সুকুমার রায় ‘তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম’

ড. আশরাফ পিন্টু

উদ্ভট কবিতা হলো একধরনের ব্যঙ্গাত্মক কবিতা; যার সুর হালকা ও লঘু। এই শ্রেণীর কবিতা সাধারণত যুক্তিহীন হয়ে থাকে; যার মধ্যে সুস্থির চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় না। ইংরেজি সাহিত্যের ‘ননসেন্স ভার্স’ বা ‘ননসেন্স রাইম’কে বাংলা উদ্ভট কবিতার সমার্থক হিসেবে দাঁড় করানো যায়। সংস্কৃত-সাহিত্যেও উদ্ভট কবিতার সাক্ষাৎ মেলে। পূর্ণচন্দ্র দে (১৮৫৭-১৯৪৬) প্রথম সংস্কৃত উদ্ভট কবিতা সংগ্রহ করে বাংলায় অনুবাদ করেন। বাংলা সাহিত্যে সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) সর্বপ্রথম উদ্ভট কবিতা রচনা করেন।উদ্ভট কবিতা হলো একধরনের ব্যঙ্গাত্মক কবিতা; যার সুর হালকা ও লঘু। এই শ্রেণীর কবিতা সাধারণত যুক্তিহীন হয়ে থাকে; যার মধ্যে সুস্থির চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায় না। ইংরেজি সাহিত্যের ‘ননসেন্স ভার্স’ বা ‘ননসেন্স রাইম’কে বাংলা উদ্ভট কবিতার সমার্থক হিসেবে দাঁড় করানো যায়। সংস্কৃত-সাহিত্যেও উদ্ভট কবিতার সাক্ষাৎ মেলে। পূর্ণচন্দ্র দে (১৮৫৭-১৯৪৬) প্রথম সংস্কৃত উদ্ভট কবিতা সংগ্রহ করে বাংলায় অনুবাদ করেন। বাংলা সাহিত্যে সুকুমার রায় (১৮৮৭-১৯২৩) সর্বপ্রথম উদ্ভট কবিতা রচনা করেন।সুকুমার পৈতৃক নিবাস পূর্ববাংলায় (বাংলাদেশে) হলেও তার স্কুল ও কলেজজীবন কলকাতাতেই শুরু হয়। ছাত্রাবস্থায় তার দু’টি লেখা প্রকাশিত হয় শিবনাথ শাস্ত্রী প্রতিষ্ঠিত ‘মুকুল’ পত্রিকায়। কলেজ ছাড়ার কিছু দিনের মধ্যেই তিনি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে ‘ননসেন্স কাব’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই কাবের জন্য লেখা তার দু’টি নাটক ‘ঝালাপালা’ ও ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’ প্রদর্শিত হয়। পিতা উপেন্দ্র কিশোরের সম্পাদিত ‘সন্দেশ’ (১৯১৪) পত্রিকায় তার ‘আবোল তাবোল’ গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘খিচুড়ি’ প্রকাশিত হয়। এই প্রথম সুকুমার সাহিত্যে তথা বাংলা সাহিত্যে উদ্ভট প্রাণীর আবির্ভাব ঘটেÑহাঁস ছিল সজারু (ব্যাকরণ মানি না)হয়ে গেল হাঁসজারু কেমনে তা জানি না।বক কহে কচ্ছপে, ‘বাহবা কি ফুর্তি!অতিখাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি!’এখানে প্রাণী সৃষ্টি হয়েছে ভাষার কারসাজিতেÑ লেখকের নিজস্ব সন্ধির নিয়মে। এই উদ্ভট সন্ধির নিয়মেই এই কবিতাটিতে আরো দেখা যায়Ñগিরগিটিয়া, মোরগোরু, বিছাগল, সিংহরিণ, হাতিমি ইত্যাদি প্রাণিকুল। শুধু নামকরণেই উদ্ভট তা নয়, সুকুমার ছবি এঁকেও প্রাণীগুলোর চেহারা স্পষ্ট করেছেন। সুকুমার রায় তার উদ্ভটতাকে ‘খেয়াল রস’ নাম দিয়েছিলেন। উদ্ভট বা খাঁটি ননসেন্সের স্বার্থক দৃষ্টান্ত আছে তার বিভিন্ন ছড়াকবিতায়। এর মধ্যে ‘কাঠবুড়ো’, ‘গোঁফচুরি’, ‘কুমড়োপটাশ’, ‘কিম্ভুত’, ‘একুশে আইন’, ‘রামগরুড়ের ছানা’, ‘বোম্বাগড়ের রাজা’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ‘বোম্বাগড়ের রাজা’তে দেখা যায়Ñকেউ কি জানে সদাই কেন বোম্বাগড়ের রাজাÑছবির ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখে আমসত্ত্ব ভাজা?