শহীদ কাদরীর আধুনিকতাবোধ ও কবিতাচিন্তা

সায়মন স্বপন

জীবনের চুয়াত্তরটি বসন্ত পার করে অজানার পথে পাড়ি জমিয়েছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত ঋদ্ধ কবি শহীদ কাদরী। অসুস্থতাজনিত কারণে ২৮ আগস্ট, ২০১৬ তারিখে নিউ ইয়র্কের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন। কিন্তু সাতচল্লিশে দেশভাগের পর দশ বছর বয়সে পারিবারিক কারণে পরিবারের সাথে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৩ সালে তিনি কবিতা লেখার মধ্য দিয়ে লেখালেখির যাত্রা শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উত্তরাধিকার’ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালে তিনি জার্মানে চলে যান। পরবর্তীতে লন্ডন এবং ১৯৮৫ সালে স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কে বসবাস শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলো হলো : উত্তরাধিকার (১৯৬৭), তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা (১৯৭৪), কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই (১৯৭৮), আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও (২০০৯)। ১৯৭৩ সালে শহীদ কাদরীকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ২০১১ সালে একুশে পদক দেয়া হয়।
বাংলা কবিতায় আধুনিকতার জলছাপ এঁকেছেন শহীদ কাদরী। আধুনিক জীবনযাপনের সাদৃশ্য কিংবা বৈসাদৃশ্য তাঁর কবিতায় তুলে ধরা হয়েছে নিপুণভাবে। ভিন্নমাত্রার কিছু দ্যোতনা তৈরি হয়েছে তাঁর কবিতায়। তিনি কবিতায় সৃষ্টিশীল কিছু চিন্তা বা দর্শনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমাদের দৈনন্দিন বসবাসের সাথে। নাগরিক জীবনে টানাপড়েনের এক ছায়াপথ তৈরি হয়েছে তাঁর বেশ কিছু কবিতায়। এজন্য শহুরে মানুষ থেকে শুরু করে মেঠোপথের মানুষগুলোর মাঝে তিনি ছিলেন এক প্রতিষ্ঠিত নায়ক। তিনি চেষ্টা করেছেন নাগরিক-জীবনের দৈনন্দিন ব্যথা-বেদনা-হাসি-কান্নার অভিজ্ঞতা দিয়ে কবিতার রসে সিক্ত করতে। প্রতিদিনের নাগরিক-জীবনকে আলাদা একটি মাত্রায় বা বাস্তবিক ছকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। যার ফলে তিনি পেয়েছেন যশ ও খ্যাতি। তাঁর কবিতার ভাষাশৈলী এত বেশি তীক্ষè ছিল যে, বেশির ভাগ কবিতায় ফুটে উঠত ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা। অর্থাৎ আধুনিকতা ছিল তাঁর কবিতার অন্যতম উপাদেয় বিষয়। তাঁর কবিতার বক্তব্য হয়ে উঠেছে ধারালো। সমসাময়িক কবিতায় সমকালীন কবি যে সব কথা বলার চেষ্টা করছেন সে সব প্রয়াস তাঁর কবিতায়ও ফুটে উঠেছে। কবি নিজ মাতৃভূমি ছেড়েছেন ঠিকই, কিন্তু কবিতাকে ছাড়তে পারেননি ক্ষণিকের জন্য। তাই লিখেছেন মা, মাটি ও দেশকে নিয়েও। দূরে থেকেও দেশের মানুষের কাছাকাছি থেকেছেন অহর্নিশ। ভালোবাসা কুড়িয়েছেন দুই হাত ভরে।
তিনি আড্ডা দিতে ভালোবাসতেন কিন্তু নিজের জগৎটাকে সবসময় আড়াল করে রাখতে চাইতেন। এক কথায় তিনি ছিলেন প্রচারবিমুখ। প্রবাসে বসে এ দেশের সমকালীন লেখকদের সম্পর্কে জানতে বেশি উৎসুক ছিলেন। সমকালীন কবিতার জন্য তিনি নিরলস পরিশ্রম করেছেন। যার ফলে আধুনিক মননের জলছাপ রয়ে যায় তাঁর কবিতায়। কবিতায় জীবনবোধের দর্শনে তিনি ছিলেন অন্যতম সৈনিক। নিজেকে ভেঙেছেন একের পর এক, গড়েছেন বারবার নিজেকে। নিজের ভেতর আর একজন মানুষকে খুঁজেছেন দিনের পর দিন। কখনো পেয়েছেন আবার কখনো হারিয়েছেন ভিন্ন ভুবনে। প্রবাসে বসেও স্বদেশের প্রতি যে ভালোবাসা তাঁর কবিতায় প্রকাশ করেছেন, তা শুধু নিছক কবিতার শরীরের জন্য নয়; কিছু দায়বদ্ধতা থেকেও মানুষের মুখ হয়ে কবিতা লিখেছেন একর পর এক। চলতে পথে হোঁচট আর ব্যর্থতাও ছিল তাঁর সাহিত্যজীবনে। কিন্তু সবকিছুর সীমা পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন মানুষের ভালোবাসার দোরগোড়ায়।
