যেখানে বাঘের ভয়

মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন

আবগারি করের নামে ব্যাংকে রাখা টাকা কেটে নেয়া হবেÑ এ খবর শোনামাত্র গেদু চাচার বুকে-পিঠে খিল ধরার অবস্থা। অতি কষ্টে জমানো টাকা তিনি আর ব্যাংকে রাখতে নারাজ। ঈদের সময় নিজের টাকা নিজের কাছে রাখাই নিরাপদ। সুতরাং তিনি ব্যাংকে জমা রাখা উঠিয়ে আনলেন এবং ছাড়লেন স্বস্তির এক নিঃশ্বাস। এক চিন্তা অস্ত গেল, আরেক চিন্তা উদয় হলো। গত বছর মাটির ব্যাংকে তিনি পাঁচ টাকার একটি কয়েন রেখেছিলেন। কিন্তু তিন দিন পর দেখেন টাকা উধাও। কোন বাঁদর ছেলে কয়েনটা আবগারি কর হিসেবে মাইনাস করে ফেলেছে। সুতরাং মাটির ব্যাংকে টাকা রাখার চিন্তা তিনি বাদ দিলেন। গেদু চাচা ঘন ঘন চোখ মিটমিটালেন। তার বিশ্বাস ঘন ঘন চোখ মিটমিটালে মাথায় বুদ্ধি আসে। অবশেষে তিনি চাচীর শাড়ি কেটে প্রমাণ সাইজের থলে বানালেন। সেই থলেতে টাকা ভরে কোমরে বেঁধে রাখলেন। দিনে কোমরে বেঁধে টাকা রাখা গেলেও রাতে ভীষণ রিস্কি মনে করলেন গেদু চাচা, কারণ বউয়ের দুই চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি এই টাকাগুলো জমিয়েছেন। এখন বউ জানতে পারলে সাড়ে সর্বনাশ। তিনি বুুদ্ধি করে বেড়ার সাথে খামের চিপায় টাকাগুলো গুঁজে রাখলেন। এরপর তিনি শান্তিতে ঘুমাতে গেলেন। মধ্য রাতে ইঁদুরের কুটকুট শব্দে গেদু চাচা লাফ দিয়ে উঠলেন। তার দরফর শব্দে বউয়ের ঘুমও ভেঙে গেল। পাছে বউ টের পেয়ে যায়, এই ভয়ে তিনি আবারো শুয়ে পড়লেন। গেদু চাচা বালিশ থেকে কান উঁচিয়ে শুনছেন ইঁদুরের কুটকুট শব্দ আর ভাবছেন আহারে! এত দিনের কষ্টের ফসল ইঁদুরে বোধহয় কেটে বিনাশ করে দিচ্ছে। চিন্তায় সারা রাত গেদু চাচার চোখে ঘুম এলো না। গোসল করতে পুকুরে নামলেন গেদু চাচা। টাকার থলে কোথায় রাখা যায় এই চিন্তায় তিনি চোখ বড় বড় করলেন। ঘাড় উঁচু করে পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ পর্যবেক্ষণ করলেন কোথাও মানুষজন দেখা যায় কি না; কারণ তিনটা ডুব দিতে যে সময় লাগবে এই সময়ে তার টাকার থলে নিয়ে পালানো কোনো ব্যাপারই না। তিনি কৌশল করে ঝোপের ভেতর থলে লুকালেন কিন্তু তার আগে তিনবার ডানে বামে মিটমিট করে তাকালেন। কোমর পানিতে নেমে তিনি ডুব দিতে যাবেন, এমন সময় তার মনে পড়ে গেল সেই তাত্ত্বিক গান-ঘাটে ডুব দিও না স্নান করিও ওরে মন আমার, ডুব দিলে হারিয়ে যাবে জনমের কামাই...। সর্বনাশ! গেদু চাচা জিহ্বায় কামড় বসালেন-কোন আক্কেলে আমি ডুব দিতে যাব। অতএব গলা পর্যন্ত ভিজিয়েই তিনি গোসল সারলেন। বিকেল বেলা ঈদ শপিংয়ে যাচ্ছেন গেদু চাচা। হঠাৎ তিন ছেমড়া পেছন থেকে ডাক দিলো। গেদু চাচা অতি সাবধান। পেছন ফিরে তাকালেন না। ছেমড়া তিনটা গেদু চাচার সাথেই হাঁটছে। গেদু চাচা ভাবলেন-লক্ষণ খারাপ। তার শরীর দিয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। ঝরবেই না কেন, ঈদ বাজার বলে কথা। এদের মতো ছেমড়ারাই তো পকেট মারে, ছিনতাই করে। এই মুহূর্তে ঠেক দিলে গেদু চাচা কী-ই বা করতে পারবেন। তিনি ফ্যালফ্যাল করে দেখলেন টাকার পজিশন ঠিক আছে কি না। এই যাত্রায় তিনি ছিনতাইকারীদের হাত থেকে রক্ষা পেলেন বিনিময়ে তাকে জল বিয়োগের ভান করে আধা ঘণ্টা বসে থাকতে হলো। বাজারে গেদু চাচা টুলে বসে চা খাচ্ছেন। কোথেকে যেন দুই তিন তরুণ তার দুই পাশে শরীর ঘেঁষে বসল। গেদু চাচার বুকে খট করে শব্দ হলো, এ যেন সতর্ক বার্তা। এই বুঝি তার টাকার থলেটা গেল। তিনি বিপদ টের পেয়ে আধা কাপ চা রেখেই চলে এলেন আর মনে মনে বলতে লাগলেন-টাকার নিরাপত্তার জন্য অর্ধেক কাপ চা রেখে আসতে হলো। পাঁচটি টাকায় গেল জলে। তিনি বউয়ের জন্য পাঁচ শত টাকা দিয়ে একটি শাড়ি কিনে বাকি টাকা নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। পথিমধ্যে মোটা-কালো গোঁফওয়ালা এক লোক পথ আগলে দাঁড়াল। বলল, ‘চাচা, আপনি বাজার করে এলেন। আমাগো করা লাগবো না?’ গেদু চাচার গলা শুকিয়ে এলো, বললেন, ‘মানে?’ লোকটি এবার একটি ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে বলল, ‘আপনি কী হাতের ময়লা মানে আপনার কাছে যে টাকার থলেটা আছে সেটি দেবেন, নাকি জীবন দেবেন? গেদু চাচা টাকার থলেটা লোকটার কাছে সঁপে দিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। মনে মনে বললেন, ‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত হয়।’

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.