রাণীর মাথায় অষ্টপ্রহর কেন বালিশ বাঁধা?পাউরুটিতে পেরেক ঠোকেন কেন রাণীর দাদা?সুকুমার রায়ের এই উদ্ভট রস আমাদের লৌকিক ছড়াসহ পৃথিবীর সব দেশেই আছে। আমাদের লৌকিক ছড়ায় পাওয়া যায়Ñআইকম বাইকম তাড়াতাড়িযদু মাস্টার শ্বশুর বাড়ি।রেলগাড়ি ঝমাঝমপা পিছলে আলুর দম।তবে খাঁটি সাহিত্যিক ননসেন্স যেভাবে গাম্ভীর্যের মুখোশে হাসির উদ্রেক করে তা লৌকিক ছড়ায় পাওয়া যায় না। সুকুমারের উদ্ভট রস একেবারেই শিক্ষিত শহুরে মেজাজের যা তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ বয়সে ‘খাপছাড়া’ নামে একটি উদ্ভট ছড়ার গ্রন্থ রচনা করেছিলেন কিন্তু তার ‘খাপছাড়া’ সুকুমারের উদ্ভট রসের মতো প্রাণবন্ত হয়নি। এর কারণ খাঁটি ননসেন্সের মেজাজ রবীন্দ্রনাথের ছিল না। বাংলা সাহিত্যের অগ্রজদের উদ্ভট রসের প্রভাব সুকুমারের ওপর তেমন না পড়লেও তিনি বিদেশী সাহিত্যিক এডওয়ার্ড লিয়ার ও ল্ইুস ক্যারলের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন বলা যায়। তিনি যে ক্যারলের ‘এলিস’ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এ কথা স্পষ্ট হয়Ñ তার ‘হ য ব র ল’ গ্রন্থটি পড়লে। এডওয়ার্ড লিয়ারের মতো একাধিক প্রাণীর সাক্ষাৎ মেলে সুকুমারের ছড়াগুলোতে। তবে লিয়ারের প্রাণীগুলো রূপকথার জগতের মধ্যে বিচরণ করে আর সুকুমারের ‘হুকোমুখো’র বাস কিন্তু বাংলাদেশেÑহুকোমুখো হ্যাংলা বাড়ি তার বাংলামুখে তার হাসি নেই দেখেছ?নাই তার মানে কি? কেউ তাহা জানে কি? কেউ কভু তার কাছে থেকেছ?শ্যামাদাস মামা তার আফিঙের থানাদারআর তার কেউ নেই এ ছাড়া...এমনি ‘ট্যাঁশগরু’কে অনায়াসে দেখা যায় হারুদের আপিসে, ‘কিম্ভুত’ কেঁদে মরে ‘মাঠ পাড়ে ঘাট পাড়ে’ ‘কুমড়ো পটাশ’ও নিশ্চয়ই শহরের আশেপাশে ঘোরাফেরা করে। শুধু ‘রামগরুড়’কে দেখি নিরিবিলি পরিবেশে থাকতে। তবে এ চরিত্রগুলো রূপকথা জগতের না হলেও একে ঠিক বাস্তব জগতের চরিত্রও বলা যায় না। এটা আসলে সুকুমার রায়ের একান্ত নিজস্ব একটা জগৎ; আর এ জগতের সৃষ্টিই হলো সাহিত্যিক সুকুমারের শ্রেষ্ঠ কীর্তি।সুকুমার রায়ের পিতা ছিলেন বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায়। ছেলে হলেন বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ রায় সুকুমার রায়ের কবিতায় উদ্ভট রস সম্পর্কে বলেছেন, ‘সুকুমারের হাসিতে শ্লেষ ছিল না, তবে ব্যঙ্গ ছিল। প্রয়োজনে প্রাণখোলা অট্টহাসিতে পেছপা হতেন না তিনি এবং সেটাও তার স্বভাবেরই পরিচায়ক।’সুকুমার রায় মৃত্যুবরণ করেন ১৯২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর; আর তার ‘আবোল তাবোল’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর (মৃত্যুর ৯ দিন পর)। তার শেষ গ্রন্থ ছিল ‘আবোল তাবোল’। তার ওপর যে মৃত্যুর ছায়া পড়েছিল এ গ্রন্থের একটি কবিতার শেষ পঙ্ক্তিতে সে ইঙ্গিত পাওয়া যায়Ñআদিম কালের চাঁদিম হিমতোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম।ঘনিয়ে এলো ঘুমের ঘোরগানের পালা সাঙ্গ মোর।জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেও তার কবিতায় রসিকতা বা উদ্ভট রসের সাক্ষাৎ মেলে যা অন্য কারো রচনায় দেখা যায় না। 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.