অধুনাতম কবিতার রস খুঁজে পাওয়া যায় ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ তে। আধুনিকতার কাব্যালংকার, রস কিংবা রূপ যার প্রতিটি বৃত্ত এই কাব্যগ্রন্থে প্রতীয়মান। এ ছাড়াও তিনি ‘সঙ্গতি’ কবিতায় বলেছেন,
একাকী পথিক ফিরে যাবে তার ঘরে
শূন্য হাঁড়ির গহ্বরে অবিরত
শাদা ভাত ঠিক উঠবেই ফুটে তারাপুঞ্জের মতো,
পুরোনো গানের বিস্মৃত-কথা ফিরবে তোমার স্বরে
প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না...।
এখানে কবিতায় কবি এক অতৃপ্ত বেদনার কথা তুলে ধরেছেন। জলহীন এক কান্নার ক্লেদ রয়েছে তাঁর এই কবিতায়। কান্নারও যে রকমফের থাকে তা তিনি আমাদেরকে বুঝিয়েছেন। প্রেম ও বিদ্রোহের উচ্চারণও কবিকে অন্য স্তরে পৌঁছে দিয়েছে। তেমনি তিনি লিখেছেন,
রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে
স্বাধীনতা দিবসের সাঁজোয়া বাহিনী
রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে
রেসকোর্সের কাঁটাতার, কারফিউ, ১৪৪ ধারা
রাষ্ট্র বললেই মনে পড়ে
ধাবমান খাকি জিপের পিছনে মন্ত্রীর কালো গাড়ি
কাঠগড়া গরাদের সারি সারি খোপ
কাতারে কাতারে রাজবন্দী
রাষ্ট্র মানেই লেফট রাইট লেফট।
তাঁর কবিতায় শরীরে শিহরণ জাগানোর ক্ষমতা রাখে। প্রেরণা পাওয়া যায় তাঁর কবিতায় ভিন্ন মাত্রায়। ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ কাব্যগ্রন্থে ‘কোনো ক্রন্দন তৈরী হয় না’ কবিতায় তিনি উল্লেখ করেছেন,
একটি মাছের অবসান ঘটে চিকন বটিতে,
রাত্রির উঠোনে তার আঁশ জ্যোৎস্নার মতো
হেলায় ফেলায় পড়ে থাকে
কোনো ক্রন্দন তৈরি হয় না

ফুটপাথে শুয়ে থাকা ন্যাংটো ভিখিরির নাভিমূলে
হীরার কৌটার মতো টলটল করছে শিশির
এবং পাখির প্রস্রাব।
কবিতায় তিনি সাধারণের সাথে অসাধারণের সংযোগ তৈরি করেছেন। নৈমিত্তিক বিষাদগুলো আমাদের চোখে পড়ে না, অথচ এই বিষাদগুলোই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে নিবিড়ভাবে মিশে আছে। সামান্য একটি মাছের মৃত্যুতে যার হৃদয় কেঁদে ওঠে যেখানে আমরা কেউই সেটি ভেবেও দেখিনি।
সত্যিকার অর্থে শহীদ কাদরী কম বক্তার মানুষ, লিখেছেনও কম। তিনি অল্প কথায় মানুষের কাছাকাছি পৌঁছেছেন। এই কম লেখা নিয়ে মোটেও তিনি আফসোস করেননি বরং দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন সমকালীন কবিতার উত্তরোত্তর নিয়ে, নাগরিক জীবনের হাহাকার নিয়ে। আমরা স্রোতহীন ধারার যে সময়ে অবস্থান করছি তা বড়ই সঙ্কটপূর্ণ। কবিতার সঙ্কটময় স্তর থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন কবিতার সাথে প্রেম। কবিতা লেখার জন্য কবিতা লেখা হলে সে কবিতা বেশিদিন বেঁচে থাকে না। কবিতাকে বাঁচাতে কবিতার শিকড়ের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে হবে। শহীদ কাদরী হয়তোবা তেমনটিই ভেবেছিলেন যার কারণে কবিতার সান্নিধ্যে তিনি যেতে পেরেছেন।
কবি আমাদের ভিতরের নাগরিক-পরিভাষাকে বিশ্বের দরোজায় তুলে ধরেছেন এক বুক ভালোবাসা নিয়ে। নগর সভ্যতার শোষণ, আর্তনাদ, মিথ্যাচার, বিষটোপে মোড়া ভয়ঙ্কর সুন্দরের হাতছানি সবকিছুই কবিকে আহত করে। নগরের বৃষ্টিস্নাত কোনো কিশোরীর ঘুঙুরের শব্দে ভেঙে যাক আমাদের দিকভ্রম, কেটে যাক কুয়াশার অদৃশ্য চাদর- এমনই আশাবাদী কবি। কবি নিঃসঙ্গ-প্রবাসজীবনের কোনো এক অস্থিতিশীল মুহূর্তে ভীষণ দহনে দগ্ধ ছিলেন। কবি তাই ‘জানালা থেকে’ কবিতায় অকপটে স্বীকার করেন,
আমার জানালা থেকে
নিরুপায় একজোড়া আহত পাখির মতো চোখ
রাত্রিভর দেখবে শুধু দূর দর-দালানের পরে
আবছা মাঠের নিঃশব্দে ছিন্ন করে জোনাকির জাল
ছুটে গেল যেন এক ত্রস্ত ভীত ঘোড়ার কঙ্কাল!
