পাকিস্তান এক পা এগিয়ে যায়। প্রথম প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদ দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যালিস ওয়েলসের পরিকল্পিত সফরটি বাতিল করে দেয়। তারপর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর যুক্তরাষ্ট্র সফরও বাতিল করা হয়।
এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে শান্ত করার প্রথম উদ্যোগটি গ্রহণ করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন। তিনি ওয়াশিংটনে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আফগান-কৌশলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পন্থা অবলম্বনের ওপর জোর দেয়ার কথা বলেন। তিনি পাকিস্তানের দিকে যেসব আক্রমণ হচ্ছে, সেজন্য অনেকাংশে মিডিয়া দায়ী বলেও অভিযোগ করেন।
এর পরের বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নাসের জানজুয়া এবং পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড হেলের মধ্যে এক সভার অবাক করা খবর প্রকাশিত হয়। ওই বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হেল তার দেশের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেই বক্তৃতার অনেকটাই আক্ষরিকভাবেই প্রত্যাহার করে নেন।
হেল এমনকি পাকিস্তানি স্পর্শকাতরতা সম্পর্কে আশ্বস্ত করে কিছু নতুন মাত্রাও প্রকাশ করেন। খবরে প্রকাশ তিনি বলেছেন :
ট্রাম্প আফগানিস্তানে কেবল সামরিক সমাধানের কথা বলেননি কিংবা পাকিস্তানকে দোষী সাব্যস্তও করেননি। তিনি এমনকি পাকিস্তানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিবাদে জড়িয়ে পড়ার দূরতম আশঙ্কাও নাকচ করে দেন।
ট্রাম্প প্রশাসন গ্রহণ করে নিয়েছে, আফগানিস্তানে শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তিতে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। শান্তিপ্রক্রিয়া শুরু করার জন্য ওয়াশিংটন আশা করছে ‘কোয়াড্রিলেটারাল কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ (আফগানিস্তান, পাকিস্তান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র) এবং ‘সিক্স-প্লাস-ওয়ান প্রসেস’ (আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, ইরান, রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র) আবার সক্রিয় হবে।
আফগানিস্তানে ভারতের ভূমিকা নিয়ে পাকিস্তানের স্পর্শকাতরতার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসন অবগত রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন ভারতের দৃশ্যমান ভূমিকা কামনা করে কেবল অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে।
ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা পালন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠক সম্পর্কে পাকিস্তানি বক্তব্য অনুযায়ী জানজুয়া ছিলেন কঠোর ভূমিকায় এবং হেল ছিলেন রক্ষণাত্মক অবস্থানে।
গত সপ্তাহে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ এবং সিনেটে পাস হওয়া একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত নমনীয় হতে বাধ্য করে বলে মনে হচ্ছে। তাতে আরো অনেক কিছুর সাথে পাকিস্তান হয়ে আফগানিস্তানে যাওয়া মার্কিন বাহিনীর সরবরাহ রুটগুলো বন্ধ করে দেয়ার দাবি জানানো হয়।
আর্থিক ও কৌশলগত উভয় কারণেই পাকিস্তানি ট্রানজিট রুটগুলোর জন্য পেন্টাগন ব্যাপকভাবে পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীল। যেকোনো ধরনের আমেরিকান ‘বৃদ্ধি’র অর্থ হলো রুটগুলো খোলা রাখার জন্য পাকিস্তানের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি।
পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব ট্রাম্পের ওই হুমকি কতটা গুরুত্বসহকারে নিয়েছে সেটা বিতর্কের বিষয়। তারা জানে, আফগানিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকায় পাকিস্তানের ওপর কঠোর অবস্থান নেয়ার মতো অবস্থায় নেই যুক্তরাষ্ট্র। পাকিস্তান ভালোমতোই বুঝতে পারে, মার্কিন শ্রোতাদের সামনে ট্রাম্প ওই দিন আরেকটি ফাঁকা বুলি আউড়িয়েছেন। ফলে সমীকরণ বদলে গেছে। পাকিস্তানকে আবার কাছে টেনে নেয়ার ইঙ্গিত হিসেবে বিপুল সামরিক সহযোগিতার ঘোষণাও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হ

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.