অভিমান

মো. মাঈন উদ্দিন

রাজধানীর উত্তরায় একটি কলেজের ইংরেজি শিক্ষক জিয়াউল হক। জিয়া ও সামিরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিষয়ে পড়াশোনা করেছে। প্রায় তিন বছর হলো তারা পড়াশোনা শেষ করেছে। সামিরাও একটি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছে বছরখানেক আগে। কিছু দিন ধরে সামিরার সাথে জিয়ার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। ছোট্ট একটি ভুল বোঝাবুঝির কারণে মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে জিয়া। তিন দিন ধরে সে সামিরার সাথে কথা বলছে না; বুকের ঠিক মাঝখানটায় একটা পাথরে কষ্ট চেপে আছে। কলেজের সামনে যে কৃষ্ণচূড়া গাছটি, তার ঠিক পাশ দিয়েই বয়ে গেছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। এই কৃষ্ণচূড়া গাছের ছায়ায় এলে মায়ের মমতা অনুভব করে জিয়া; কারণ এক সময় সে এ কলেজেরই ছাত্র ছিল। তখনো সে এ কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচ দিয়ে অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছে। 

এ মুহূর্তে সে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ওপরের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো এই বর্ষা ঋতুতেও তাদের নিজস্ব সৌন্দর্য ছড়িয়ে চলেছে। বর্ষা ঋতুতে আজ প্রকৃতি সেজেছে মেঘলা সাজে। পশ্চিমে হেলে পড়া সূর্য মেঘ ও রোদের লুকোচুরি খেলছে। মেঘলা আবহাওয়া মানুষজনকে যেন উদাস করে দিচ্ছে। যে যার গন্তব্যে ছুটে চলেছে যন্ত্রের মতো। পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল বের করে জিয়া। মোবাইলের সুইচ অন করতে করতে সে ভাবছে আচ্ছা, সামিরা এখন কোথায় থাকতে পারে? নিশ্চয়ই স্কুলে। ক্লাস নিচ্ছে। হয়তো পরীক্ষার খাতা কাটছে। মেয়েটাকে আর কত কষ্ট দেবো। অনেক তো হলো। সে সামিরাকে ফোন দেয়।

-হ্যালো।

-জিয়া, তুমি ভালো আছো তো? তুমি যতই অভিমান করে থাকো; আমি জানি তুমি আমার কাছে ফিরে আসবেই। এটা আমার বিশ্বাস। আচ্ছা, তাহলে তোমার অভিমান ভাঙল? 

-না, ভাঙেনি। কিছুটা অভিমানের সুরে বলে জিয়া। আগামীকাল আমার কলেজের সামনে কৃষ্ণচূড়ার নিচে এলে হয়তো ভাঙতে পারে।

-তাহলে এখনই আসি। আমার ক্লাস নেয়া শেষ।

-আজ নয়। আগামীকাল ঠিক এই সময়, অর্থাৎ বেলা ২টা। 

সামিরা ফোন রেখে মুচকি হাসে। জিয়ার সাথে আমার সম্পর্ক সেই কলেজ জীবন থেকেই; অথচ এই প্রথম সে আমার সাথে অভিমান করে ফোন বন্ধ রাখল। 

পরের দিন বেলা ২টা। সামিরা আজ সাদা আঁচলের লাল রঙের শাড়ি পরেছে। কারণ জিয়া লাল শাড়ি পছন্দ করে। মাথায় পরেছে বেলি ফুলের মালা। ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। মনের মতো করে সে নিজেকে সাজিয়েছে আজ। কৃষ্ণচূড়ার নিচে এসে জিয়ার মুখোমুখি দাঁড়ায়। জিয়া একটি তপ্ত নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। যেন জমানো বাতাসগুলো বেলুনের মুখ দিয়ে বেরিয়ে চুপসে গেল বেলুনটা। সে মনে মনে বলে, ‘আহ! আজ তিন দিন হলো সামিরার সাথে দেখা নেই। সামিরাকে এক দিন না দেখলে পুরো পৃথিবী যেন শূন্য শূন্য লাগে।’ সামিরা-জিয়া মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকলেও কেউ কোনো কথা বলছে না। জিয়া পকেট থেকে একটি গোলাপ ফুল বের করে সামিরার হাতে দিয়ে বলে, ‘গত তিন দিন তোমাকে না দেখার ফলে আমার বুকের মধ্যে যে ভালোবাসা জমাট বেঁধেছে, তার সবটুকু এই ফুলের সাথে তোমাকে দিলাম। অবশ্য আরো ফুল এনেছিলাম। টেবিলে রেখে ক্লাস নেয়ার সময় দুষ্ট ছেলেরা কখন যে নিয়ে গেল, টেরই পাইনি। সামিরা ফুল হাতে নিয়ে বলে, ‘জিয়া, দিস্তা দিস্তা সাদা পাতার চেয়ে একটা প্রেমপত্র যেমন আবেগের তরঙ্গ সৃষ্টি করে; তেমনি প্রেমহীন বস্তা বস্তা ফুলের চেয়ে ভালোবেসে একটি ফুল দিলেও তার অনুভূতি হয় সীমাহীন। 

জিয়াকে ড্যাব ড্যাব করে দেখছে সামিরা। জিয়াকে যেন আজ অন্যরকম লাগছে। পালিশ করা সু। চিকচিকে কালো প্যান্ট। ধবধবে সাদা শার্ট, লাল টাই সব মিলিয়ে জিয়াকে মোহনীয় লাগছে। ইতোমধ্যে উড়ে যাওয়া সাদা মেঘ থেকে দু-এক ফোঁটা বৃষ্টি নেমে আসতে শুরু করেছে। সামিরার চোখ দু’টি লাল হয়ে ওঠে। সারা শরীরে কেমন যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। সামিরার ইচ্ছে করছে হ্যাঁচকা টানে তাকে বুকের মধ্যে নিতে। উপস্থিত সবাইকে জানিয়ে দিতেÑ জিয়াউল আমার ভালোবাসা, জিয়াউল আমার প্রথম ও শেষ প্রেম। 

নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়

 

সম্পাদকঃ আলমগীর মহিউদ্দিন,
প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ
১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

Copyright 2015. All rights reserved.