কবি বরাবরই সাহসী উচ্চারণে বিশ্বাসী। এই ক্লেদের মাঝেও আছে দহনবেলার এক উচ্চারণ। কবি শুধু সুখের অনুভূতিগুলোই ভাগ করবে তা নয়, যত জরা-দুঃখ-কান্না সবই তিনি ভাগ করবেন পাঠক তথা সাধারণের জন্য। তবেই তিনি সত্যিকার অর্থে কবি হয়ে উঠবেন। শহীদ কাদরী কখনো কখনো তাঁর কবিতায় বিদ্রুপতার চাবুক ছুঁড়ে দিয়েছেন। যে শহরে শুধু পকেটে ভালোবাসা নিয়ে পথ চললেই হয় না দরকার হয় কাগজি-মুদ্রাও। এমন বাস্তবতা ফুটে উঠেছে তাঁর কবিতায়। কবি সাহিত্যজীবনে প্রবেশ করেছেন খালি হাতে কিন্তু তিনি ফিরেছেন যশ-খ্যাতি-সম্মান-স্বীকৃতি নিয়ে। নিংসঙ্গতাকে নিয়ে লেখার পাশাপাশি লিখেছেন স্বাধীনতা, দেশ ও মানুষের কথা। একটু একটু করে বলতে চেয়েছেন নগরের মানুষের মুখের নাগরিক-কথা। নগরের মানুষের হিসেবি জীবনের প্রাত্যহিক জীবনযাপন কবিকে চিন্তায় ফেলে দেয়। নানা জটিলতা কিংবা সরলতা সব কিছুই কবিকে ভাবায়।
নগরের মানুষের মুখের কৃত্রিম হাসির পেছনে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলোকে টেনে এনেছেন তাঁর কবিতায়। তাদের সেই কষ্টগুলোর সমাধান না করতে পারলেও সমাজের সামনে যা তুলে ধরেছেন তা কম কিসের! এভাবেই তিনি নাগরিক জীবনের আপামর নাগরিক-কবি হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন নাগরিক জীবনের রূপকার।
একইভাবে তাঁর কবিতায় গ্রামীণজীবনের সহজ-সরলতাও খুঁজে পাওয়া যায় না; যেটা খুঁজে পাওয়া তা হলো বাস্তবতার কশাঘাতে জর্জরিত এক বীভৎস রূপ। যেখানে স্বার্থপরতা বিদ্যমান। গ্রামের সহজ প্রকৃতির আড়ালেও যে এমন রূপ থাকতে পারে তিনি তা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এজন্য শহীদ কাদরীর কবিতা স্বতন্ত্রতার দাবি রাখে। তবে তিনি যে শুধু মুদ্রার একপাশের কঠিন রূপ তুলে ধরেছেন তা নয়, অন্যপিঠের কমলতাও তুলে ধরেছেন এক অনবদ্য দৃষ্টিভঙ্গিতে। গ্রামের শীতল বাতাসেরও বন্দনা করেছেন তাঁর কবিতায়।
শহীদ কাদরীর কবিতায় যে কাব্যশৈলী বা কাব্যভঙ্গি দেখা যায় তা নাগরিক জীবনের একপ্রস্থ মলাট। যে মলাটের ভেতর শুধু দুঃখ নয়, মিশে থাকে সাদাকালো জীবনের ঠোঁট ফুলানো অভিমান আর সাদা সাদা দাঁতের হাসি।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.