গাছ লাগানো সওয়াবের কাজ
গাছ লাগানো সওয়াবের কাজ

গাছ লাগানো সওয়াবের কাজ

মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ

প্রাণিকুলের পরম বন্ধু গাছ। গাছ না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণিকুল থাকবে না। প্রাণিকুল বেঁচে থাকার প্রধান ও মূল উপাদান অক্সিজেন। সেই অক্সিজেন আসে গাছপালা থেকে। মানুষ কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিত্যাগ করে যা বিষাক্ত পদার্থ। এই বিষাক্ত পদার্থ পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ওই ক্ষতিকর পদার্থ গাছ গ্রহণ করে। গাছের সবুজ পাতার ক্লোরোফিল এবং সূর্যের আলো মিলে এক ধরনের রন্ধনপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে অক্সিজেনে পরিণত করা হয়। পৃথিবীর কোথায় কার্বন ডাই-অক্সাইডকে অক্সিজেন করার কারখানা নেই। এ ব্যবস্থা আল্লাহ পাক তাঁর আপন কুদরতে প্রাণিকুলের জন্য ঠিক করে রেখেছেন। গাছ পৃথিবীর স্থায়িত্ব ও প্রাণিকুলের জীবনের নিরাপত্তার মূর্তপ্রতীক। বিষয়টি অনুধাবন করেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যদি তুমি নিশ্চিতভাবে জানো যে কালই কিয়ামত (ধ্বংসযোগ্য) হবে; তবু আজই গাছ লাগাও। তিনি জানতেন, মানুষকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টিজগতের এত আয়োজন।

আল্লাহ পাক এ দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন সূক্ষ্ম পরিমাপ করে। কোথায়, কী, কতটুকু দরকার তা তিনিই ভালো জানেন। সে অনুযায়ীই তিনি পৃথিবীর সবকিছু পরিমাণ মতো সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর জন্য কি পরিমাণ পাহাড় দরকার, কতটুকু বনজসম্পদ দরকার সে হিসাব করে তিনি পাহাড় ও বনজসম্পদ সৃষ্টি করেছেন। তাঁর সৃষ্টি কর্মের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি, অসামঞ্জস্য নেই। আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমার চোখ আবার ফেরাও, কোনো অসঙ্গতি দেখতে পাও কি? তুমি বারবার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখো, তোমার দৃষ্টি ক্লান্ত ও ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসবে। (সূরা মুলক ৩-৪) কিন্তু খোদায়ি সেই সিস্টেমের উপর আমরা হাত দিয়েছি। আমরা গাছ কাটতে কাটতে বন উজাড় করেছি। ফলে নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই করেছি।

পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষার জন্য আল্লাহ পাক সমুদ্র-মহাসমুদ্র সৃষ্টি করেছেন। তিনি জানেন, সমুদ্র যেখানে আছে সেখানে ঘূর্ণিঝড়ও হবে। সেই ঘূর্ণিঝড় থেকে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী যাতে নিরাপদ থাকতে পারে, সে জন্য সমুদ্র পাড়ে আল্লাহ পাক নিজ কুদরতে বনজসম্পদের ব্যবস্থা করছেন। ব্যবস্থা করেছেন বিশাল বিশাল পাহাড় পর্বতের। একদিকে সমুদ্রের সীমাহীন গভীরতা, অন্য দিকে এর পাড়েই গগনচুম্বী পর্বতমালা। এসবই তাঁর কুদরত। সমুদ্রের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় যখন প্রচণ্ড বেগে উপকূলে আঘাত হানবে, তখন মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী নিরাপদ থাকা দরকার। আল্লাহ পাকের পরিকল্পনা ছিল সম্ভবত এ রকম যে, ঘূর্ণিঝড়ের প্রথম আঘাতটা ফেরাবে ওই বনের সুউচ্চ গাছ বা সুউচ্চ পাহাড়গুলো। মানুষগুলো সবাই নিরাপদ থাকবে।

কিন্তু আমরা খোদায়ি সেই সিস্টেমের উপর হস্তক্ষেপ করেছি। বনজসম্পদ কাটতে কাটতে একবারের উপকূল পর্যন্ত উজাড় করেছি। যে ঘূর্ণিঝড় প্রথম আঘাত হানার কথা ছিল উপকূলবর্তী বনের সুউচ্চ গাছকে, সে আঘাত হানছে এখন মানুষের উপর। ফলে ক্ষয়ক্ষতি যা হওয়ার তা মানুষের উপর দিয়ে হয়। বিশেষ করে নিরপরাধ-নিষ্পাপ শিশু ও নিরীহ মহিলারা এ ধ্বংসলীলার প্রধান শিকার হয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাছ কাটতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন, অগত্যা একটি গাছ যদি কাটতে হয় তাহলে যেন দুইটি গাছ রোপন করা হয়। তাঁর দর্শন ছিল একটি গাছ যদি মরেও যায়, তাহলে অন্তত আরেকটি গাছ বেঁচে থাকবে। পরিবেশের উপর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না। সে কারণে রাসূল সা: বলেছেন, বিনা কারণে গাছের একটি পাতাও ছেড়া যাবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধে যখন কোনো বাহিনী পাঠাতেন, তখন তিনি তাদের উদ্দেশে বলতেন, ‘সাবধান! বিজিত অঞ্চলের কোনো বৃক্ষ কর্তন করা যাবে না।’

