সাহিত্য মানবজীবনের পুষ্পকুমুদ

ড. মুহাম্মদ জমির হোসেন

মানুষের জীবন এক বিস্ময়কর রূপ রস দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। পৃথিবীর একজন মানুষও তার অবস্থান নিয়ে তৃপ্ত নন। কেন এবং কী? এ নিয়ে ভাবতে ভাবতেই একদিন হঠাৎ জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। মানুষ নিজের অবস্থানগত অস্তিত্বের বিন্দুবিসর্গও জানতে পারে না। চাওয়া-পাওয়া সুখ-দুঃখ খুবই আপেক্ষিক। এর ফলেই মানুষ প্রতিনিয়ত ছুটে বেড়াচ্ছে। ক্রমোন্নতির শিখরে আরোহণ করার জন্য প্রাণপণে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ কোনো প্রাপ্তিই তাকে পরিপূর্ণতা দিতে পারছে না। এক অতলান্তিক শূন্যতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সৃষ্টিকর্তা অনুরূপ বৈশিষ্ট্য দিয়েই মানুষকে গড়ে তুলেছেন। না হলে তার সাধের সৃষ্টিজগত আবাদ করতই বা কে? এখানেই মহান সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিরহস্য লুকিয়ে আছে।
তবে এ কথা অবধারিত সত্য, স্রষ্টা মানুষকে সৎ-মহৎ সৌন্দর্য আনন্দ মহীয়ান গরীয়ান ও সুষম শুভবোধ দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যা তার অন্তর্গত অভিপ্রায় ও স্বরূপপ্রকৃতি হিসেবে পরিচিত। মানুষ তারই প্রতিনিধি হিসেবে সারা জীবন নিজেকে বহন করে চলে। এর মধ্যে নানাপ্রকার বৈরীবাধা দিয়ে এ অবস্থাকে আরো মহিমান্বিত করা হয়। বিশেষত, মানবসমাজের নানা প্রকার সম্পর্ক-সমবায় এর সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সামাজিক অর্থনৈতিক, ইতিহাস-ঐতিহ্যিক, মানবিক সাংস্কৃতিক ইত্যাকার অবস্থা মানবসৃষ্টির অন্তর্গত ভিত্তিকে গড়ে তুলেছে।
সাহিত্য হচ্ছে একপ্রকার সম্পর্ক। যা মানবসমাজের অনিবার্য ভাববৈশিষ্ট্য নিয়ে রচিত হয়ে থাকে। মানুষের সহজাত মৌলিক প্রবৃত্তিকে এর মধ্যে অন্বিষ্ট করা হয়। এক অর্থে পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। আবার বৈসাদৃশ্যও আছে। এই ভেদাভেদ ঘুচিয়ে সাহিত্য কেবল মানুষের সহজাত ভাববৈশিষ্ট্য নিয়ে কথাবার্তা বলে। যেমন, মানবিক গুণাবলির স্নেহ-প্রেম দয়া-মায়া উচিত অনুচিত মূল্যবোধ শ্রেয়বোধ প্রভৃতি অর্থে সব মানুষই অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এ সুবাদে সাহিত্য বিশ্ব মানবপরিবারের মধ্যে একটা মেলবন্ধন তৈরি করে দেয়। একটা বিশ্বজনীন ভাবভাবনায় আমরা পরস্পর পরস্পরের কাছাকাছি আসতে পারি। সেখানে স্থানিক-কালিক বা ভৌগোলিক সীমারেখা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে না। এ অবস্থায় একমাত্র সাহিত্যই মানবজীবনের সুষম সমাজ গঠনে অপরিসীম ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন, হোমার, বায়রন, মিল্টন, রবীন্দ্র, নজরুল, শেকসপীয়র তাদের সৃষ্টিশীল কর্মের মাধ্যমে সারা পৃথিবীকে একটা পরিবারের মধ্যে এনে দাঁড় করিয়েছেন। একটা অভিন্ন জাতিসত্তার রূপরেখা সবার সামনে টেনে দিয়েছেন। সব ভেদাভেদ ভুলে বিশ্ববাসী একটা নান্দনিক বোধবুদ্ধির ছায়াতলে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। সাহিত্য ছাড়া আর কোনো উপায়েই তা সম্ভব নয়। তা ছাড়া পৃথিবীর যত সব যুদ্ধবিগ্রহ, রক্তপাত, সাম্রাজ্যবাদ, হানাহানি, হত্যাযজ্ঞ ইত্যাকার পরিস্থিতিতে সাহিত্যবোধ একটা ভারসাম্য দিতে সক্ষম হয়েছে। সাহিত্য ও সংস্কৃতিবোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা পৃথিবীতে যুগে যুগে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিয়েছেন। ফলে পৃথিবী অনেক অনর্থপাত ও সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেয়েছে। সাহিত্যের সৌন্দর্যবোধ, সুখ, ছন্দ, স্বপ্ন, গীতিময়তা প্রভৃতি অনুষঙ্গ মানবজাতিকে মানবিক হওয়ার শিক্ষা দেয়। এতে একটা সম্প্রীতির সহাবস্থান তৈরি হতে বাধ্য। সাহিত্যের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হিসেবে একটা অনুকূল পরিবেশ দরকার। স্বতঃস্ফূর্ত, স্বতঃপ্রবৃত্ত ও মুক্তমনন চর্চার ক্ষেত্র ছাড়া এর বিকাশ বিবর্তন সম্ভব নয়। একটা অবারিত উন্মুক্ত পরিবেশে মানুষের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা দিতে হবে। স্বতঃস্ফূর্ত চিন্তাচেতনা ছাড়া মানুষ কখনো বেঁচে থাকতে পারে না। ফলে এ অবস্থায় সাহিত্যচর্চাও সুদূরপরাহত বরং এ অবস্থায় একটা আত্মবিধ্বংসী পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। আত্মকেন্দ্রিকতা, ব্যক্তিস্বার্থ, অহংবোধ, হীনম্মন্যতা, সন্দেহ, অবিশ্বাস, হিংস্রতা ইত্যাকার মানববৈরী বৈশিষ্ট্যবিস্তার সমাজদেহে মারাত্মক আকার ধারণ করে। একসময় তা মানবসমাজের অস্তিত্বকে বিপর্যস্ত করে দেয়। সবরকম মানবিক বোধবুদ্ধি লুপ্ত হয়। দানবীয় শাসন-ত্রাসন বিস্তৃত হতে থাকে। এ অবস্থায় সাহিত্যশিল্পের পরিচর্যা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
সাহিত্যবোধসম্পন্ন মানুষই প্রকৃত মানুষ। কারণ এর সাথে মানবজীবনের স্বর্গীয় উপাদানগুলো জড়িয়ে আছে। মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। এ পর্যায়ে একসময় উদগ্র বাসনার সীমাহীন স্রোতের টানে মানুষ ভেসে যায়। ক্ষেত্রবিশেষে শান্তি-স্বস্তি হারিয়ে যায়। স্থূল বৈষয়িক বোধবুদ্ধি একেবারে সব কিছু গ্রাস করে ফেলে। এমনকি অনেক সময় তা পাশবিক পরিণতির পথে নিক্ষিপ্ত হয়। এ অবস্থায় শিল্পসাহিত্যের অনুশীলন ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। ক্রমাগত সংস্কৃতির চর্চা মানবচিত্তকে মার্জিত পরিশীলিত ও রুচিসম্মত হিসেবে গড়ে তোলে। এ এক প্রকার মানবচরিত্রের সংবিধানও বটে। যা তাকে সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে। প্রতিনিয়ত এই অনুশীলন অনুষঙ্গ অব্যাহত রাখতে হবে।
বর্তমান সমাজব্যবস্থায় শিল্পসাহিত্যের বড় আকাল। ক্রমাগত ডিজিটালাইজড পৃথিবীতে যান্ত্রিকতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, কৃত্রিমতা আমাদের পেয়ে বসেছে। উদার জ্ঞানানুশীলন ও পুস্তক পাঠের পরিবেশ অনেকটাই তিরোহিত। বর্তমান প্রজন্ম মোবাইল ফেসবুক ইন্টারনেট ও অন্যান্য যান্ত্রিক বস্তুবিশ্ব নিয়ে আত্মহারা হয়ে পড়েছে। কেবলই মস্তিষ্কের কাজকারবার নিয়ে ব্যস্ত। বস্তুবিশ্বের নির্মম টানাপড়েন প্রতি মুহূর্তে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। পাশাপাশি নান্দনিক বোধবুদ্ধিপ্রসূত মননশীলতার চর্চা নেই। কলাবিদ্যার ক্ষেত্রপরিধি অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও খেলাধুলার কোনো অবকাশ নেই। ফলে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও মমত্ববোধ সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এর ফলে তারা ক্রমাগত নিঃসঙ্গ নির্মম, আত্মকেন্দ্রিক ও ভয়ঙ্কর স্বার্থপর রূপে বেড়ে ওঠে। সংযত-সংহত ও সহিষ্ণুতার বড় অভাব। সামাজিক বোধবুদ্ধি গড়ে ওঠার সুযোগ পাচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্রের সর্বত্র একটা অস্থিরতা বিরাজ করে। বর্তমান সময়ের জঙ্গি সমস্যা ও আত্মঘাতী হওয়ার পেছনেও অনুরূপ প্রবণতা সক্রিয় রয়েছে। ফলে দেশের প্রাজ্ঞজন নতুন করে আবার পুরোদমে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরুর কথা বলছেন। এ অবস্থায় শিল্পসাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। শুধু এর মধ্য দিয়েই আলোচ্য সমস্যা নিরসন সম্ভব।
সাহিত্য ও জীবন একে অন্যের পরিপূরক। একটিকে বাদ দিয়ে কখনো অন্যটি কল্পনা করা যাবে না। সুস্থ স্বাভাবিক সুন্দর মহৎ ও পরিপূর্ণ মানবজীবনের প্রয়োজনে সাহিত্যের কোনো বিকল্প নেই। এর মধ্য দিয়েই মানবজীবনের কাক্সিত পুষ্পকুমুদ প্রস্ফুটিত হওয়ার সুযোগ পায়। একটা সর্বজনীন মানবসমাজ গঠনে সাহিত্য অপরিসীম ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.