পাহাড় কেটে আমরা নিজেদের সর্বনাশ করেছি। উপকূলবর্তী পাহাড়গুলো আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন আমাদের ঘূর্ণিঝড় থেকে হেফাজত করতে। সেই পাহাড় আমরা নিজেরা কেটে সমতল করেছি। ফলে ঘূর্ণিঝড় এখন পাহাড়-পর্বতকে না পেয়ে মানুষকে আঘাত করে। লোকসান গুনতে হয় মানুষকেই। সেজন্য আল্লাহ পাক বলেন, জলে-স্থলে যে মহাবিপর্যয় নেমে এসেছে, তা মানুষের কারণেই হয়েছে। (সূরা রুম- ৪২)

পাহাড় আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন পৃথিবী নামক গ্রহের ভারসাম্য রক্ষার জন্য। মহাশূন্যে ভাসমান এই পৃথিবী যাতে হেলেদুলে না যায় সে জন্য আল্লাহ পাক পৃথিবীকে পেরেক মেরে দিয়েছেন। সেই পেরেক হলো পাহাড় ও পর্বতমালা। আমরা সেই পাহাড় কেটেছি, পর্বতও কেটেছি। খোদায়ি সিস্টেমের শাশ্বত বিধানকে লঙ্ঘন করে নির্বিচারে পাহাড় কেটেছি। প্রকৃতিও যেন তার সহ্যক্ষমতার সমাপ্তি টেনে আমাদের উপর প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেছে। পাহাড় ধস হচ্ছে। নিরপরাধ আবালবৃদ্ধবণিতা তার শিকার হচ্ছে। সুতরাং পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। নতুবা ভয়াবহ বিপর্যয়ে নিজেদের সমর্পণের জন্য জানমাল নিয়ে পরবর্তীতে প্রস্তুত থাকতে হবে। সম্ভবত সেদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ পাক বলেন, ‘পৃথিবী সুন্দর ও পরিকল্পিত করে সৃষ্টি করার পর সেখানে নিজেরা হস্তক্ষেপ করে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।’
আজকে উন্নত বিশ্বের কলকারখানার সৃষ্ট কার্বন, পৃথিবীকে বসবাসের প্রায় অযোগ্য করেছে। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে উষ্ণতা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। মেরুঅঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমির দেশগুলো সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।

পৃথিবীর অনেক প্রাণী এ অবস্থার সাথে নিজেদেরকে খাপ খাওয়াতে না পরে বিলুপ্ত হয়েছে এবং হচ্ছে। দিন দিন পরিবেশ পরিবর্তন হচ্ছে। যখন শীত পড়ার কথা তখন গরম পড়ছে বা শীত সে পরিমাণে পড়ছে না। যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা না তখন বৃষ্টি হচ্ছে। বহু পরিমাণে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে চলে আসছে। সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মিকে ফিল্টারিং করার জন্য যে ওজন স্তর রয়েছে, অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের ফলে ওজনস্তরের ফিল্টার বা ছাঁকুনি পাতলা হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ফুটো বা ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে মাত্রাতিরিক্ত চলে আসছে। মাত্রাতিরিক্ত বেগুনি রশ্মি মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষজ্ঞদের মতে, সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির কারণে ক্যান্সার হয়। আজকে ক্যান্সারের মতো যে মহামারি পৃথিবীময় দেখা দিয়েছে, তার অন্যতম কারণ হলো সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি।

উপরি উক্ত সমস্যা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো বেশি বেশি গাছ লাগানো। গাছই পারে অতিরিক্ত কার্বনকে ব্যবহার করে পরিবেশ রক্ষা করতে। তা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তাই আমাদের বেশি বেশি গাছ লাগানো উচিত। যেখানে জায়গা পাওয়া যায়, সেখানেই গাছ লাগাতে হবে। রাস্তাঘাট, হাট-মাঠ, বাড়ির আঙ্গিনা, ক্ষেতের আইল, পুকুর পাড় সর্বত্রই গাছ লাগাতে হবে। এক কথায় এক ইঞ্চি ভূমিও অনাবাদি রাখা যাবে না। প্রত্যকের অন্তত একটি করে গাছ লাগানো উচিত। এখন বর্ষা, হচ্ছে বৃষ্টি। দেশের সব জায়গার মাটি এখন গাছ লাগানোর উপযোগী। গাছ লাগানোর এটাই উপযুক্ত সময়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাছ লাগানোর প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো একজন মুসলিম যদি একটি গাছ লাগায় বা ফসল উৎপাদন করে; পরে তা যদি কোনো মানুষ বা কোনো পশুপাখি আহার করে, তবে তা অবশ্যই ওই ব্যক্তির জন্য সদকা হয়ে যায়।’

আমাদের জীবন-জীবিকার নিত্যদিনের বন্ধু গাছের ব্যাপক উৎপাদন করে প্রাকৃতিক বিপর্যয় রোধ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। কার্বনমুক্ত সবুজ নৈসর্গিক পৃথিবী বিনির্মাণে আসুন, ‘প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ লাগাই এবং গাছ কাটা বন্ধ করি। আসুন নিজে বাঁচি এবং নিরাপদ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ি।

লেখক : প্রভাষক, সরকারি শহীদ আসাদ কলেজ, নরসিংদী

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.